দেশজুড়ে

গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে গাছ কাটার মহোৎসব

শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় প্রায় ২২ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত শাল-গজারি বাগান রয়েছে কয়েক হাজার একর। দীর্ঘদিন থেকেই এসব বনভূমিতে প্রায় প্রতিরাতেই হানা দিচ্ছে কাঠ চোরা কারবারিরা। এমনকি সংশ্লিষ্ট এলাকার উপকারভোগী বা (বাগান রক্ষণাবেক্ষণ পার্টিসিপেন্ট সদস্য) অনেক সদস্য নিজেরাই এ গাছ চুরির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে বনবিভাগ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের জোরালো ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

Advertisement

রোববার (১২ এপ্রিল) শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের রানীশিমূল ইউনিয়নের বালিজুরি রেঞ্জের সদর বিট এলাকার বন বাগান থেকে বনের গাছ ও গাছ কাটার ব্যবহৃত সরঞ্জামসহ ২ কারবারিকে গ্রেফতার করেছে বনবিভাগ।

গ্রেফতার হলেন- হালুয়াহাটি গ্রামের মৃত আব্দুস সালামের ছেলে জজ মিয়া (৫০) ও বালিজুরি এলাকার কাসেম আলীর ছেলে জুমুর আলী (৪০)।

বনবিভাগের বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১২ এপ্রিল সকালে বালিজুরি রেঞ্জের সদর বিটের আওতাধীন ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরের সৃজিত ৪০ হাজার হেক্টর তৃতীয় আবর্তের উডলট বাগান থেকে আকাশমনি গাছ কাটা হচ্ছে এমন তথ্য পাওয়া যায়। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া নেতৃত্বে বালিজুরি সদর বিট কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে বনবিভাগের একটি দল অভিযান চালিয়ে ২ জনকে আটক করে। আর বনবিভাগের লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে বালিজুরি অফিস পাড়া এলাকার মোজাহাত আলীর ছেলে লাল চাঁন বাদশাসহ তার অন্য সহযোগীরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে কাঠ পাচারের কাজে ব্যবহৃত ১টি ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান, ১২ টুকরা আকাশমনি গোল কাঠ ১০ ঘনফুট, ৪টি আকাশমনি গাছের মোথা, ২টি হাত করাত ও ১টি দা উদ্ধার করা হয়।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১১ এপ্রিল প্রকাশ্যে দিনের বেলায় রাংটিয়া রেঞ্জের গজনী বিট এলাকায় অসংখ্য কাটা গাছ উদ্ধার করেছে বনবিভাগ। অভিযান টের পেয়ে কারবারিরা পালিয়ে গেছে।

অপরদিকে রাংটিয়া রেঞ্জের গজনি বিট এলাকায় ১১ এপ্রিল বিকেলে সামাজিক বনায়নের একটি বাগান থেকে বাগানের উপকারভোগী ফাইজুদ্দিন এবং তার সহযোগী সামেদুল মিলে প্রায় ১০টি আকাশমনি গাছ কেটে টুকরো করে পাচারের পরিকল্পনা করছিলেন। এ সময় খবর পেয়ে সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী কমিটির সভাপতি দুলাল মন্ডল ও তার সহযোগীদের নিয়ে গাছগুলো আটক করে। এদিকে অভিযানের খবর পেয়ে ফয়েজ উদ্দিন ও সামিদুল পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় গজনি বীটের অফিসার আবু সালেহীনকে খবর দিলে গাছগুলো জব্দ করে বিট কার্যালয়ে নিয়ে যায়।

সামাজিক বয়ায়ন কমিটির সভাপতি দুলাল মন্ডল বলেন, ফয়জুদ্দিন একজন উপকারভোগী হয়েও তিনি নিজেই এই বাগানটি গোপনে ৮ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন চোরদের মাধ্যমে প্রায় প্রতি রাতেই গাছগুলো কেটে দিচ্ছেন।

গজনি বেটের বিট কর্মকর্তা আবু সালেহীন জানায়, গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ফাইজুর ও সামিদুল বনের পার্টিসিপেন্ট। তারাও চোরা কারবারির সঙ্গে জড়িত। চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে বনবিভাগের মামলার প্রস্তুতি চলছে।

Advertisement

সেভ দ্যা ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড ন্যাচারের (সোয়ান) শেরপুরের যুগ্ম আহ্বায়ক জিহাদ মিয়া বলেন, বিশাল গারো পাহাড় পরিবেশের অলংকার। বনখেকোদের ভয়াল থাবা হতে গারো পাহাড়কে রক্ষা করতে হবে। দিনদিন গারো পাহাড়ের বনভূমির পরিমাণ কমে আসছে আর বসতি বাড়ছে। বনবিভাগের লোকজনের সঙ্গে কারবারিরা রাজনৈতিক নাম পরিচয় ভাঙিয়ে হুমকিও দেন। এছাড়াও নানান সময় নানানভাবে হুমকি দেন। রাজনৈতিক পরিচয়ে যারা গারো পাহাড়ের সম্পদ লুটপাট করছে, তারা মূলত পেশাদার চোরা কারবারি। তাদের পরিচয় একটাই, তারা পাহাড়ের চোরা কারবারি। তাদের রুখতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বনবিভাগ, রাজনৈতিক নেতাদের, সচেতন নাগরিক, পরিবেশবাদী সংগঠন সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

রাংটিয়া রেঞ্জের গজনি বিট কর্মকর্তা আবু সালেহীন বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। ১১ তারিখে অভিযানে কৌশলে কারবারিরা পালিয়ে যায়। তবে এসময় বিপুল পরিমাণ কাটা গাছ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।

ময়মনসিংহ বনবিভাগের বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া জানান, বনবিভাগ অভিযানে জজ মিয়া ও জুমুর আলীকে ধরতে সক্ষম হয়। তারা পাহাড়ি অঞ্চলের পেশাদার কাঠ চোর বলে পরিচিত। অভিযানের সময় জুমুর আলীদের সহযোগী লাল চাঁন বাদশা পালিয়ে গেছে। তাদের দুইজনকে শেরপুরের আদালতে পাঠানো হয়েছে। বনের গাছ চুরি প্রতিরোধে বনবিভাগের দিনে ও রাতে টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বনজ সম্পদ রক্ষার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এমএনআইএমমো. নাঈম ইসলাম/এনএইচআর/এমএস