ধর্ম মানুষকে সম্প্রীতি ও পরমত সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। ইসলাম কেবল মুসলমানদের মধ্যেই নয়, বরং সব মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়।
Advertisement
ইসলাম এমন এক শান্তিপ্রিয় ধর্ম, যেখানে সব ধর্মের অনুসারীদের সম্মানের শিক্ষা দেয়। প্রেম-প্রীতি, সৌহার্দ্য আর শান্তি ও সম্প্রীতির এক পরিমণ্ডল বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। অন্য কথায়, আল্লাহতায়ালার প্রতি বিশ্বস্ততার হক আদায়ে এবং তার সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধ আচরণের মাধ্যমে এ বিশ্ব এক স্বর্গ রাজ্যে পরিণত করা।
ধর্মীয় বিষয়ে একে অপরের সাথে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তাই বলে ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে কাউকে হত্যা করা বা উপাসনালয় জ্বালিয়ে দিয়ে প্রমাণ করবো আমিই শ্রেষ্ঠ? অবশ্যই না।
কেননা, প্রকৃত ইসলামের আকর্ষণীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রসার জোর-জবরদস্তি এবং বল প্রয়োগে নয়, বরং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করার মাধ্যমে সম্ভব। বল প্রয়োগ করলে অন্যের অধিকার যেমন : দেওয়া যায় না, তেমনি আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভও এর দ্বারা সম্ভব নয়।
Advertisement
ইসলামে মুসলমান ও অমুসলমানের সম-অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলাম শত্রুদের সাথেও দয়ার্দ্র আচরণ করে, তা শান্তিকালীন সময়েই হোক বা যুদ্ধাবস্থায়ই হোক। সর্বাবস্থায় ইসলাম অমুসলমানদের অধিকার মর্যাদার সাথে সংরক্ষণ করে।
বিদ্বেষ ছড়ানো ও আক্রমণের অধিকার ইসলামে নেই। চড়াও হওয়া বা আক্রমণ করার অধিকার ইসলামে নেই। ইসলামের বাস্তব শিক্ষা হলো, কেবল আক্রান্ত হলেই তুমি যুদ্ধ করতে পার। অধিকন্তু, ইসলামে এ নির্দেশও রয়েছে যে, আক্রমণকারী বা আগ্রাসী হয়ো না, চুক্তি ভঙ্গকারী হয়ো না। আগ্রাসন বলতে কী বুঝায়?
সে যুগে ইসলাম বিরোধীরা পরাজিত সৈন্যদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে বিকৃত করতো, এটা সমর নীতির পরিপন্থি, জিঘাংসামূলক অত্যন্ত গর্হিত এক কর্ম। ইসলামে এটি নিষিদ্ধ। শিশু ও নারীদের হত্যা করাও নিষিদ্ধ। এছাড়া কোনো ফলবান বৃক্ষ নষ্ট না করার শিক্ষাও ইসলাম প্রদান করেছে এবং ধমীর্য় নেতাদের পাদরি-পুরোহিত, রাব্বী, প্রমুখদেরকে তাদের উপাসনালয়ে হত্যা করা সম্পূর্ণ অবৈধ করা হয়েছে। অন্য কথায়, যুদ্ধ কেবল মাত্র সমরক্ষেত্রেই সংঘটিত হতে পারে। অথবা অন্য কোনো বিকল্প খুঁজে না পেয়ে যদি শহর বা নগরে যুদ্ধ করতে বাধ্যও হতে হয়, তবুও কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা যেতে পারে, যারা বিরোধিতায় আগ বাড়িয়ে অস্ত্র ধারণ করে আক্রমণ চালিয়েছে।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা কতই না সম্প্রীতির শিক্ষা ছিলো দেখুন, হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত রসুল করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ, সে মুমিন নয়, কসম আল্লাহর! সে মুমিন নয়, খোদার কসম! সে মুমিন নয়। বলা হলো, কে সে ইয়া রসুলুল্লাহ? তিনি (সা.) বললেন, যার অত্যাচার থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারি)
Advertisement
আমরা আজ এটাই দেখছি যে, সুন্দর, সাবলীল ও সুগঠিত এই সব ইসলামি শিক্ষার ওপর কেউ আমল করছে না। বিভিন্ন দেশে নৈরাজ্যকারীরা ধর্মের নামে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করতেও পিছপা হচ্ছে না।
একটু ভেবে দেখুন, সেদিন জন্মভূমি মক্কার পুনরুদ্ধারে ইসলামের অনুসারীদের দয়ার তলোয়ার প্রতিশোধের রক্তে রঞ্জিত হয়নি। ওয়াহশী, হিন্দা আর ইকরামা বিন আবু জাহালের মতো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরাও শুধু ইসলামের বদৌলতে উদারতার নিরাপদ চাদরে আশ্রয় পেয়েছিল। আরব জাহানের একচ্ছত্র অধিপতি বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে ‘আজ তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ বা তিরস্কার নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত’। এই মহানুভবতার মাধ্যমে তিনি চিরশত্রুদের ক্ষমা করে ইসলামের ইতিহাসে ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যার ফলে মক্কাবাসী দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
আজ আমরা অনেক ক্ষেত্রে মহানবির সেই ক্ষমা ও সম্প্রীতির শিক্ষা ভুলে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছি। মহানবির (সা.) মৃত্যুর অল্পদিন আগে বিদায় হজের সময় বিরাট ইসলামি সমাগমকে সম্বোধন করে তিনি (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তোমাদের আদি পিতাও এক। একজন আরব একজন অনারব থেকে কোনো মতেই শ্রেষ্ঠ নয়। তেমনি একজন আরবের ওপরে একজন অনারবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। একজন সাদা চামড়ার মানুষ একজন কালো চামড়ার মানুষের চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়, কালোও সাদার চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়। শ্রেষ্ঠত্বের মূল্যায়ন করতে বিচার্য বিষয় হবে, কে আল্লাহ ও বান্দার হক কতদূর আদায় করলো। এর দ্বারা আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বাপেক্ষা বেশি ধর্মপরায়ণ।’ (বায়হাকি)
এই মহান শব্দগুলো ইসলামের উচ্চতম আদর্শ ও শ্রেষ্ঠতম নীতিমালার একটি দিক উজ্জ্বলভাবে চিত্রায়িত করেছে। শতধা বিভক্ত একটি সমাজকে অত্যাধুনিক গণতন্ত্রের সমতাভিত্তিক সমাজে ঐক্যবদ্ধ করার কী অসাধারণ উদাত্ত আহ্বান।
বিশ্বাসের স্বাধীনতা হচ্ছে সব মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলাম ধর্মের বিধান মতে ‘ধর্ম’ হচ্ছে নিজ, পছন্দের একটি বিষয়। এ ধর্ম একটি সুস্পষ্ট ধর্ম। এই ধর্ম গ্রহণের পরেও চাইলে কেউ এটা ত্যাগ করতে পারে, কোনো জোর নেই, তবে এর বিচার সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজ হাতেই করেন। ধর্মে যদি বল প্রয়োগের বিধান থাকতো, তাহলে মহানবি (সা.) মক্কা বিজয়ের পর অমুসলমানদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য বাধ্য করতেন এবং মক্কায় বসবাসের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই। এতে প্রমাণিত হয়, ধর্মের জন্য বল প্রয়োগ ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের আদর্শ হলো শত্রুর সাথেও বন্ধুসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
মক্কা বিজয়ের পর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমবেত জনতার উদ্দেশে এ আওয়াজই বুলন্দ করেছিলেন- ‘সকল প্রশংসা সেই মহান সত্তার, যিনি তোমাদেরকে মূর্খ কালের অহংকার থেকে মুক্ত করেছেন। সকল মানুষ এক আদমের সন্তান। আর আল্লাহ আদম (আ.)কে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (তিরমিজি)
সুতরাং একই পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে গোটা মানব জাতি ভাই ভাই; কেউ কারো পর নয়। সে জন্য-এ পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে একই পরিবারভুক্ত ভাই ভাই হয়ে অবিচ্ছেদ্যভাবে সৌহার্দ্য বজায় রেখে।
আমার ধর্মের সাথে, আমার মতের সাথে, আমার বিশ্বাসের সাথে এবং আমার ইবাদতের পদ্ধতির সাথে আরেকজন একমত নাও হতে পারেন, তাই বলে কি তার বিরুদ্ধে আমাকে অবস্থান নিতে হবে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো ধর্মীয় ফেরকাকে পছন্দ নাও করতে পারি, তাই বলে এ নিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলার কোনো অনুমতি ইসলাম কেন, কোনো ধর্মই দেয় না। আমাদের দেশেও একটি মহল বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পাঁয়তারা করে আর বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ করে আসছে, কিন্তু এ দেশের সচেতন নাগরিক বরাবরই তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা কতই না সম্প্রীতির শিক্ষা ছিলো দেখুন, হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত রসুল করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ, সে মুমিন নয়, কসম আল্লাহর! সে মুমিন নয়, খোদার কসম! সে মুমিন নয়। বলা হলো, কে সে ইয়া রসুলুল্লাহ? তিনি (সা.) বললেন, যার অত্যাচার থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারি)
অপর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেট পুরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী থাকে অভুক্ত, সে মুমিন নয়।’ (বায়হাকি) সম্প্রীতির এ ঢেউ মুমিনের আঙিনাতে থেমে থাকেনি, আছড়ে পড়েছে অমুসলিমেরও দুয়ারে। নিজ ঘরে বকরি জবাইয়ের সংবাদ শ্রবণে আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের উদ্বেগ কাতর স্বর- আমাদের প্রতিবেশী ইহুদির গৃহে তোমরা পাঠিয়েছ কি? তোমরা কি আমাদের প্রতিবেশী ইয়াহুদীকে হাদিয়া দিয়েছ? (তিরমিজি)
সম্প্রীতির এমন চমৎকার সব উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ভুলে সমাজে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করি। একটা বিষয় আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে, দেশের আইন আছে। কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না। সমাজে যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করবে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের প্রতিহত করতে হবে। এটা আমাদের দেশে হোক বা ভিন্ন দেশে। আমরা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের আশ্রয় বা প্রশ্রয় দিব না। এ দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। হাজার বছরের এই ঐতিহ্যকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।
আমাদের সংবিধান দেশের সব নাগরিককে স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালনের অধিকার প্রদান করেছে। তাই যার যার ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকারে যেন কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে- এটাই বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ। masumon83@yahoo.com
এইচআর/জেআইএম