গর্ভবতী মায়ের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো বহু বিধিনিষেধ প্রচলিত। জাতিগত, বর্ণগত, গোষ্ঠীগত ও এলাকাভেদে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই বিধিনিষেধ গর্ভবতী নারীদের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় খাদ্যগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। কোথাও খিচুড়ি বা সেদ্ধ ডিম খেতে নিষেধ, কোথাও আবার পোল্ট্রির মাংস কিংবা মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয় পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্দেশে। এমনকি পেটপুরে খাওয়াতেও থাকে কড়া নিয়ন্ত্রণ।
Advertisement
অনেকের ধারণা, গর্ভবতী বেশি খেলে গর্ভস্থ সন্তান অতিরিক্ত বড় হবে, ফলে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হবে না-অপারেশন করতেই হবে। বাস্তবে এসব ধারণার বেশির ভাগই অবৈজ্ঞানিক, স্বাস্থ্যের পরিপন্থী এবং দীর্ঘদিনের লালিত কুসংস্কারের ফল।
মাতৃত্বকালীন পুষ্টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণভ্রূণ তার প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি সম্পূর্ণভাবে মায়ের শরীর থেকেই পায়। তাই প্রসবপূর্ব যত্নের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো মাতৃত্বকালীন সুষম পুষ্টি। ভ্রূণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশ, কঙ্কালের বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতার জন্য প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ অপরিহার্য।
এই পুষ্টির ঘাটতি হলে ভ্রূণের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং শিশুর জন্ম হতে পারে কম ওজন নিয়ে।
Advertisement
এলবিডব্লিউ বা কম ওজন নিয়ে জন্মের ঝুঁকিজন্মের সময় শিশুর ওজন যদি আড়াই কেজির কম হয়, তবে তাকে এলবিডব্লিউ (লো বার্থ ওয়েট) শিশু বা স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মানো শিশু বলা হয়। এই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ, বিকাশে বিলম্ব এবং প্রিম্যাচিউর মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
শুধু জন্মের সময় নয়, গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির ঘাটতি শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃত্বকালীন দুর্বল পুষ্টির সঙ্গে শিশুর পরবর্তী জীবনে স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং দুর্বল জ্ঞানগত বিকাশের সম্পর্ক রয়েছে।
কোন কোন পুষ্টি উপাদান অপরিহার্যগর্ভাবস্থায় সুস্থ মা ও শিশুর জন্য ম্যাক্রো ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট প্রয়োজনীয় প্রধান দুই ধরনের সুষম গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায় এবং ভ্রূণের কোষ গঠন ও সামগ্রিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে প্রোটিন ভ্রূণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও টিস্যু গঠনে সাহায্য করে। আয়রন লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে এবং মায়ের শরীরে অক্সিজেন পরিবহন নিশ্চিত করে। আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে, যা মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি ভ্রূণের হাড় ও দাঁতের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে, ফলে হাড়ের গঠন আরও মজবুত হয়।
Advertisement
ফোলেট ও ভিটামিন বি১২ ভ্রূণের স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক বিকাশে এবং জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থার শুরুতেই এই পুষ্টিগুলোর পর্যাপ্ত গ্রহণ বিশেষভাবে প্রয়োজন।
ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং কোষের ক্ষয় মেরামতে সহায়তা করে। অন্যদিকে ভিটামিন এ ও ভিটামিন ই কোষের বৃদ্ধি, দৃষ্টিশক্তি এবং কোষ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এবং ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে। এসব পুষ্টি উপাদানের যেকোনো একটির ঘাটতিই গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এই পুষ্টিগুলোর যে কোনো একটির ঘাটতিই শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকূলতা ডেকে আনতে পারে।
গর্ভাবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকাশুধু শারীরিক পুষ্টি নয়, গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যও শিশুর বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। ইতিবাচক মানসিক অবস্থা মা-সন্তানের বন্ধন দৃঢ় করে এবং শিশুর সামাজিক ও আবেগিক বিকাশে সহায়ক হয়।
অন্যদিকে, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বাড়ায়। এই হরমোন প্ল্যাসেন্টা অতিক্রম করে ভ্রূণের শরীরে পৌঁছে মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসব-পূর্ব ও প্রসবোত্তর সময়ে মাতৃত্বকালীন বিষণ্ণতার সংস্পর্শে আসা শিশুরা অনিরাপদ সংযুক্তি, আচরণগত সমস্যা ও দুর্বল সামাজিক দক্ষতায় ভুগতে পারে।
পরিবার থেকে যত্নচিকিৎসকের মাধ্যমে গর্ভাবস্থায় নারীকে নিয়মিত ওজন, রক্তচাপ, হিমোগ্লোবিন ও ভ্রূণের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে শুধু গর্ভাবস্থায় নারীকে উপদেশ দিলেই চলবে না। তার স্বামী ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের,বিশেষ করে মা বা শাশুড়িকে কাউন্সেলিং করাও জরুরি। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থায় নারীর মতামত বা প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পরিবার সচেতন না হলে কোনো পরামর্শই কাজে লাগে না।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান ন্যাশনাল লাইব্রেরি মেডিসিন,ইউনিসেফ টাইসম অব ইন্ডিয়া
আরও পড়ুন: শুধু মা নয়, কন্যাশিশুর বিকাশে খালার প্রভাব জানালো বিজ্ঞান গর্ভবতী নারী প্রতিদিন ডিম খেলে যা হয়
এসএকেওয়াই/