জাতীয়

রান্নাঘরের ‘মৃত্যুফাঁদ’ গ্যাস সিলিন্ডার 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই আসে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনার খবর। অধিকাংশ ঘটনা ঘটছে রান্নাঘরে। সংশ্লিষ্টদের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, সিলিন্ডারের আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদির ত্রুটির কারণেই বিস্ফোরণ বেশি। রান্নাঘর ক্রমে মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠলেও এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই।

Advertisement

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনাগুলো মূলত গ্যাস লিকেজ থেকে ঘটে। সিলিন্ডারের হোস পাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভালভের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়। সেই লিকেজ থেকে গ্যাস বেরিয়ে বাইরে কোথাও জমতে থাকে। সামান্য আগুন, এমনকি স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমে থাকা সেই গ্যাস ভয়াবহ বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে। এছাড়া পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস লিকেজ থেকেও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। কিছু কিছু বিস্ফোরণ এমন ভয়াবহ যে দগ্ধদের চিকিৎসা করাও জটিল হয়ে পড়ে। অনেক সময় বিস্ফোরণে হতাহতদের হাত-পা উড়েও যায়। তবে ফায়ার সার্ভিস বলছে, মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়। সিলিন্ডারের ব্যবহার বন্ধ না করে এর সঠিক ব্যবহার বিধি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে গুণগত মান নিশ্চিত করাই এই সংকট থেকে মুক্তির উপায়।

গ্যাস বিস্ফোরণের কয়েকটি ঘটনা

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার একটি বসতবাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডারের সরঞ্জামাদির লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ এ বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন তারা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে স্ত্রী উম্মে হুমায়রা (৩০) ও পরে স্বামী জিল হক (৩৭) মারা যান। গত ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় একটি বাসায় রান্নাঘরে জমে থাকা সিলিন্ডারের গ্যাসে আগুন ধরে দগ্ধ উজ্জ্বল হোসেন (৩০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।

গত বছরের ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানার পূর্ব নুরের চালা এলাকায় একটি টিনশেড বাসায় গ্যাস সিলিন্ডারে রান্নার সময় বিস্ফোরণে আগুন লেগে যায়। একদিন পর রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হালিম শেখের ছেলে হানিফ শেখ (২৪)। তার শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের চারদিন পর রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা মো. হালিম শেখের (৫০) মৃত্যু হয়। 

Advertisement

পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারাদেশে আগুনের ঘটনা ছিল ২৭ হাজার ৫৯টি। এসব ঘটনায় মৃত্যু হয় ৮৫ জনের। আহত হন ২৬৭ জন। এর মধ্যে চুলা থেকে দুই হাজার ৯০৯টি (১০.৭৫%), গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৯২০টি (৩.৪০%), গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি (২.০৮%) এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি (০.৪৫%) আগুনের ঘটনা ছিল।২০২৪ সালে সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৫৩৯টি, সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত ২৯টি, গ্যাসের সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ৩৭৯টি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ৬১টি আগুনের ঘটনা ঘটে। 

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ার প্রধান কারণ ব্যবহারকারীর অসচেতনতা, নিম্নমানের সরঞ্জাম ও অবৈধ রিফিলিং। সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাতের প্রধান ও প্রথম কারণ হিউম্যান এরর বা মানুষের ভুল।-বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান

২০২৩ সালে সারাদেশে গ্যাসলাইন লিকেজ থেকে ৬৯৪টি, সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ২১০টি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ত্রুটির কারণে ৮৮টি অগ্নিকাণ্ড হয়।২০২২ সালে গ্যাসলাইন এবং সিলিন্ডার লিকেজ ও বিস্ফোরণ থেকে ৭৬৭টি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ৪৮টি অগ্নিকাণ্ড হয়।২০২১ সালে গ্যাসলাইন ও গ্যাসের সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৮৯৪টি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে ত্রুটির কারণে ৩৯টি অগ্নিকাণ্ড হয়। তবে বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলে যেসব লাশ পান, সেসব তথ্য তারা রেকর্ড করেন। দগ্ধদের মধ্যে পরে চিকিৎসাধীন অনেকেই মারা গেলেও এ তালিকায় স্থান পান না। 

মানুষের ভুলেই আগুন!

সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ার প্রধান কারণ ব্যবহারকারীর অসচেতনতা, নিম্নমানের সরঞ্জাম ও অবৈধ রিফিলিং। সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাতের প্রধান ও প্রথম কারণ হিউম্যান এরর বা মানুষের ভুল।’

Advertisement

দেশে সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ গ্যাস লিকেজ। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ ব্যবহারের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক সময় ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে থাকলেও তার গন্ধ স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। এতে বাসিন্দারা বিষয়টি টের না পেয়েও আগুন জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই দুর্ঘটনার শিকার হন।-ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

অধিকাংশ বিস্ফোরণের পেছনে মানুষের অসচেতনতা দায়ী জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে চুলা বা রেগুলেটরের সুইচ ঠিকমতো বন্ধ না করার ফলে গ্যাস জমে সকালে বিস্ফোরণ ঘটে। সিলিন্ডার মজবুত হলেও রান্নার কাজে ব্যবহৃত হোস পাইপ, রেগুলেটর বা নজল অনেক সময় নিম্নমানের হয়। বাজারে সস্তায় পাওয়া এসব সরঞ্জামের ওপর বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।’ সিলিন্ডার অবৈধ রিফিলিংয়ের বিষয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে অবৈধভাবে গ্যাস স্থানান্তর করে। এই কাজগুলো সাধারণত গভীর রাতে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে হওয়ায় তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়ে। কক্সবাজার বা রংপুরের মতো জায়গায় ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনাগুলোর তদন্তে দেখা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল না।’ 

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশে মাত্র ১৪ জন কর্মকর্তা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তদারকি করছেন। জেলা পর্যায়ে কোনো অফিস নেই। শুধু বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় অন্তত ২০ গুণ বেশি জনবল প্রয়োজন। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সংস্থাটি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। যদি কোনো লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলা পাওয়া যায়, তবে তাদের অনুমোদন বাতিল করা হচ্ছে এবং অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে।’ ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ গ্যাস লিকেজ। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ ব্যবহারের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক সময় ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে থাকলেও তার গন্ধ স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। এতে বাসিন্দারা বিষয়টি টের না পেয়েও আগুন জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই দুর্ঘটনার শিকার হন। এছাড়া নিম্নমানের সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে ভেতরের গ্যাসের চাপ বেড়ে গিয়ে বিস্ফোরণের আশঙ্কা তৈরি হয়।’

আরও পড়ুন

গ্যাসের সিলিন্ডার দুর্ঘটনা এড়াবেন যেভাবেকুমিল্লায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একই পরিবারের দগ্ধ ৪ধামরাইয়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ: একে একে পাঁচজনই মারা গেলেন

লে. কর্নেল তাজুল বলেন, ‘সিলিন্ডারের মান অনুযায়ী নিয়মিত হাইড্রোলিক পরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রে করা হয় না, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই সিলিন্ডার আমদানি থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকি জোরদার করা দরকার। একই সঙ্গে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘এলপিজি সিলিন্ডার নিরাপদ ব্যবহারে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহীরা ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা নিতে পারবেন। গত বছরে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বাসাবাড়ি বা আবাসিক ভবনে। এক বছরে এসব স্থানে মোট ৮ হাজার ৭০৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের ৩২ দশমিক ১৭ শতাংশ।’

সিলিন্ডারের মান পরীক্ষায় নেই পরীক্ষণ কেন্দ্র 

দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি গ্রাহক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। এসব গ্রাহকের একটি বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের। এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩০টি কোম্পানির অন্তত দুই কোটি সিলিন্ডার বাজারে রয়েছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক বছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৩২৩টি। এলপিজি ছাড়া অন্য সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৯০টি। পাশাপাশি দেশে সিলিন্ডার তৈরির জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর একটি ঘরের অবস্থা

অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করেছে দেশে নির্মিত ৩৫ লাখ ৮২৯টি এলপিজি সিলিন্ডার। কিন্তু এসব সিলিন্ডারের মান পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত কোনো পরীক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। 

সিলিন্ডার বিস্ফোরণের নেপথ্যে

গত বছরের বেশ কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা অনুসন্ধান করেছে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে গত বছরের ২০ জুন গাজীপুরের এনসি বাজারে সংঘটিত সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা, যেখানে তিনজন নিহত হন। দুর্ঘটনাটি অনুসন্ধান শেষে বিস্ফোরক পরিদপ্তর জানায়, সিলিন্ডারের রেগুলেটর অথবা চুলার চাবির ত্রুটির কারণে এলপি গ্যাস লিকেজ হয়ে আবদ্ধ ঘরে জমা হয়।

গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এখন আর সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রায়শই একটি ভয়াবহ বোমার মতো আঘাত হানছে। এই বিস্ফোরণে সৃষ্ট এনার্জির ফলে মানুষের হাত-পা উড়ে যাওয়া বা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ক্লোজ সার্কিটে বা বদ্ধ ঘরে আগুন লাগলে শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং শরীরের ২০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।-জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন 

ঘটনার দিন চুলা জ্বালানোর পর ইলেকট্রিক স্পার্কের মাধ্যমে সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়। ওই বছরেরই ১৬ মে খুলনার ইকবালনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আরেকটি ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনা তদন্ত করে বলা হয়েছে, রেগুলেটর সঠিকভাবে সিলিন্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। ফলে সেখান থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। একপর্যায়ে চুলা জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে সিলিন্ডারের মুখে আগুন ধরে যায়। ওই দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিলিন্ডার সরাসরি বিস্ফোরণ সাধারণত হয় না। সিলিন্ডারের সঙ্গে থাকা আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের ত্রুটির কারণেই আগুন লাগছে এবং এক পর্যায়ে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হচ্ছে।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনে হতাহতের সঠিক তথ্য নেই

আগুনে পোড়া অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নেন ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময়ে সিলিন্ডার ও লাইনের গ্যাস লিকেজ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন যথাক্রমে ১২১ ও ৬২ জন। দগ্ধ দুজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। ভর্তি রোগীদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন, সে তথ্য জানা যায়নি। অধিকাংশ সময় সেটা জানা যায় না। অনেক সময় দুর্ঘটনার পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়, আবার ঘটনাস্থলেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস মিলিয়ে শুধু সিলিন্ডার বা চুলার আগুন থেকে হতাহতের সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে উঠছে বোমার মতো

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এখন আর সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রায়শই একটি ভয়াবহ বোমার মতো আঘাত হানছে। এই বিস্ফোরণে সৃষ্ট এনার্জির ফলে মানুষের হাত-পা উড়ে যাওয়া বা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ক্লোজ সার্কিটে বা বদ্ধ ঘরে আগুন লাগলে শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং শরীরের ২০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।’ 

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার বিধি বা নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ গ্যাস লিকেজের বিষয়টি বুঝতে না পেরে আগুন ধরাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সিলিন্ডার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা এখন সময়ের দাবি।’গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের জন্য কেবল অসচেতনতা নয়, বরং সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. নাসির উদ্দিন। তিনি মনে করেন, ‘বাজারে আসা সিলিন্ডারগুলোর মান যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। নিম্নমানের সিলিন্ডারের সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমন বাড়বে মৃত্যুমিছিলও।’ 

বিস্ফোরণ এড়াতে করণীয়

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে যাতে সিলিন্ডারের পাশাপাশি এর সঙ্গে ব্যবহৃত অন্য অ্যাক্সেসরিজ (পাইপ, রেগুলেটর) তৈরির মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তদারকির দায়িত্বও একটি নির্দিষ্ট সংস্থার অধীনে আনা হয়। এছাড়া সাধারণ মানুষকে ডিলার বা অথেনটিক সোর্স ছাড়া সিলিন্ডার না কেনা এবং ব্যবহারের নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (ইসাফ) মহাসচিব প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন আহম্মেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে গ্যাস সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে নজরদারি খুবই দুর্বল। প্রতিটি সিলিন্ডারকে প্রেসার টেস্ট করার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে একটি লটে কয়েকটি নমুনা পরীক্ষা করেই সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়। এতে অনেক সময় ঝালাইয়ের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র ত্রুটি ধরা পড়ে না, যা পরবর্তীসময়ে বড় বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে।’

‘ইমপোর্ট করা পণ্যের ক্ষেত্রেও স্ট্যান্ডার্ড যাচাইয়ে ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় নিম্নমানের ও পাতলা দেওয়ালের সিলিন্ডার বাজারে আসে। কিন্তু পর্যাপ্ত থার্ড পার্টি ভেরিফিকেশন ও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ না করায় ঝুঁকি বাড়ছে। এখাতে বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের আরও শক্ত ভূমিকা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, সিলিন্ডারের রেগুলেটর ভাইটাল একটা পার্ট। এখন দেশে রেগুলেটর তৈরি হচ্ছে, অনেক সময় ফেসবুকে দেখি রেগুলেটরের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কিন্তু যে প্রোডাক্টটা তৈরি হচ্ছে তার মান কি আসলে স্ট্যান্ডার্ড ফলো করেছে? ওই যে ম্যানুফ্যাকচারার প্রোডাক্টটা তৈরি করেছে সেটার কি ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট আছে? বা তার এই প্রোডাক্ট, এই প্রোডাক্টের পিএসআই কি ঠিক আছে? এ ধরনের কোনো কাগজ সরকার এখন পর্যন্ত দেখে না। আর দেখে না বলেই আমরা আমাদের মতো অসাধু কিছু ব্যবসায়ী কম দামি প্রোডাক্ট নিয়ে আসি। সস্তা প্রোডাক্টটিই এক সময় তার সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, পুরো ফ্যামিলিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

 

ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বার্নের চিকিৎসকদের পরামর্শ

অবৈধ রিফিলিং বন্ধ করা নিম্নমানের সিলিন্ডারের সরবরাহ বন্ধ করা সিলিন্ডারের মান অনুযায়ী নিয়মিত হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা সিলিন্ডারের মান পরীক্ষায় পরীক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা রেগুলেটর সঠিকভাবে সিলিন্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করা রান্নাঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে আগুন না জ্বালানো চুলা জ্বালানোর আগে রান্নাঘরের দরজা-জানালা খুলে দেওয়া সিলিন্ডার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা রাতে ঘুমানোর আগে চুলা বা রেগুলেটরের সুইচ ঠিকমতো বন্ধ করা বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে অবৈধভাবে গ্যাস স্থানান্তর না করা নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ ব্যবহার না করা 

টিটি/এএসএ/ এমএফএ