শেয়ারবাজারে মাঝে মাঝেই এমন কিছু কোম্পানির আবির্ভাব ঘটে, যাদের শেয়ারদর আচমকা আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এগুলো তখন যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে উঠে। দেখতে লোভনীয়, ছুঁতে পারলে লাভের নিশ্চয়তা, কিন্তু বাস্তবে যার পেছনে থাকে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির দীর্ঘ ছায়া। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ অটোকারস লিমিটেড তেমনই এক আলোচিত নাম।
Advertisement
মাত্র এক মাসে প্রায় ১০০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি, সংখ্যাটি নিজেই বিস্ময়কর। গত ৮ মার্চ যেখানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১২৬ টাকা ১০ পয়সা, সেখানে এক মাস পর ১৩ এপ্রিল তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৬ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ খুব অল্প সময়েই শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ১২০ টাকা ৪০ পয়সা। আর পাঁচ মাসের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪৮ শতাংশ।
এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। কেউ কেউ অল্প সময়েই বড় অঙ্কের মুনাফা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৮ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ারে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে বর্তমানে তার মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৯৭ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সাড়ে ৯ লাখ টাকার বেশি মুনাফা।
আবার এই বিনিয়োগ যদি আরও একটু আগে হয়ে থাকে তাহলে মুনাফার পরিমাণ আরও আকর্ষণীয়। গত ১৩ নভেম্বর কোম্পানিটির প্রতটি শেয়ারের দাম ছিলো ৯৯ টাকা ৪০ পয়সা। যদি কোনো বিনিয়োগকারী সে সময় কোম্পানিটির ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনে ধরে রাখেন, তাহলে বর্তমানে তার বাজার মূল্য ২৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ টাকা। অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা পাঁচ মাস বিনিয়োগ করে মুনাফা হয়েছে ১৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকার বেশি। এই মুনাফার হার ১৪৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই মুনাফা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো।
Advertisement
কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনের বাস্তবতা কতটা শক্ত? এখানেই শুরু হয় প্রশ্ন। কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ৫ পয়সা। এই আয়ের ভিত্তিতে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী কোম্পানিটির মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৫, যা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, প্রায় অবাস্তব।
সহজভাবে বললে, কোম্পানির বর্তমান আয়ের ধারা অপরিবর্তিত থাকলে একজন বিনিয়োগকারীর তার বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে সময় লাগবে দুই হাজার ৪৬৫ বছর বেশি। শেয়ারবাজারের বাস্তবতায় এমন হিসাব কার্যত সতর্ক সংকেত হিসেবেই বিবেচিত হয়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে কী আছে? বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এর পেছনে থাকতে পারে ‘বিশেষ চক্র’ বা সংগঠিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর প্রভাব। বাংলাদেশ অটোকারসের মোট শেয়ার সংখ্যা মাত্র ৪৩ লাখের কিছু বেশি। ফলে তুলনামূলক কম মূলধন দিয়েই শেয়ারটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়।
আরও একটি বিষয় বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো কোম্পানির লভ্যাংশ ইতিহাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোম্পানিটি মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। যদিও আগে কিছু বছর ৪ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল, তবুও তা বিনিয়োগকারীদের জন্য খুব আকর্ষণীয় নয়। এই বাস্তবতার সঙ্গে বর্তমান শেয়ারদরের উল্লম্ফন যেন কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
Advertisement
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ইতোমধ্যে কোম্পানিটিকে এ বিষয়ে নোটিশ দিয়েছে। তবে জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেয়ারদর বৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে, যদি মৌলভিত্তিতে পরিবর্তন না ঘটে, তবে এই উত্থান কেন?
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। অনেক সময় বিশেষ কিছু পক্ষ আগাম তথ্য পেয়ে যায় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে আগেই অবস্থান নিয়ে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশ অটোকারসের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ অটোকারস এখন শেয়ারবাজারে এক আলোচিত ধাঁধা। এর শেয়ারদর বিনিয়োগকারীদের চোখে ‘সোনার হরিণ’- এর মতো ঝলমলে হলেও, এর পেছনের আর্থিক ভিত্তি সেই আলোকে কতটা সমর্থন করে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শেয়ারবাজারে শুধু দামের পেছনে ছুটলে চলবে না, দেখতে হবে কোম্পানির ভিত্তি, আয়, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি। কারণ ‘সোনার হরিণ’ ধরতে গিয়ে অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা হারিয়ে ফেলেন নিজেদের সঞ্চিত পুঁজি।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, আমরা হিসাবে করে দেখেছি পরিচালকদের শেয়ার বাদ দিয়ে কোম্পানিটির সব শেয়ার কিনতে কিছুদিন আগে লাগতো ৩০-৪০ কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ ৩০ কোটি টাকা দিয়েই কোম্পানিটির শেয়ারে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আসা সম্ভব। আর বর্তমানে দাম বিবেচনায় নিলে ৬০-৭০ কোটি টাকা দিয়েই কোম্পানিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারে গুটি কয়েক বিনিয়োগকারীর পক্ষ যোগসাজশ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং দাম বাড়ানো সম্ভব। অটোকারের শেয়ার দাম বাড়ার পিছনে এমন কোনো ঘটনা আছে কি না, তা ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। কোনো বিশেষ গ্রুপের ভূমিকা না থাকলে এভাবে শেয়ার দাম বাড়ার কথা না।
ডিএসইর আর এক সদস্য বলেন, শেয়ারবাজারে মুনাফা করার সব থেকে বড় হাতিয়ার আগাম তথ্য পাওয়া। অনেক সময় দেখা যায়- একটি কোম্পানি বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনা করছে, কিন্তু প্রকাশের উপযুক্ত সময় না হওয়ায় সেই তথ্য মূল্যসংবেদশীল হিসেবে প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই তথ্য হয়তো কোনো গ্রুপ পেয়ে গেলো এবং তারা ধিরে ধিরে কোম্পানিটির বড় অংশ শেয়ার কিনে নিলেন। এরপর বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে থাকেন। এর মধ্যে মূল্যসংবেদশীল তথ্য প্রকাশের উপযুক্ত সময় চলে আসে এবং কোম্পানি তা প্রকাশ করে। এতে নতুন করে ওই শেয়ারে আগ্রহ তৈরি হয় এবং আগে যারা শেয়ার কিনে রেখেছিলেন,তারা বাড়তি দামে বিক্রি করে মোটা মুনাফা করেন।
তিনি বলেন, শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিই রেশিও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তবে একমাত্র পিই রেশিও দিয়ে পুরোপুরি ঝুঁকি নির্ণয় করা যায় না। কারণ কোম্পানি হঠাৎ বড় মুনাফা করলে পিই রেশিও অনেক কমে আসে। সুতরাং ভবিষ্যতে যে কোম্পানির বড় মুনাফা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তার ঝুঁকি নির্ণয় শুধু পিই রেশিও দিয়ে করা সম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে এক পক্ষ লাভ করে, আরেক পক্ষ লোকসান করে। সঠিক সময়ে যারা বিনিয়োগ করতে পারেন, তারা ভালো লাভ করতে পারেন। আর যারা ভুল সময়ে বা অতিরিক্ত দামে শেয়ার কিনেন, তারা লোকসানের মধ্যে পড়তে পারেন। সুতরাং নিজের পুঁজির নিরাপত্তার জন্য বিনিয়োগকারীকে সব তথ্য ভালোভাবে পর্যালোচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
১৯৮৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ৪৩ লাখ ২৬ হাজার ১৩টি। এর মধ্যে ৩০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার আছে।
এমএএস/জেএইচ