শিক্ষা

প্রাথমিকের ৯৩% শিক্ষক অপেশাদার কাজে ক্লান্ত, বছরে ব্যয় ১৭১০ কোটি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষক। জরিপ, মা সমাবেশসহ অসংখ্য অপেশাদার বা নন-প্রফেশনাল (শিক্ষকতার বাইরে) কাজ করতে হয় তাদের। এ কাজে সরকারের বছরে প্রায় এক হাজার ৭১০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়। একই সঙ্গে অপেশাদার কাজের কারণে প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষক কর্মক্লান্ত। তারা ক্লান্তির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে (লেট-স্টেজ বার্নআউট) রয়েছেন।

Advertisement

অপেশাদার বা অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। নন-প্রফেশনাল কাজের অতিরিক্ত চাপ প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মান, শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার্থীদের শিখনফলে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশা-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশ করা হয়।

৩৭ ধরনের অপেশাদার কাজ, সবচেয়ে বেশি জরিপপ্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গবেষণায় মোট ৩৭ প্রকারের অপেশাদার বা নন-প্রফেশনাল কাজ শনাক্ত করা হয়েছে, যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করতে হয়। এরমধ্যে বিভিন্ন ধরনের জরিপে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়। আর বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটে (শিক্ষার্থীদের বাড়ি পরিদর্শন) সর্বনিম্ন সময় ব্যয় হয়। নন-প্রফেশনাল কাজে মাসিক গড়ে শিক্ষকপ্রতি প্রায় ২৪ কর্মঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে।

Advertisement

গবেষণায় দেখা যায়, নন-প্রফেশনাল কাজে শিক্ষকরা বেশি সময় ব্যয় করলে সার্বিকভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে যায়। অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ৮৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারে না এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য ‘রেমিডিয়াল’ বা বিশেষ ক্লাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও ৮৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন—নন-প্রফেশনাল কাজের চাপের কারণে তারা এসব বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না।

শ্রম প্রশাসনিক কাজে শিক্ষকদের ব্যয় ১৯৬৬ কোটি টাকাঅর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বছরে প্রায় ১৯ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন (১ হাজার ৯৬৬ কোটি) টাকা সমমূল্যের শিক্ষক শ্রম প্রশাসনিক কাজে ব্যয়িত হচ্ছে। একজন সহকারী শিক্ষক গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪ হাজার ১১৬ দশমিক ১১ টাকার সমপরিমাণ সময় অপেশাদার কাজে ব্যয় করেন, যা বার্ষিক হিসেবে জনপ্রতি ৪৯ হাজার ৩৯৪ দশমিক ৫৫ টাকা।

সারাদেশে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩৪১ জন সহকারী শিক্ষকের নন-প্রফেশনাল কাজের পেছনে বছরে মোট ১ হাজার ৭১০ কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার ৭৫১ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এটি সরাসরি শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ হলেও এর সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।

Advertisement

কর্মক্লান্তির শেষ স্তরে ৯২.৬৯ শতাংশ শিক্ষকগবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকরা সহকারী শিক্ষকদের তুলনায় বেশি সময় (গড়ে ২৭ দশমিক ৭৪ ঘণ্টা) নন-প্রফেশনাল কাজে ব্যয় করেন। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব শিক্ষকের ক্ষেত্রে কর্মক্লান্তি বা বার্নআউট নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে (২১৯ জন), তাদের মধ্যে ৯২ দশমিক ৬৯ শতাংশ ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এ ভুগছেন।

গবেষণার আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নন-প্রফেশনাল কাজের অতিরিক্ত চাপ শিক্ষার মান, শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল—সবকিছুকেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

গবেষণার নেতিবাচক প্রভাব কাটাতে সুপারিশক্লাস চলাকালীন কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজ শিক্ষকদের ওপর প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ করতে হবে। একক ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে সব দাপ্তরিক কাজ সমন্বয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যেন শিক্ষার গুণগত মান ও ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি ‘Teaching Hour Protection Policy’ প্রণয়ন করা হয়।

যা বললেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টাপ্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হলরুমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।

তিনি বলেন, এ গবেষণার তথ্য হয়তো নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে, তবে এর উদ্দেশ্য আরও বৃহৎ—এনজিও, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে সরকারের ওপর একটি ইতিবাচক চাপ তৈরি হয় এবং শিক্ষকদের শিক্ষার বাইরে নানান কাজে ব্যবহার না করা হয়।

উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় বলেন, শিক্ষা খাতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো একটি বড় বাস্তবতা। এটি এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়; জাতীয় পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।

এএএইচ/এমকেআর