লাইফস্টাইল

যে ওষুধ বানানো বিশ্বাস আর আশা দিয়ে

বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশ’ এর একটি জনপ্রিয় উক্তি আছে - আশা একটি চমৎকার বিষয়, সম্ভবত সবকিছুর মধ্যে সেরা; আর কোনো ভালো জিনিসেরই মৃত্যু নেই।

Advertisement

ধরুন, প্রচণ্ড মাথাব্যথায় অস্থির হয়ে আপনি একটা ওষুধ খেলেন। তারপর স্বাভাবতই আশা করলেন – যেহেতু ওষুধ খেয়েছেন, ব্যথা আস্তে আস্তে কমে যাবে।

কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলেন মাথাব্যথা কমেছে, সহনীয় লাগছে, মনটাও একটু হালকা হয়েছে। কিন্তু পরে জানতে পারলেন - যে ওষুধটা খেয়েছিলেন সেটি আসলে কোনো কোনো সত্যিকারের ওষুধই নয়, হয়তো ওষুধের মতো দেখতে একটা ফাঁকা ক্যাপসুল বা লজেন্স! অবাক হবেন তো?

এটা মনগড়া গল্প বা প্রতারনা নয়। এর নাম প্লাসিবো ইফেক্ট। শুনতে অবাক লাগলেও, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি মানুষের মস্তিষ্কের শক্তির এক বাস্তব উদাহরণ।

Advertisement

প্লাসিবো ইফেক্ট আসলে কী?

প্লাসিবো মানে এমন একটি চিকিৎসা বা ওষুধ, যার মধ্যে সক্রিয় চিকিৎসাগত উপাদান নেই। তবু মানুষ এতে উপকার অনুভব করে। কেন? কারণ, বিশ্বাস ও প্রত্যাশা মস্তিষ্ককে এমনভাবে সক্রিয় করে, যা শরীরের ভেতর বাস্তব শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

মস্তিষ্ক কীভাবে এতে সাড়া দেয়?

নিউরোসায়েন্স বলছে, যখন কেউ বিশ্বাস করে যে সে ভালো হতে যাচ্ছে, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন, এন্ডরফিন ও অক্সিটোসিন এর মতো নিউরোকেমিক্যাল নিঃসৃত হয়। এগুলো ব্যথা কমাতে, মন ভালো রাখতে এবং স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমাতে সাহায্য করে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাসিবো গ্রহণের সময় মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলগুলো সক্রিয় হয়, যেগুলো আসল ওষুধ কাজ করার সময়ও সক্রিয় থাকে।

ব্যথা ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব

প্লাসিবো ইফেক্ট সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, মাইগ্রেন, ডিপ্রেশন ও অ্যাংজাইটি সংক্রান্ত গবেষণায়।

Advertisement

ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত একাধিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্লাসিবো ব্যথা কমাতে প্রায় আসল ওষুধের মতোই কাজ করেছে।

শুধু ‘ইতিবাচক চিন্তা’ বললেই কি সব ঠিক?

এখানে একটা ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। প্লাসিবো ইফেক্ট মানে এই নয় যে গুরুতর রোগে ওষুধের দরকার নেই। এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসার সহায়ক। তবে ইতিবাচক প্রত্যাশা চিকিৎসার ফলাফলকে শক্তিশালী করতে পারে - এটা এখন প্রমাণিত।

চিকিৎসায় এর ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন বলা হচ্ছে - রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের যোগাযোগ, আশ্বাস, ভাষা ও আচরণ - সবকিছু মিলিয়েই চিকিৎসা কাজ করে। রোগী যদি নিজেকে নিরাপদ ও আশাবাদী মনে করেন, তার স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত সাড়া দেয়। এ কারণেই বলা হয়, ভালো চিকিৎসা মানে শুধু প্রেসক্রিপশন নয়; বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্কও চিকিৎসার অংশ।

অর্থাৎ বিশ্বাস, আশা ও ইতিবাচক প্রত্যাশা শুধু মানসিক বিষয় নয়; এগুলো শরীরের ভেতর রাসায়নিক ও স্নায়বিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ওষুধের প্রয়োজন আছে, চিকিৎসার দরকার আছে; কিন্তু তার সঙ্গে যদি থাকে আশাবাদ, তাহলে সুস্থ হওয়ার পথটা অনেক সময় সহজ হয়।

সূত্র: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, দ্য ল্যানসেট জার্নাল, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ

এএমপি/জেআইএম