বগুড়ার শেরপুর সড়কের একটি ফিলিং স্টেশন। দুপুর পেরিয়ে বিকেল। গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। পাম্পের এক পাশে সারিবদ্ধ মোটরসাইকেল, অন্যপাশে ট্রাক, পিকআপ, অটোরিকশা। সেই লাইনের মাঝখানে দুই হাতে কনটেইনার ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন কৃষক। কারও মুখে বিরক্তি, কারও চোখে উৎকণ্ঠা। তাদের তাড়া রাস্তার জন্য নয়, জমির জন্য। মাঠে পানি দিতে না পারলে ধান বাঁচবে না। কিন্তু ডিজেল ছাড়া সেচ পাম্প চালানোও সম্ভব নয়।
Advertisement
চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে যখন ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, তখন বগুড়াজুড়ে দেখা দিয়েছে এমন ডিজেল সংকট। জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে প্রতিদিনই দীর্ঘ লাইন, তেল শেষ হয়ে যাওয়া, সীমিত বিক্রি এবং অনিশ্চয়তার চিত্র দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন কৃষকেরা। কারণ উত্তরাঞ্চলের এই জেলায় বোরো চাষের বড় অংশই এখনো ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
মীর্জাপুর এলাকা থেকে আসা কৃষক শাজাহান আলী বলেন, সকাল ১০টায় এসেছি। এখন বিকেল হয়ে গেল, এখনো তেল পাইনি। জমিতে পানি দেওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। মেশিন বন্ধ থাকলে ধান মরে যাবে, তখন ক্ষতি কে দেবে? একই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা হোসেনপুর এলাকার আব্দুল কাদের বলেন, আগে আধা ঘণ্টায় তেল নিয়ে চলে যেতাম। এখন ৪-৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়েও নিশ্চয়তা নেই। কখনো বলে শেষ, কাল আসেন। কৃষক কি কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে?
আরও পড়ুন‘তেলের পেছনে ছুটবো নাকি কৃষিকাজ করবো?’তেল সংকটে সেচ না পেয়ে হতাশায় কৃষক
Advertisement
শুধু শহরাঞ্চল নয়, উপজেলার পাম্পগুলোতেও একই চিত্র। দুপচাঁচিয়া উপজেলার একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের আগেই ডিজেল শেষ। ডিসপেন্সার মেশিন ঢেকে রাখা হয়েছে। বাইরে অপেক্ষমাণ কয়েকজন কৃষক হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের একজন বলেন, সকাল থেকে বসে আছি। এখন বলছে তেল নাই। কাল আসেন। জমির পানি কি কাল পর্যন্ত থেমে থাকবে?
৭২ পাম্পে চাপ, কোথাও সীমিত বিক্রিসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বগুড়া জেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৭২টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব পাম্পেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। কোথাও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না, কোথাও আবার কিছু সময়ের জন্য বিক্রি বন্ধ রাখা হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, মূল সমস্যা হচ্ছে অনিয়মিত সরবরাহ। এর সঙ্গে পরিবহন খাতের স্বাভাবিক চাহিদার পাশাপাশি বোরো মৌসুমে কৃষি সেচের বাড়তি চাহিদা যোগ হয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রতন বলেন, কয়েকদিন সরবরাহ কম থাকায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে চাহিদা বেশি থাকায় কিছু জায়গায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
Advertisement
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কৃষকেরা জানাচ্ছেন, সরবরাহ এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে লাইন কমছে না, অপেক্ষাও শেষ হচ্ছে না।
দৈনিক ৫০-৬০ মেট্রিকটন ঘাটতির অভিযোগস্থানীয় জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র, ফিলিং স্টেশন মালিক ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে বগুড়া জেলায় প্রতিদিন গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন ডিজেলের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বড় অংশ যাচ্ছে কৃষি সেচ খাতে, বাকি অংশ পরিবহন, ক্ষুদ্র শিল্প, জেনারেটর ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সরবরাহ মিলছে গড়ে মাত্র ২২০ থেকে ২৪০ মেট্রিক টন। ফলে প্রতিদিনই ৫০ থেকে ৬০ মেট্রিক টনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। শতকরা হিসাবে যা প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংখ্যার হিসাবে এই ঘাটতি ছোট মনে হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব অনেক বড়। কারণ বোরো মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়েই বেশি থাকে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সেচ পাম্পগুলো একযোগে চালু থাকে। এই সময়ে পর্যাপ্ত ডিজেল না পেলে অনেক কৃষক পাম্প চালাতে পারছেন না, কেউ কেউ আবার সীমিত সময়ের জন্য চালিয়ে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, বরাদ্দ কমে যাওয়ায় তাদেরও বিপাকে পড়তে হচ্ছে। প্রতিদিন যতটুকু তেল আসে, তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক পাম্পকে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কোথাও প্রতি গ্রাহককে সীমিত লিটার দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আরও পড়ুনসারের পর ডিজেল সংকট, বোরো আবাদে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’সেচ সংকটে পুড়ছে বোরো ক্ষেত, ডিজেল না পেয়ে দিশাহারা কৃষক
জ্বালানি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বগুড়া শুধু নিজ জেলার চাহিদাই বহন করে না, আশপাশের কয়েকটি এলাকার যানবাহন ও কৃষি খাতেরও চাপ পড়ে এখানে। উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে জেলার মহাসড়কঘেঁষা পাম্পগুলোতে পরিবহন খাতের চাহিদা সবসময় বেশি থাকে। এর সঙ্গে যখন বোরো মৌসুমে হাজার হাজার সেচ পাম্প একসঙ্গে ডিজেল চাইছে, তখন ঘাটতি দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে কৃষিখাতে। কারণ বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর ফসল। সময়মতো পানি না পেলে জমিতে ফাটল ধরে, গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, শীষ গঠনে সমস্যা দেখা দেয়।
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষায়, এই পর্যায়ে কয়েক দিনের সেচ ব্যাহত হওয়াও ফলনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষকেরা বলছেন, সার বা বীজ পরে জোগাড় করা যায়, কিন্তু সেচের সময় পার হয়ে গেলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই ডিজেল ঘাটতি এখন শুধু জ্বালানির সংকট নয়, এটি ধান উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
ধানের ক্রিটিক্যাল সময়, পানির অভাবে ফলন কমার শঙ্কাকৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো ধানের এই পর্যায়ে নিয়মিত সেচ অত্যন্ত জরুরি। জমি শুকিয়ে গেলে গাছের বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে, শীষ ছোট হতে পারে, দানা অপুষ্ট থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
দুপচাঁচিয়ার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, এখন ধানের ক্রিটিক্যাল সময়। পাঁচ-সাত দিন পানি না পেলে জমি শুকিয়ে যাবে। তেল না পেলে সেচ দেব কীভাবে ?
তালোড়া এলাকার কৃষক আজিজার রহমান বলেন, আগে বৃষ্টি না হলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এখন তেলের জন্যও তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি হেক্টর বোরো জমিতে পুরো মৌসুমে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। অনেক শ্যালো মেশিনচালিত পাম্প এক মৌসুমে প্রায় ৩০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করে। ফলে কয়েক দিনের সংকটও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমি সেচনির্ভরবগুড়ায় চলতি মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর বড় অংশই সেচনির্ভর।
জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার সেচ পাম্প সক্রিয় রয়েছে বলে কৃষি বিভাগ ধারণা করছে। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। অর্থাৎ প্রায় ৩২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার পাম্প সরাসরি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এত বড় ব্যবস্থায় সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও একসঙ্গে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে প্রভাব পড়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, এই মৌসুমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। সরবরাহ ব্যাহত হলে সেচে সমস্যা হয়। বিষয়টি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দেখা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, কৃষকের নতুন ঝামেলাপরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় প্রশাসন কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কয়েকটি পাম্পে ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া তেল না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের যুক্তি, এতে অপব্যবহার কমবে এবং প্রকৃত ব্যবহারকারীরা অগ্রাধিকার পাবেন। তবে কৃষকেরা বলছেন, এতে উল্টো নতুন ঝামেলা তৈরি হয়েছে। কারণ গ্রামের অনেক কৃষক মোটরসাইকেল বা জারিকেন নিয়ে তেল কিনতে এলে সব কাগজপত্র সঙ্গে থাকে না।
এক কৃষক বলেন, জমির মালিক আমি, মেশিনও আমার। কিন্তু লাইসেন্স নেই বলে যদি তেল না দেয়, তাহলে মাঠে পানি যাবে কীভাবে?
জ্বালানি ও কৃষি খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংকট নতুন নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক সেচ পাম্প এখনো ডিজেলনির্ভর। বিকল্প শক্তি ব্যবস্থায় রূপান্তর ধীরগতির হওয়ায় প্রতি মৌসুমেই একই চাপ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ সম্প্রসারণ এবং কৃষি মৌসুমে আলাদা জ্বালানি বরাদ্দ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান কঠিন।
বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা এখন হিসাব করছেন, ধানে কত সার লাগবে বা কত ফলন হবে, তার আগে প্রয়োজন পানি। আর পানির আগে দরকার ডিজেল।
জমিতে ধান দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু পাম্পে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক। এই বৈপরীত্যই এখন বগুড়ার বাস্তবতা। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সেচের সংকট শুধু কৃষকের নয়, খাদ্য উৎপাদনেরও বড় ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
এল.বি/কেএইচকে/এএসএম