খেলাধুলা

অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়-ক্রিকেট বুঝি এমনই!

অফস্টাম্পের বাইরের বল, ক্রিস ওকস ব্যাট চালালেন বল গিয়ে পড়লো কাভারের উপর দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে। এক আঙুল উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন ওকস, সঙ্গী খালেদ আহমেদ ছুটলেন ডাগআউটের দিকে। ক্যামেরার লেন্স খুজে নিলো অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ, দৌড়ে এসে লাফিয়ে উঠলেন ওকসের কোলে! সিলেট টাইটান্সের পুরো দল তখন মাঠের মাঝখানে।

Advertisement

অন্যদিকে রংপুর রাইডার্সের কেউ মাটিতে শুয়ে পড়েছে, কেউ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন! ডাগআউটে তাকিয়ে দেখা গেলো টিম ডিরেক্টর শানিয়ান তানিন অঝোরে কাঁদছেন। গ্যালারিতে রংপুর সমর্থকরা যেন শোকে পাথর হয়ে গেছেন আর উচ্ছ্বাসে ভাসছেন সিলেট সমর্থকরা। প্রথম ইনিংস শেষ একপেশে ম্যাচ হবে ভেবেছিলেন অনেকে, তবে এমন লো স্কোরিং ম্যাচও যে এমন রোমাঞ্চকর হতে পারে সেটাই দেখালেন রংপুরের বোলাররা।

বিশেষ করে নাহিদ রানা আর মোস্তাফিজুর রহমান যেন নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছিলেন বল হাতে। একপর্যায়ে তো মনে হচ্ছে জিতেই গেল রংপুর, তবে শেষ বলের ছক্কায় ক্রিস ওকস পাশার দান উলটে দিলেন! কিন্তু ক্রিকেট যে কত নিষ্ঠুর, কত নির্মম হতে পারে, সেটাই শেষ বলে দেখিয়ে দিলেন ক্রিস ওকস। এক ছক্কায় উল্টে গেল পুরো গল্প, বদলে গেল ভাগ্য। ক্রিকেট বুঝি এমনই, এক ম্যাচে কতবার হাসায় কতবার কাঁদায়, অবিশ্বাস্য-অকল্পনীয়!

মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার চলতি বিপিএলের প্রথম কোয়ালিফায়ারে মুখোমুখি হয় রংপুর রাইডার্স ও সিলেট টাইটান্স। আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল কুয়াশা থাকায় উইকেটে বাড়তি ময়েশ্চার থাকবে। সেক্ষেত্রে টস ফ্যাক্টর হবে, হলোও তাই। টস জিতে আগে ফিল্ডিং নিলো সিলেট, খেল দেখানো শুরু করেলন খালেদ আহমেদ ও ক্রিস ওকস। ১১ রানেই নেই রংপুরের ৩ উইকেট। লিটন কুমার দাস ও তাওহীদ হৃদয়কে দারুণ দুটি ডেলিভারিতে ফেরালেন খালেদ। আর ওকসের শিকার হলেন মালান। পাওয়ার প্লে শেষ হতেই ফিরলেন কাইল মায়ার্স।

Advertisement

এরপর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও খুশদিল মিলে ইনিংস গড়ার চেষ্টা করলেন। গড়লেনও কিছুটা, তবে সেটা যথেষ্ট হলো না। ১৯ বলে ৩০ রান করেন খুশদিল আর রিয়াদের ব্যাট থেকে এলো ২৬ বলে ৩৩ রান। শেষদিকে সোহান করলেন ১৮ রান। ম্যাচ শেষে রংপুর অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের কণ্ঠেও আক্ষেপ, তারা যদি আরেকটু থাকতে পারতেন!

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে লিটন বলেন, ‘নতুন বলটা অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। ওই সময় অনেকগুলো উইকেট পড়াতে কিছু ব্যাকফুটে চলে গেছি। কিন্তু তাও আমার মনে হয় রিয়াদ ভাই এবং খুশদিল খুব ভালো ব্যাটিং করতেছিল বা সোহান ভাইও। যদি ওখান থেকে আরেকটু (ইনিংস) বড় করে দিত, হয়তোবা রানটা ১৩০ গেলে ভিন্ন গল্প হলেও হতে পারতো।’

গল্পটা যেন ভিন্ন হতেই পারতো সেটা দেখিয়েছেন রংপুরের বোলাররা। স্কোরবোর্ডে রান মাত্র ১১১, সেটা ডিফেন্ড করতে নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েই এফোর্ট দিতে হতো। রংপুরের বোলাররা সেটাই করেছেন। প্রথম ওভারেই সিলেটের ওপেনার তৌফিক খানকে ফিরিয়ে দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যপাশে অবশ্য ইমন পালটা আক্রমণ করে চাপে না পড়ার সব চেষ্টাই করেছেন। তবে তাকে বেশিক্ষণ টিকতে দেয়নি রংপুর। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে ১২ বলে ১৮ রান করা ইমনকে ফেরান আলিস আল ইসলাম। এরপর দৃশ্যপটে আগমন নাহিদ রানার, গতির সঙ্গে এদিন মুখও চলেছে তার সমানতালে।

সাধারণত দেখা যায় নাহিদের বলে যত বেশি গতি মুখে কথা তত কম। ডেলিভারি করে আবার বোলিং মার্কে চলে যান তিনি। তবে মঙ্গলবার ভিন্ন এক রানার দেখা মিলেছে মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সপ্তম ওভারে আরিফুল ইসলামকে ফিরিয়ে উদযাপনটাও করেছেন ভিন্নভাবে। এরপর সিলেট ইংলিশ ব্যাটার স্যাম বিলিংসের সঙ্গে যেন নেমেছিলেন ভিন্ন এক যুদ্ধে। প্রায় প্রতি ডেলিভারিতে স্যামকে নাচিয়ে ছেড়েছেন রীতিমত।

Advertisement

একাধিকবার স্যামের শটে ফিরতি বল ধরে থ্রো করতে গেছেন, নানাভাবে স্লেজিং মনোযোগ নষ্টের চেষ্টাও করেছেন। প্রতি বলে গতির ঝড়, স্লেজিং, চোখে চোখ রেখে লড়াই। প্রথম ওভারে ১০ রান দেওয়ার পর বাকি ৩ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ১১ রান। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা করেছেন ভয় ধরিয়েছেন ব্যাটারদের, নষ্ট করেছেন তাদের মনোযোগ। তবে নাহিদ রানার একের পর এক বুলেট ডেলিভারি সামলে ঠিকই উইকেটে পড়ে ছিলেন স্যাম বিলিংস। তাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, ইংল্যান্ড থেকে এসেছেন, আজই প্রথমবার খেলতে নেমেছেন বিপিএল! ৪০ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর নেমেছেন, ৪ রানের ব্যবধানে হারিয়েছেন আফিফকে। এরপর প্রায় একা আগলে রেখেছেন সিলেটকে। রানার গোলা, মোস্তাফিজের কাটার সামলেছেন দাঁতে দাঁত চেপে!

আর মোস্তাফিজ তো যেন এদিন নিজের মনের মতো উইকেটই পেয়েছিলেন। যেমন ইচ্ছা বোলিং করেছেন, ব্যাটারদের বোকা বানিয়েছেন। শুরুতে উইকেট এনে দিয়েছেন, পরে ব্যাটারদের আটকে রেখেছেন। শেষ দুই ওভারে সিলেটের প্রয়োজন ছিল ১৫ রান। ১৯তম ওভারে আক্রমণে এসেই উইকেটে গেড়ে বসা স্যাম বিলিংসকে স্লোয়ারে বোকা বানান ফিজ। ওই উইকেট থেকেই আচমকা জয়ের পরিস্থিতিতে চলে যায় রংপুর।

শেষ ওভারে ১০ রানের সমীকরণ, প্রথম ৫ বলে এলো ১ রান। মঈন আলীকে শুধু বোকা বানিয়ে বল ডটই দেননি তার উইকেটও তুলে নিলেন ফাহিম আশরাফ। শেষ দুই বলে লাগে ৭ রান। খালেদ আহমেদ লং অনে শট খেললেন, অনায়াসে ২ রান হয়। খালেদ চেষ্টাও করলেন তবে তাকে ফেরালেন ওকস।

আগের ৫ বল স্লোয়ার কাটার করা ফাহিম শেষ বলে করতে গেলেন ওয়াইড ইয়র্কার। তবে সেটা হলো হাফভিল, তাতে ছিলো যথেষ্ট গতিও! ওকস ফুল ব্যাট সুইংইয়ে উড়ালেন কাভারের উপর দিয়ে! ঠিক যেন ২০১৯ সালের নিদহাস ট্রফির দীনেশ কার্তিক! ম্যাচ শেষে অবশ্য রংপুর অধিনায়কও বললেন তারও ওই সময়ে একই ঘটনা মনে পড়েছিল, ‘আমার নিদাহাস ট্রফির কথাটা মনে পড়ে গেছে। একই... কাভারের উপর দিয়েই ছয়।’

একই উত্তরে লিটন অবশ্য আরও একটা কথাও বললেন, ‘না, ঠিক আছে। এটাই ক্রিকেট, এটাই এইভাবেই জীবন চলে। আপস অ্যান্ড ডাউনস থাকবেই। জিততে পারলে তো ভালো হতো। এখন পারি নাই কিছু করার নেই।’

তিন ম্যাচ আগেই অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন, টানা দুই ম্যাচ জিতেছেন কিন্তু হারলেন যেখানে সেখান থেকে ফেরার রাস্তা নেই! অন্যদিকে একদিন আগেই বাংলাদেশে আসা ক্রিস ওকস বল হাতে নাড়ালেন রংপুরের ব্যাটিং অর্ডার। এরপর শেষ বলে ছক্কা মেরে জেতালেন দলকে। যেন এলেন দেখলেন, দলকে জেতালেন। এই এক ম্যাচেই কেউ পেল স্বপ্নপূরণ, কেউ পেল হৃদয়ভাঙা বাস্তবতা। ক্রিকেট আসলে এমনই-এক বলেই হাসায়, এক বলেই কাঁদায়।

এসকেডি/এমএমআর