মতামত

নির্বাচনী আবহে বাড়ছে মাদকের প্রবাহ!

নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মুখে প্রতিশ্রুতির বন্যা নামে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, গণতন্ত্র—সবকিছুরই প্রতিশ্রুতি শোনা যায় মঞ্চে মঞ্চে। কিন্তু মাদকের মতো একটি ভয়ংকর সর্বগ্রাসী বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত নীরবতাকে বেছে নিয়েছ। যে মাদক প্রতিদিন তরুণদের ভবিষ্যৎ গিলে খাচ্ছে, পরিবার ভাঙছে, অপরাধ বাড়াচ্ছে এবং রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করছে, সেই মাদকের বিরুদ্ধে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট, শক্ত অবস্থান চোখে পড়ছে না।

Advertisement

এই নীরবতা কাকতালীয় নয়, এটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ফল। কারণ, মাদক কেবল অপরাধ নয় বরং রাজনীতির জন্য এটি একটি অর্থনীতি, একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, যার সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতি, পেশিশক্তি এবং নির্বাচনী বাস্তবতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই উন্নয়ন নিয়ে কথা বলা সহজ, মাদক নিয়ে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো সচেতনভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অথচ বাস্তবতা হলো, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, মাদকের প্রবাহ তত বাড়ে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা আর নতুন সিনথেটিক ড্রাগে বাজার সয়লাব হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন নির্বাচনী দায়িত্বে ব্যস্ত, তখন মাদক কারবারিরা মাঠ দখল করে নেয়। এই সত্য রাজনৈতিক দলগুলো জানে না—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তবু তারা চুপ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী, তারাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসের এই মহামারিকে নির্বাচনী এজেন্ডা হিসেবে বিবেচনাই করছে না।

Advertisement

মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ শুধু প্রশাসনিক স্লোগান হলে চলবে না; এটি হতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রশ্নে কার্যত নির্বাক।

এই নীরবতা আসলে নিরপেক্ষতা নয়—এটি দায় এড়ানোর কৌশল। কারণ, মাদক প্রশ্নে কথা বলতে গেলে ক্ষমতার অন্ধকার দিকগুলো সামনে চলে আসতে পারে। আসতে পারে পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্ন, আসতে পারে কালো টাকার রাজনীতি, আসতে পারে নির্বাচনী মাঠে পেশিশক্তির ভূমিকা। সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাজনৈতিক দলগুলোর নেই।

এই এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন তোলা খুবই প্রাসঙ্গিক,যে রাজনীতি মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, সেই রাজনীতি কি তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারবে? যে নেতৃত্ব মাদক নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতে ভয় পায়, তারা কি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক শক্তি রাখে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই চিরচেনা বাস্তবতাই আবার দৃশ্যমান। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন থেকে শুরু করে নতুন নতুন সিনথেটিক ড্রাগ—সবকিছুরই বাজার এখন রমরমা।

Advertisement

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সীমান্তবর্তী ৩২ জেলায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় মাদকের স্রোত থামছে না, বরং আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

কেন নির্বাচন এলেই বাড়ে মাদক?নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক লেনদেনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং পেশিশক্তির দাপট। এই সময়ে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ে, কালো টাকার ব্যবহার বেড়ে যায়, আর সেই টাকার বড় একটি অংশ যায় মাদক ও অস্ত্রের পেছনে।

রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, সমাবেশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশে অনেকেই মানসিক চাপ সামলাতে বা সাহস বাড়াতে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে—এটাই বাস্তবতা।

আরেকটি বড় কারণ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোযোগ বিভাজন। নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যস্ত থাকে প্রার্থীদের নিরাপত্তা, কেন্দ্র পাহারা, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে। এই সুযোগটাই নেয় মাদক কারবারিরা। সীমান্ত, মহাসড়ক, নদীপথ—সবখানেই নজরদারির ফাঁক খুঁজে বের করে তারা।

একাধিক সূত্র বলছে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩৮৬টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত মাদক প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। ভারত থেকে আসছে ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজা। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা। কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, ঘুমধুম, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন—এই নামগুলো এখন আর শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং ইয়াবা পাচারের পরিচিত রুট।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত উত্তর ও পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলের ঢল নামে। সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে আসে গাঁজা। এসব চালান শুধু সীমান্তেই আটকে থাকে না—ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরের অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছে যায় অত্যন্ত সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানই বলে দেয় পরিস্থিতির ভয়াবহতা। ২০২৪ সালে ৯১ হাজারের বেশি অভিযানে উদ্ধার হয় প্রায় ২৬ লাখ ইয়াবা। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ লাখে।

অর্থাৎ অভিযান বাড়লেও বাজার থামছে না—বরং চাহিদা ও সরবরাহ দুটোই বাড়ছে। এটি স্পষ্ট করে দেয়, মাদক সমস্যা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়; এটি একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট।

ঢাকার কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কড়াইল বস্তি, জেনেভা ক্যাম্প—এই এলাকাগুলো এখন কার্যত মাদক বিক্রির হটস্পট। মাদক বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই। কোথাও কোথাও শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে বাহক হিসেবে, কারণ তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

বস্তিগুলোতে বসবাসকারী কোটি মানুষের জীবন এই মাদক বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শিকার। ছোট বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে—এই অভিযোগ নতুন নয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা। জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো দলই মাদকবিরোধী অবস্থানকে প্রধান এজেন্ডা করছে না। তরুণ সমাজ মাদকে ধ্বংস হচ্ছে, অথচ রাজনীতির ভাষণে মাদক নেই। বরং নির্বাচনী প্রচারণায় বিড়ি-সিগারেট বিতরণ, তামাক ব্যবহার—সবই স্বাভাবিকভাবে চলছে, যা আইনবিরোধী।

ডিএনসির ভেতরের প্রশাসনিক দুর্বলতাও সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। নির্বাচনের আগে শতাধিক কর্মকর্তার বদলি, ঘুষের অভিযোগ, লাভজনক পোস্টিং নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা চ্যালেঞ্জের মুখে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি নিজেরাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে মাদকবিরোধী লড়াই কতটা কার্যকর হবে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশই নির্বাচনের সময় মাদক সমস্যার মুখে পড়ে। তবে সফল দেশগুলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করেছে।

বাংলাদেশকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে। নির্বাচনকালীন বিশেষ মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স, রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট অঙ্গীকার, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং তরুণদের জন্য বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি—এসব পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে হয় না।

নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। কিন্তু সেই উৎসব যদি মাদকের বিষে কলুষিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎই ঝুঁকিতে পড়ে। মাদক শুধু অপরাধ নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং,আমরা কি শুধু নির্বাচন পার করব, নাকি একটি সুস্থ প্রজন্ম ও নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার সাহস দেখাব?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।ahabibhme@gmail.com

এইচআর/জেআইএম