অর্থনীতি

রোজার আগে ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্বস্তির হাওয়া

রোজায় চাহিদার তুঙ্গে থাকা ছোলা, খেজুর, মসুর ডালের মজুত স্বাভাবিক থাকার পাশাপাশি আমদানি হয়েছে বাড়তি। পাশাপাশি চিনি ও ভোজ্যতেলের আমদানিও স্বাভাবিক। ফলে রমজান মাসে পণ্যের দাম বাড়বে না বলে মনে করছেন চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা।

Advertisement

ছোলার দাম কম

ভোগ্যপণ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাইকারি বাজারে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কম। তবে চলতি মৌসুমে নতুন আসা মটর ডালের দাম গত এক মাসের তুলনায় বাড়লেও কমেছে ছোলার দাম। গত বছরের তুলনায় চিনির দামও কম। স্বাভাবিক রয়েছে ভোজ্যতেলের দাম। রমজানের অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুরের দামও গত বছরের তুলনায় অনেক কম।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানিকৃত ছোলা খালাস হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৭ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৬৯ টন। গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছরের একই সময়ে ৭০ হাজার ৩৯৮ টন ছোলা বেশি আমদানি হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি জাহাজ থেকে এখনো ছোলা খালাস হচ্ছে।

মোটা দানার মসুরে স্বস্তি

চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানিকৃত মসুর ডাল খালাস হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭৬ টন। ভারত, নেপাল ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি হয়েছে এসব মসুর ডাল। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ১ হাজার ৭৯৯ টন মসুর ডাল। এতে বছরের একই সময়ে ৪৭ হাজার ১২৩ টন কম আমদানি হলেও বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি জাহাজ থেকে একযোগে মসুর ডাল খালাস হচ্ছে।

Advertisement

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৯৬ টন মটর আমদানি হয়েছে। ভারত, কানাডার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া থেকে মটর আমদানি হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৯৫ টন। গত বছরের তুলনায় একই সময়ে ১২ হাজার ৪০১ টন মটর বেশি আমদানি হয়েছে।

তেল-চিনির আমদানি ভালো

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৬১৮ টন, পরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ২ হাজার ৮৭৭ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলে ২৫ হাজার টন বেশি আমদানি হয়েছে। বর্তমানে ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৬ টন অপরিশোধিত সয়াবিন নিয়ে আসা পাঁচটি জাহাজ বন্দরের অ্যাংকরে খালাসরত।

বন্দরে লাইটারেজ সংকটের কারণে পণ্য খালাসে ব্যাঘাত ঘটছে। তারপরও সারা দেশে আমদানিকারকদের গুদামে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রয়েছে। ফলে রমজানে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে।- চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন

২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিশোধিত মিলের চিনি আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭২ টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৯৪০ টন। গত বছরের তুলনায় এবার ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩২ টন বেশি আমদানি হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে সাড়ে ৩ লাখ টন র’ চিনি নিয়ে ছয়টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসরত।

Advertisement

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অ্যাংকরে অবস্থানরত দুটি জাহাজ থেকে এখনো ৬৬ হাজার টন ছোলা খালাসরত। গত ১৫ ও ৬ জানুয়ারি জাহাজ দুটি বাংলাদেশে আসে। ছোলার পাশাপাশি বর্তমানে চারটি জাহাজ থেকে মসুর ডাল খালাসরত। এর মধ্যে সবশেষ ২৯ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া থেকে ১৯ হাজার ৪৯৭ টন মসুর ডাল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে ‘এমভি শেক্সপিয়ার বে’ নামের জাহাজটি। তাছাড়া অন্য তিনটি জাহাজ থেকে ৭৯ হাজার টন মসুর ডাল খালাসরত।

পেঁয়াজ-রসুনেও ঘাটতি নেই

চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৫ হাজার ৯৩৯ টন পেঁয়াজ, ৪৯ হাজার ৬৭১ টন রসুন ও ৯১ হাজার ৭৯৭ টন আদা আমদানি হয়েছে। পাশাপাশি দেশে রেকর্ড পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় শুধু চিকন দানার মসুর ডালের দাম বেড়েছে। তবে আগের বছরের মসুর ডালও ব্যবসায়ীদের কাছে মজুত থাকার কারণে অস্ট্রেলিয়ান মোটা দানার মসুর ডালের দাম অনেক কম।

আরও পড়ুনডাল-ছোলার দাম কম, বাড়ছে তেল-চিনির পানিতে সহস্রাধিক ‘ভাসমান গুদাম’, বন্দরে জাহাজজটরোজার আগেই চিনির বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট, বাড়ছে দাম

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার রমজান সামনে রেখে প্রচুর এলসি (ঋণপত্র) হয়েছে। ছোলা, মটর, মসুরের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। বন্দরে রোজার পণ্য হিসেবে ছোলা, মসুর, খেজুর, মটর ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনি নিয়মিত খালাস হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বন্দরে লাইটারেজ সংকটের কারণে পণ্য খালাসে ব্যাঘাত ঘটছে। তারপরও সারা দেশে আমদানিকারকদের গুদামে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রয়েছে। ফলে রমজানে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘মসুর গত বছর বেশি আমদানি হয়েছিল। গত বছরের মসুর এখনো মজুত রয়েছে। বাজারে মসুরের দাম একেবারে কমে গেছে। অস্ট্রেলিয়ান মসুর এখন পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে ছিল ৭৪ টাকার মতো। নভেম্বর মাসের শুরুতে মোটা দানার মসুর ডালের দাম ছিল ৮০ টাকা। তবে চিকন দানার ভারতীয় মসুরের দাম বাড়ছে। বর্তমানে পাইকারিতেও চিকন মসুর ডাল ১৫৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।’

এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জে মটর ডাল বিক্রি হয়েছে ৪৯ টাকা। গত মাসে এসব ডাল ছিল ৪৩ টাকা কেজি। বর্তমানে আস্ত মটরের কেজি ৪৫ টাকা থাকলেও গত মাসে ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। নভেম্বর মাসে এসব মটরের দাম ছিল কেজি ৪৭-৪৮ টাকা। বর্তমানে পাইকারিতে মানভেদে ৭০-৮০ টাকা কেজিতে ছোলা বিক্রি হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে ভালো মানের ছোলা প্রতি কেজি ৮৩ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। তারও একমাস আগে নভেম্বরে এসব ছোলা ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল।’

খেজুরও পর্যাপ্ত

চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ফ্রেশ খেজুর আমদানি হয়েছে ৩৭ হাজার ৯৩১ টন। গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ টন। যা গত বছরের তুলনায় এবার ১৫ হাজার ৯৪৫ টন বেশি আমদানি হয়েছে।

গত বছরের তুলনায় খেজুর আমদানি বাড়লেও দাম অনেক কম। তবে রোজা উপলক্ষে সরকারিভাবে ডিউটি কমানোর কথা ছিল। সে জন্য অনেক আমদানিকারক এখনো খেজুর আমদানির জন্য বসে আছেন। ডিউটি কমালে রোজার আগে আরও খেজুর আমদানি হবে।- চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম

গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে ফ্রেশ খেজুর। তবে খেজুর আগে রমজানের মৌসুমি খাবার হিসেবে থাকলেও বর্তমানে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় উঠেছে বলে দাবি করেছেন ফল ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় খেজুর আমদানি বাড়লেও দাম অনেক কম। তবে রোজা উপলক্ষে সরকারিভাবে ডিউটি কমানোর কথা ছিল। সে জন্য অনেক আমদানিকারক এখনো খেজুর আমদানির জন্য বসে আছেন। ডিউটি কমালে রোজার আগে আরও খেজুর আমদানি হবে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ খেজুরের মধ্যে জাহেদি, মাশরুক খেজুর রয়েছে। এসব খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে ১০ কেজির জাহেদি বর্তমানে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত রমজানে এসব খেজুরের দাম ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। একইভাবে সৌদিয়া মাশরুক ৫ কেজির দাম মানভেদে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা। একই খেজুর গত বছর দাম ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। তাছাড়া বস্তাভর্তি ভেজা খেজুর বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি ১৩৫-১৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর ছিল প্রতি কেজি ১৫৫-১৬০ টাকা।’

তার দাবি, এখন পুরো বছর খেজুরের চাহিদা থাকে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আগে রমজানে খেজুরের বেশি চাহিদা থাকতো। এখন মানুষ নিয়মিত খেজুর খায়। ফলে আমদানি বাড়লেও চাহিদা সে অনুযায়ী বাড়েনি। ডিউটি কমানোর ঘোষণা দিলে আরও খেজুর আমদানি হবে এবং রমজান মাসে খেজুরের দাম স্বাভাবিক থাকবে।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/বিএ