বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। জলবায়ু সংকটে আমাদের দেশ ধীরে ধীরে মহা বিপদের দিকে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে হাহাকার। হাজার মাইল দূরে যুদ্ধ হয়, তার আঁচে চলেনা আমাদের কলকারখানা গাড়ি। তাই আগামী দিনের জন্য একটা বিকল্প ভাবতে হবে।
Advertisement
জ্ঞান অর্জনের জন্য চীন দেশে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা সেখান থেকে ধারণা নিতে পারি।
২০২৪ সালে গ্রিডে ৩৬০ গিগাওয়াট এবং ২০২৫ সালে ৪৩০ গিগাওয়াট নতুন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ সংযোজন করেছে চীন। গ্রিন টেকনোলজি এখন দেশটির রফতানির বড় অংশ এবং অর্থনীতিরও উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে চীনের। সৌর বিদ্যুতে পাকিস্তান সফল। আমরা কেন পারছিনা। আগামী বাংলাদেশের জন্য চীনের গ্রিন টেকনোলজি আমাদের দেশে আনতে হবে।
নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিয়ে কয়েক দশক ধরে তৎপরতা দেখা গেলেও বিশ্ব এখনো জ্বালানি তেলের কাছেই বন্দী। যা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি জলবায়ু সংকটের ক্ষতিকেও বাড়িয়ে তুলছে।
Advertisement
পুরাতন জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় মিথেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ওঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মিথেন নিঃসরণ কমানো গেলে ২০৪০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো সম্ভব। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে এর উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ায় এটি মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ। উচ্চ দামের বাজারে কোম্পানিগুলো মিথেন ক্রেডিট বিক্রি করতেও উৎসাহিত হয়। সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো সবুজ রূপান্তর হয়নি, এবং হতে পারে না। তিনি বলেন, ‘কার্যকর রূপান্তরের জন্য পরিবহন খাতকে বিদ্যুতায়ন করতে হবে, বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, উৎপাদক ও ভোক্তাদের প্রাথমিক ভর্তুকি দিতে হবে, চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে।’
বর্তনমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও বাস্তবতা পুরোপুরি বদলায়নি। প্রথমবারের মতো কম-কার্বন নিঃসরণকারী উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কয়লাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। চীন ও ভারতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে, যা ১৯৭০-এর পর প্রথম। তবুও যুদ্ধের বাস্তবতা দেখিয়েছে, অনেক শক্তিশালী দেশ এখনো জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম থেকে লাভবান হচ্ছে।
যেমন, মার্কিন জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাত ইরান যুদ্ধ থেকে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত আয় করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের চাপে থাকা রাশিয়া উচ্চ পণ্যমূল্যের কারণে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। ইরানের হামলার মুখে পড়লেও সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি আরামকোর শেয়ারদর বেড়েছে। এমনকি ইরানও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতির মাঝে জ্বালানি তেল বিক্রি বাবদ আয় বাড়িয়েছে। এ উচ্চ মূল্য তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য এক ধরনের বোনাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবার এ অবস্থার মধ্যেই জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে চীন। প্রায় দুই বছর ধরে তাদের কার্বন নিঃসরণের হার স্থির বা নিম্নমুখী। ২০২৪ সালে গ্রিডে ৩৬০ গিগাওয়াট এবং ২০২৫ সালে ৪৩০ গিগাওয়াট নতুন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ সংযোজন করেছে দেশটি। গ্রিন টেকনোলজি এখন দেশটির রফতানির বড় অংশ এবং অর্থনীতিরও উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। যদিও কয়লার ব্যবহার এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে পারে।
Advertisement
রূপান্তরের দৌড়ে শামিল রয়েছে ভারতও। দেশটি ২০৩৫ সালের মধ্যে কম-কার্বন উৎস থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং গত বছর ৪৫ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা যোগ করেছে। তাদের এ লক্ষ্য ২০৩০ সালেই অর্জিত হতে পারে। তবুও ভারত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ তারা সম্পূর্ণ রূপান্তরের বদলে একটি ‘হাইব্রিড’ পথ অনুসরণ করছে।
জার্মানি নবায়নযোগ্য শক্তিতে পথিকৃৎ হলেও এখনো গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এবং কিছু সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসছে। জাপানের জলবায়ু পরিকল্পনাও বিশ্লেষকদের কাছে দুর্বল বলে বিবেচিত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ‘ন্যায়সংগত রূপান্তর’ পরিকল্পনায় এগোলেও বাস্তবায়নে নানা বাধার মুখে পড়েছে। দেশটিতে কয়লা উৎপাদন বেড়েছে, নবায়নযোগ্য খাতের বিনিয়োগ আটকে গেছে, এমনকি বড় আকারে বন উজাড়ও চলছে।
ইরান যুদ্ধ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতাকে খোলাখুলি দেখানোর পাশাপাশি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১০টি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ মোট নিঃসরণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী, এবং তাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। আমরা কি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে এগোব, নাকি জ্বালানি তেলের ওপর আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ব? সেই সিদ্ধান্ত নেবার সময় এখনই।
লেখক : সাংবাদিক।
এইচআর/এমএস