সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অর্থ বিভাগে বিবেচনার জন্য যেসব বিষয় পাঠানো বাধ্যতামূলক—সেসব বিষয়ে একটি বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ও পুনঃঅর্পণ সংক্রান্ত অফিস স্মারকের সঙ্গে সংযুক্ত এ তালিকায় মোট ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
Advertisement
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। অর্থ সচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদার এতে সই করেন ১৯ জানুয়ারি। এ আদেশে পরিচালন ও উন্নয়ন—উভয় বাজেটের আওতায় আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ও পুনঃঅর্পণের একটি হালনাগাদ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এ আর্থিক ক্ষমতা আদেশ জারির তারিখ থেকেই কার্যকর হবে এবং পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
নতুন আদেশ অনুযায়ী, পদ সৃষ্টি, পদ বিলুপ্তকরণ, তিন বছরের বেশি সময়ের জন্য অস্থায়ী পদ সংরক্ষণ, পদের বেতনক্রম, মর্যাদা ও পদবি পরিবর্তন, পদ স্থায়ীকরণ–সংক্রান্ত সব প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে। এছাড়া মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন সংযুক্ত অধিদপ্তর, অফিস বা সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামোয় যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি অন্তর্ভুক্তকরণ বা সংশোধন এবং যানবাহন ক্রয় ও প্রতিস্থাপনের প্রস্তাবও অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর হবে।
সেবা ক্রয় ও শ্রমিক নিয়োগেও অনুমোদন প্রয়োজনওয়ার্কচার্জড ও কন্টিনজেন্ট কর্মচারী সংক্রান্ত সব বিষয়, আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালার আওতায় সেবা ক্রয়ের প্রস্তাব এবং দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে।
Advertisement
ব্যয়, পুনঃউপযোজন ও বাজেট ব্যবস্থাপনাবাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব, অনুমোদিত বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই—এমন ব্যয় এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত হোক বা না হোক—এমন যে কোনো মঞ্জুরি বা পুনঃউপযোজনের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে রাজস্ব ব্যয় থেকে মূলধন ব্যয়ে বা মূলধন ব্যয় থেকে রাজস্ব ব্যয়ে পুনঃউপযোজন, বিএসিএস অনুযায়ী বেতন-ভাতা খাত থেকে অন্য অর্থনৈতিক শ্রেণিতে পুনঃউপযোজন—এ দুটি ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
আর্থিক অঙ্গীকার ও পুরোনো দাবিসংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাইরে যে কোনো আর্থিক অঙ্গীকার এবং প্রাক-স্বাধীনতাকালের আর্থিক দাবি অর্থ বিভাগের বিবেচনার জন্য পাঠাতে হবে।
সম্মানী, বেতন ও চাকরির শর্তকঠোর শ্রমসাধ্য বা কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ১৫ হাজার টাকার বেশি সম্মানী অথবা একই অর্থবছরে একাধিকবার সম্মানী প্রদান করতে হলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
এছাড়া বেতন-ভাতা, ভ্রমণ ও বদলি ব্যয়, ভবিষ্যৎ তহবিল, পেনশন ও আনুতোষিক সংক্রান্ত বিধি-বিধানের ব্যাখ্যা এবং বেতন-ভাতাদি সম্পর্কিত চাকরির শর্ত পরিবর্তনের বিষয়ও কেন্দ্রীয়ভাবে নিষ্পত্তি হবে।
Advertisement
রাজস্ব, কর ও অনুদাননন-এনবিআর ট্যাক্স, এনটিআর, ফি, সেস আরোপসহ সরকারি প্রাপ্তির ওপর প্রভাব ফেলে—এমন যে কোনো প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে। প্রাথমিক নিয়োগে বিধি মোতাবেক বর্ধিত বেতন ছাড়া আগাম বর্ধিত বেতন মঞ্জুর এবং বাজেট বরাদ্দবহির্ভূত অনুদান মঞ্জুরের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
অগ্রিম, ক্রয় ও আপ্যায়ন ব্যয়স্থায়ী অগ্রিম বা ইমপ্রেস্ট ছাড়া ১৫ লাখ টাকার বেশি অগ্রিম উত্তোলন, ৫ লাখ টাকার বেশি মনিহারি দ্রব্যাদি স্থানীয়ভাবে ক্রয় এবং সভা, কনফারেন্স বা প্রশিক্ষণে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত আপ্যায়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে।
অবলোপন ও বিদেশ ভ্রমণ ব্যয়জালিয়াতি বা গাফিলতির কারণে ৫ লাখ টাকার বেশি অনাদেয় ক্ষতি অবলোপন, সরকারি কর্মচারীকে প্রদত্ত অনাদেয় ঋণ বা সুদ অবলোপন অর্থ বিভাগের অনুমোদন ছাড়া করা যাবে না।
বিদেশ সফরে কেবিনেট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ডলারের সীমা অতিক্রম করলে তা অর্থ বিভাগের বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে যে সব বিষয়ে অনুমোদন দিতে হবে-
>> বিদেশে সরকারিভাবে ভ্রমণকারী কেবিনেট মন্ত্রী কর্তৃক আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ ৮০০ মার্কিন ডলার এবং সরবরাহ ও সেবার অধীন অন্যান্য ব্যয় বাবদ ৩০০ মার্কিন ডলারের অধিক ব্যয়।
>> বিদেশে সরকারিভাবে ভ্রমণকালে প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার এবং অনুরূপ পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি কর্তৃক আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ ৭০০ মার্কিন ডলারের অধিক ব্যয় এবং সরবরাহ ও সেবার অধীন ব্যয় বাবদ ২৫০ মার্কিন ডলারের অধিক ব্যয়।
>> প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্যসচিব, সিনিয়র সচিব, সচিব, ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনীর সমপর্যায়, সমতুল্য পদবীর কর্মকর্তা কর্তৃক আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ ৬০০ মার্কিন ডলার এবং সরবরাহ ও সেবার অধীনে অন্যান্য ব্যয় বাবদ ২০০ মার্কিন ডলারের অধিক ব্যয়।
নীতি প্রণয়ন, ঋণ ও গ্যারান্টিআর্থিক সংশ্লেষযুক্ত বিষয়াবলী—বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক বা আন্তর্জাতিক চুক্তি, আমদানি-রপ্তানি নীতি, বিনিয়োগ নীতি, মূল্য ও শ্রমনীতি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি, শুল্কনীতি এবং বিভিন্ন তহবিল নির্ধারণ—অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রণীত হবে।
এছাড়া ঋণ সংগ্রহ, সরকারি গ্যারান্টি প্রদান, বাজেট বহির্ভূত আর্থিক সংশ্লেষযুক্ত যেকোনো বিষয় এবং থোক বরাদ্দের বিভাজন অনুমোদনের বিষয়ও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সরকারি রাজস্ব দাবি পরিত্যাগ বা মওকুফ, বেসরকারি বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ভাড়া অনুমোদন, কমিশন বা কমিটির বেসরকারি সদস্য ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ভাতা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রবিধানমালা প্রণয়ন এবং দর তফসিল অনুমোদনের বিষয়গুলোও অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদনের আওতায় রাখা হয়েছে।
উদ্দেশ্য কীঅর্থ বিভাগ বলছে, এ তালিকার মাধ্যমে কোন কোন বিষয়ে কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন—তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত কমবে এবং মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মধ্যে আর্থিক শৃঙ্খলা ও সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে।
এমএএস/এমকেআর