কোনো পদক্ষেপেই কাটছে না জ্বালানি খাতের অস্থিরতা। পেট্রোল-অকটেনের জন্য পাম্পে দীর্ঘ লাইন এখনো নৈমিত্তিক বিষয়। সরকার রেশনিং, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, ফুয়েল পাসসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও কাটছে না সংকট।
Advertisement
সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, অতিরিক্ত চাহিদা এবং কিছু ক্ষেত্রে মজুতদারির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে সরকার স্বল্পমেয়াদি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার—দুই ধরনের উদ্যোগই হাতে নিয়েছে।
সরকারের যত উদ্যোগঅস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ‘ফুয়েল পাস’ চালুর উদ্যোগ। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ থাকবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ নিয়ন্ত্রিত হবে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ, পুনরায় বিক্রি বা মজুত করার সুযোগ কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে কারিগরি সমস্যার কারণে এ উদ্যোগ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তবুও এটি ভবিষ্যতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাম্পে বড় হচ্ছে লাইন
Advertisement
পাশাপাশি সরকার পেট্রোল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের এই দায়িত্ব দিয়ে পাম্প পর্যায়ে সরাসরি বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। তারা প্রতিদিন জ্বালানি বিক্রি, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ফলে পাম্পগুলোতে অনিয়ম, অতিরিক্ত বিক্রি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এ সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। তারপরও আমরা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখেছি। গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ছিল এখনো একই রয়েছে। অনেকে প্যানিক বায়িং করছেন। আর অবৈধ তেল মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান চলমান।-বিপিসির পরিচালক (বিপণন) ও সরকারের যুগ্ম সচিব মো. সাবেত আলী
জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে সরকার ডিজিটালাইজেশনের দিকেও জোর দিচ্ছে। প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে রেকর্ড রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে কোন যানবাহন কত জ্বালানি নিচ্ছে তা সহজেই ট্র্যাক করা যায়। এতে কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত ও বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকা এবং ডিপোগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে জ্বালানি পাচার বা অবৈধ লেনদেন বন্ধ করা যায়।
Advertisement
সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নেও কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডিপো থেকে জ্বালানি উত্তোলন ও পরিবহনের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে দ্রুত পাম্পে জ্বালানি পৌঁছানো যায়। চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ সমন্বয় করাও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে কোথাও অতিরিক্ত সংকট তৈরি হওয়া কমানো সম্ভব হচ্ছে।
অস্থিরতার সময় সরকার কিছু ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি বিক্রির নির্দেশও দিয়েছিল। মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়ায় বেশি সংখ্যক গ্রাহক যাতে জ্বালানি পেতে পারেন সেই সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
এমন চিত্র এখনো প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে
এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি দপ্তরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার, বাজার ব্যবস্থাপনার সংস্কার ও নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়েও কাজ করছে সরকার। তবে এত কিছুর পরেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের সারি দীর্ঘ হচ্ছে।
বর্তমান মজুত পরিস্থিতিদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী। বুধবার (১৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চলতি (এপ্রিল) মাস তো বটেই, আগামী দুই মাসেও দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট তৈরি হবে না।
আরও পড়ুন
পাম্পে থাকছেন না ‘ট্যাগ অফিসার’, তেল বিতরণে সেই বিশৃঙ্খলাতেলের জন্য হাহাকার, লাইনে পুড়ছে সময়, অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টাআগামী দুই মাসেও দেশে জ্বালানি তেলের সংকট হবে নাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত-সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, উদ্বেগের কারণ নেই
বর্তমান মজুত পরিস্থিতি তুলে ধরে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে বর্তমানে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন। এছাড়া জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরাবাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (বিপণন) ও সরকারের যুগ্ম সচিব মো. সাবেত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। তারপরও আমরা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখেছি। গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ছিল এখনো একই রয়েছে। অনেকে প্যানিক বায়িং করছেন। আর অবৈধ তেলের মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান চলমান।’
সংকটের এই সময় পুরো প্রক্রিয়াটাকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রতিদিন নতুন নতুন গাড়ি বিক্রি হচ্ছে, চাহিদা তো বাড়ছে। কিন্তু পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা তো বাড়ছে না, এজন্য এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। যুদ্ধ নিয়ে যেহেতু নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না, সেহেতু আমাদের জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে।-জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস এবং পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি মনিটরিং না থাকতো তাহলে আরও বিশৃঙ্খলা ঘটতো। গত মাসে যারা অবৈধভাবে মজুত করেছিল সেই তেল এখন বের হয়ে আসছে, অভিযানে ধরা পড়ছে। মনিটরিং শুরু হওয়ার পর খোলাবাজারে আর তেল যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
অবৈধ মজুত থামছে না বিশেষজ্ঞ মতবাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের পদক্ষেপ সঠিক ছিল, কিন্তু সেগুলো দিয়েও কাজ হয়নি। মানুষের মাথায় যখন একটি বিষয় ঢুকে গেছে যে, শর্টেজ হতে পারে, তারা একটা প্যানিকে চলে গেছে। অনেকেই বাসায় রেখেছে যে যদি আমি তেল না পাই তাহলে এটা দিয়ে চালাবো। স্পেশালি রাইডাররা। এজন্য রাইডারদের জন্য স্পেশালি কোনো একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তাদের তো এটা জীবিকা। অন্য কেউ যেমন না পেলে হাঁটলো কিন্তু তাদের তো এটা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘সংকটের এই সময় পুরো প্রক্রিয়াটা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রতিদিন নতুন নতুন গাড়ি বিক্রি হচ্ছে, চাহিদা তো বাড়ছে। কিন্তু পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা তো বাড়ছে না, এজন্য এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। যুদ্ধ নিয়ে যেহেতু নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না, সেহেতু আমাদের জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে।’
এনএস/এএসএ/এমএফএ