অর্থনীতি

অযৌক্তিক শুল্কহারই রাজস্ব লক্ষ্য পূরণে বড় বাধা

সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাণিজ্যবান্ধব শুল্কনীতি এবং যৌক্তিক করহার অপরিহার্য। অন্যদিকে, সম্পূরক ও আবগারি শুল্কনীতি সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

Advertisement

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘সম্পূরক ও আবগারি শুল্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজস্ব কার্যক্রম পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় এসব কথা বলা হয়।

পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল এইচ. খন্দকার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন এনবিআরের প্রথম সচিব মো: মশিউর রহমান।

সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা উচ্চহারের শুল্কমাত্রাকে উৎসাহিত করতে চাই না। তবে রাজস্ব আয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বর্তমানে আমাদের অভ্যন্তরীণ সম্পূরক শুল্কহারে প্রায় ১৭ হাজার আদর্শমাত্রা রয়েছে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। ক্ষুদ্র ও মধ্য আয়ের ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সন্তোষজনক নয়—এর একটি বড় কারণ হলো যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণের অভাব। তবে শুল্কনীতি প্রণয়নে ব্যক্তি করহার, কর্পোরেট করহারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।’

Advertisement

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘শুল্ক নির্ধারণসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে যেসব প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখছে, তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে। সে অনুযায়ী একটি বাণিজ্যবান্ধব শুল্কনীতি প্রণয়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

মূল প্রবন্ধে ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অন্যান্য দেশের তুলনায় জিডিপির বিপরীতে কর রাজস্বের অনুপাত প্রতিবছর কমছে। বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ আসে আবগারি শুল্ক থেকে, যা আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় পশ্চাৎপদ। দেশে কর্পোরেট করহার ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার আধুনিক বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে যেখানে পরিমাণভিত্তিক আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা মূলত দামের ওপর নির্ধারিত হয়। গবেষণার পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশের আবগারি শুল্ক কাঠামো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর শুল্কহার সুপারিশ করা হবে।’

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন এম গ্রুপের প্রধান হাফিজ চৌধুরী। তিনি এনবিআরের বর্তমান কাঠামো আবগারি শুল্ক নির্ধারণে ন্যায্য ও যৌক্তিক শুল্কহার নিরূপণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে—সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

Advertisement

সভাপতির বক্তব্যে ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘২০১২ সালের কর আইনে পরস্পরবিরোধী দাবির ফলস্বরূপ ২০১৯ সালে একটি যুগোপযোগী হলেও জটিল শুল্কনীতি প্রণীত হয়েছে। এই নীতি সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে একটি একক ও সহজ শুল্কব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তুলনামূলকভাবে দুই ধরনের শুল্কনীতি বেশি উপযোগী—ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নিম্নহার এবং অন্যদের জন্য একটি আদর্শহার। বর্তমানে আবগারি শুল্ক কাঠামোতে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে এক ধরনের শুল্কহার এবং দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম হার নির্ধারণ করা হয়। দেশে প্রায় ১,৪০০টি ট্যারিফ লাইন অনুসরণ করা হলেও আবগারি শুল্কের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১,৭০০টি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেশীয় পণ্যের ওপর আবগারি শুল্কহার আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার আলোকে এটি স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।’

সময়োপযোগী ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য অবশ্যই শুল্কনীতি সংস্কারে উদ্যোগ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন ড. সাত্তার।

কর্মশালার সমাপনী বক্তব্য দেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম। তিনি বক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান এবং আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কার বিষয়ে তথ্যভিত্তিক নীতি সংলাপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

আইএইচও/এমএমএআর