লাইফস্টাইল

শৈশবের ট্রমা কি বড় হওয়ার পর প্রভাব ফেলে

সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যায় স্কুলের অফিসকক্ষে দুইজন শিক্ষক এক শিশুকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করছেন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে নজরে আসে। শিশুটি এই ঘটনার পর মানসিকভাবে গভীর ট্রমায় ভুগছে এমনটি শোনা যায়। 

Advertisement

শিশুকাল আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় ভয়, অবহেলা বা মানসিক চাপ পেলে মস্তিষ্কের ‘ফায়ার রেসপন্স’ সিস্টেম অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়। ফলে বড় হওয়ার পরও ছোটখাটো ঘটনা দেখলেই অতিরিক্ত ভয়, আতঙ্ক বা অকারণ উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।

বড় হওয়ার পর অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারেন না কেন হঠাৎ আতঙ্ক, অবসাদ বা অতিরিক্ত উদ্বেগ অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর নেপথ্যে থাকতে পারে ছোটবেলার ট্রমা। শিশুকালে যে মানসিক বা শারীরিক আঘাত ঘটে, তা মস্তিষ্কের বিকাশ ও ভবিষ্যৎ আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।ট্রমা বিশেষজ্ঞ ডা: বেসেল ভ্যান ডার কোল্ক বলেন, ‘শৈশবে ঘটে যাওয়া মানসিক আঘাত মস্তিষ্ককে পুনর্গঠন করে। মস্তিষ্ক শিখে সবসময় সতর্ক থাকতে, এমন কি বিপদ চলে যাওয়ার পরেও।’

শিশুকালীন ট্রমা শুধু মানসিক সমস্যা নয়, শারীরিকভাবে ও প্রভাব ফেলে। দীর্ঘকালীন মানসিক চাপ কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, হজমের গোলমাল ও ক্রমাগত ক্লান্তি তৈরি করতে পারে।

Advertisement

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: জুডিথ হারম্যান বলেন, ‘শিশুকালীন প্রাথমিক ট্রমা একজন ব্যক্তির নিজেকে কিভাবে দেখা বা নিজের প্রতি ধারণা তৈরি হয় তা প্রভাবিত করে।’

যদিও সাধারণ স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়, ট্রমাটিক স্মৃতি সংবেদনশীল স্মৃতি হিসেবে থাকে। ফলে হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, আতঙ্ক বা দম বন্ধ লাগার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

শৈশবের ট্রমার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবশৈশবে আঘাতমূলক ঘটনার সংস্পর্শে আসা প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা আত্মসম্মান হ্রাস, বিষণ্ণতা, আত্ম-ধ্বংসাত্মক আচরণ এবং অন্যদের প্রতি বিশ্বাস কমানোর মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। পিটিএসডি বা শৈশবের ট্রমার প্রভাব প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

Advertisement

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের একটি জরিপ অনুসারে, ছোটবেলায় মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হতাশা, আচরণ, অ্যালকোহল বা অন্যান্য পদার্থের অপব্যবহারের ঝুঁকি বেশি থাকে। পাশাপাশি তাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ার একটি বড় কারণ হলো, শৈশবের ট্রমা প্রাপ্তরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে ধূমপান বা অন্যান্য উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কার্যকলাপে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

ট্রমা থেকে বের হওয়া সম্ভববিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রমা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। থেরাপি ও কাউন্সেলিং করলে নিজের ট্রমা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ধীরে ধীরে উন্নতি সম্ভব। তবে মানসিক চাপ কমাতে মনের ক্ষতিকর কোনো কাজ যেমন অন্যকে বিদ্রূপ করা, আক্রমণ করা-থেকে বিরত থাকা জরুরি।

আমরা নিজেকে কেমন মনে করি, নিজের সম্পর্কে কী ভাবি-এই বিষয়গুলো আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি শুধু ব্যক্তিত্ব নয়, আমাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অপরিহার্য।

যদি আমরা নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবনা নিয়ে থাকি, তা আমাদের আত্মবিশ্বাসকে কমিয়ে দেয়। মনে হয়, জীবনের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিজেকে পরিস্থিতির শিকার বা ভুক্তভোগী মনে হয়।

শৈশবে যদি মানসিক আঘাতের শিকার হন, তার মানে এই নয় যে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও নিজেকে ‘ভিকটিম’ ভাবার কোনো কারণ আছে। অনেকেই ভেবে বসেন, অতীতের প্রভাব আজও তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে মনে রাখুন-আপনি যেমন ভাবছেন, বাস্তবে পরিস্থিতির ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ তার চেয়ে অনেক বেশি।

নিজের ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেন।

ছোটবেলা থেকেই শিশুর প্রতিটি বেড়ে ওঠার সময় তাকে শেখাতে হবে, সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও জীবনের অংশ। ব্যর্থতাকে অস্বীকার না করে, কীভাবে তা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়, সেটিই শেখানো গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক,ভেরিওয়েল মাইন্ড

আরও পড়ুন: শিশুদের এত কিউট লাগে কেন জানেন? বাবা-মাকে ভালোবাসতে দেখলে সন্তান কী শেখে 

এসএকেওয়াই/