খেলাধুলা

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জন; ইতিহাস কী বলছে?

বর্তমান পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় মনে হচ্ছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবার অনিশ্চিত। ভারতের মাটিতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে শুরু থেকেই শঙ্কার কথা জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ।

Advertisement

বিসিবির পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল, যেন বিকল্প ভেন্যুতে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো আয়োজন করা হয়। এবারের বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কা হওয়ায় বাংলাদেশ সেখানে খেলাকেই তুলনামূলক নিরাপদ ও শ্রেয় মনে করেছিল। তবে আইসিসি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের এই দাবি গ্রহণ করেনি।

আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আল্টিমেটাম

গত ২১ জানুয়ারি, বুধবার সন্ধ্যায় আইসিসি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তার নির্ধারিত ফরম্যাট ও সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতেই বহাল থাকছে— যার মধ্যে তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি ম্যাচ মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

Advertisement

আইসিসি বাংলাদেশকে শেষ সুযোগ হিসেবে আরও একদিন সময় দিয়েছে। আজই বিসিবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে— বাংলাদেশ জাতীয় দল শেষ পর্যন্ত ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না, নাকি শ্রীলঙ্কায় খেলার দাবিতে অনড় থেকে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াবে।

আইসিসির এই আল্টিমেটাম স্পষ্ট করে দেয়, তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য ভেন্যু পরিবর্তন করবে না। ভারতের মাটিতে না খেললে বাংলাদেশকে ছাড়াই টুর্নামেন্ট এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা।

বিসিবি সভাপতির ‘মিরাকল’-এর আশা

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বুধবার রাতে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি এখনো একটি ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায় আছেন। যদি রাতারাতি পরিস্থিতির কোনো অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে, তবেই হয়তো বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আইসিসির অনড় অবস্থানের কারণে এমন কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

Advertisement

উল্লেখ্য, আইসিসির বোর্ড সভায় ১৫টি প্রতিযোগী দেশের ভোটের মধ্যে বাংলাদেশ কেবল নিজেদের ভোটটিই পেয়েছে। বাকি ১৪টি দেশই ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছে। যদিও আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারতীয়, তবু আইসিসি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা— যেখানে বিশ্বের বড় ক্রিকেট শক্তি ও অ্যাসোসিয়েট সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

ইতিহাসের নজির: বড় দলগুলোর বিশ্বকাপ বর্জন

বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ না নেয়, তবে আইসিসির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবে কি না— এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগছে। তবে ক্রিকেট ইতিহাস ভিন্ন বাস্তবতার কথাই বলে। অতীতে বহু বড় দল নিরাপত্তার কারণে নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

২০০৩ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় আয়োজিত এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবুয়েতে গিয়ে খেলতে রাজি হয়নি। একইভাবে নিউজিল্যান্ডও কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে খেলেনি।

১৯৯৬ বিশ্বকাপ: অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ উপমহাদেশে বিশ্বকাপ খেলতে এলেও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। অথচ সেই বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের লাহোরে।

২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ: নিরাপত্তাজনিত কারণে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে এসে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এসব ঘটনার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ক্রিকেট বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি কিংবা আইসিসির রোষানলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েনি। এমনকি দ্বি-পাক্ষিক ক্রিকেট সম্পর্কেও দীর্ঘমেয়াদি বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

আর্থিক ক্ষতি ও জরিমানার আশঙ্কা

তবে বিশ্বকাপ না খেললে বাংলাদেশকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলে পার্টিসিপেশন মানি, উইনিং মানি এবং গ্রুপ পর্ব অতিক্রমের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের প্রাইজমানি পাওয়ার সুযোগ থাকে। বিশ্বকাপ বর্জন করলে বাংলাদেশ এসব মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

পাশাপাশি, আইসিসি যদি মনে করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবি অযৌক্তিক কিংবা যথাযথ দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, তাহলে বিসিবিকে অন্তত ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪ কোটি টাকা) জরিমানা গুনতে হতে পারে। আইসিসি যেহেতু বারবার দাবি করে আসছে যে ভারত নিরাপদ, তাই বাংলাদেশের ব্যাখ্যায় তারা সন্তুষ্ট না হলে এই জরিমানাকে নিয়মগতভাবেই যৌক্তিক বলে বিবেচনা করবে।

বর্তমান অবস্থান

সব মিলিয়ে বিসিবি ও সরকার তাদের অবস্থানে অনড়। খেলোয়াড়, সমর্থক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো ঝুঁকি নিতে তারা রাজি নয়। ফলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশ হয়তো এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আর মাঠে নামছে না।

এখন দেখার বিষয়—আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের প্রত্যাশিত সেই ‘মিরাকেল’ আদৌ ঘটে কি না।

এআরবি/আইএইচএস/