ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ‘জাস্টিস ফর হাদি’ লেখা মুছে ফেলা এবং এরপর আবার ভুল বানানে লেখা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের রাজনীতি চলছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও গালাগালও চলছে।
Advertisement
বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে মাস্টারদা সূর্যসেন হলের আঙিনায় আলপনা ও দেওয়াল লিখনের কর্মসূচি পালন করে হল শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এ সময় হলের মেইন গেট সংলগ্ন দেওয়ালে শহিদ শরিফ ওসমান হাদির বিচারের দাবিতে লেখা দেওয়াল লিখন ‘জাস্টিস ফর হাদি’ মুছে ফেলে তারা। এর প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকাল থেকে দিনব্যাপী দেওয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করে। সেদিন রাতে হল শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান মিশুর উদ্যোগে পাল্টা দেওয়াল লিখন করা হয়।
ইনকিলাব মঞ্চ যেখানে যেখানে ওসমান হাদির নাম উল্লেখ করে দেওয়াল লিখন করে, সেসবের নিচে বা পাশে ‘হাদি ব্যবসা বন্ধ’, ‘বিচারের নামে ব্যবসা বন্ধ করো’, ‘হাদি ব্যবসায়ীরা নিপাত যাক, ওসমান হাদি বিচার পাক’সহ নানা স্লোগান লিখে দেয় ছাত্রদল।
হলের মেইন গেট সংলগ্ন দেওয়ালে ‘ব্যবসা’ শব্দটি লিখতে গিয়ে ছাত্রদলের নেতারা প্রথমে ‘ব্যাবসা’ লিখেন, পরে ব্যবসা লিখেন। অন্যদিকে, ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ‘JUSTICE FOR HADI’ লিখতে গিয়ে ভুল করে ‘JUSICE FOR HADI’ লেখা হয়।
Advertisement
এই ইংরেজি ভুল বানানটি সবার নজরে আসে ছাত্রদলের দেওয়াল লিখনের পর। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি ভিন্ন বানান ভুল—বাংলা ও ইংরেজি—একত্র করে প্রচার করা হয় যে, উভয় ভুলই করেছে ছাত্রদল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক এবং ইনকিলাব মঞ্চের ত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা তার ফেসবুকে লেখেন, ‘ফোকাসে বাংলা পড়ায় কে? ছাত্রদলের জন্য ফ্রিতে একটা বানান কোর্স চালু করতে চাই। দেয়াললিখন করতে গেছে বানান ভুল করলো সেকেন্ড ওয়ার্ডেই।’
ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম এবং ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা তার ফেসবুকে ফাতিমা তাসনিম জুমাকে ট্যাগ করে লেখেন, ‘Fatima Tasnim Zuma বাংলার সাথে ইংরেজিটাও প্লিজ শিখতে বলো! Jusics আবার কিতা? হাদীর জন্য Justice চাইতে গিয়ে বানান ভুল করলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি, লেখার চেয়ে বানান ভুল বেশি। স্থান : সূর্যসেন হল’
অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার তার ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্দেশে খোঁচা মেরে লেখেন, ‘আপনারা আসল ব্যাপারটা বুঝেন নাই। ছাত্রদল Jusice লিখছে কারন তাদের নেতার নামের প্রথম অক্ষর T, তারা খুব ভালোমতোই জানে তাদের নেতার ভেতর ন্যায়বিচারের কোনো লক্ষণ নাই। ইটস সেন্স অব হিউমারJusice ফর ছাএদল।’
Advertisement
এ ঘটনার পর সূর্যসেন হলের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেন হল শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান মিশু। তাতে দেখা যায়, ইনকিলাব মঞ্চের এক নারী সদস্য ‘JUSTICE FOR HADI’ লিখতে গিয়ে ভুল করে ‘JUSICE FOR HADI’ লিখেছেন।
সিসিটিভির ফুটেজ প্রকাশের পর জুমা ও উম্মে সালমা তার ফেসবুক পোস্ট সরিয়ে ফেললেও সালাউদ্দিন আম্মার রেখে দিয়েছেন।
দেওয়াল লিখন অঙ্কন করেছেন জুমা: ছাত্রদল নেতা আবিদসূর্যসেন হলের ছাত্রদল নেতা আবিদুর রহমান মিশু শুক্রবার রাতে তার ফেসবুকে সিসিটিভির ফুটেজ প্রকাশ করে লেখেন, ‘নিজেদের বানান ভুলকে ছাত্রদলের নামে প্রচার করে অপ-রাজনীতি করা জামাত-শিবির ও তাদের এ বি সি ডি টিম, ব্যবসায়িক দোকান, মবস্টার বাহিনী ও ইনকিলাব মঞ্চের মিথ্যাচারের প্রমাণ:
গতকাল (বৃহস্পতিবার) মাস্টারদা' সূর্যসেন হল ছাত্রদল প্রতিবাদী দেয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করার পর থেকে অনলাইনে বট বাহিনী ছাত্রদলকে বানান শেখানোর কোর্স করানো থেকে শুরু করে সব রকম মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছিল, অথচ দেয়াল লিখনটি অঙ্কন করেছে খোদ ডাকসু সম্পাদক মিথ্যেবাদী ফাতিমা তাসনোম জুমা এবং সেই মিথ্যা প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার দেখা যায় ডাকসুর অন্য আরেকজন সম্পাদক উম্মে সালমাকে।
ওসমান হাদীর বিচার চাওয়া যে এদের উদ্দেশ্য নয়, বরং ওসমান হাদীকে নিয়ে ইস্যু তৈরি করে অপ-রাজনীতিই তাদের উদ্দেশ্য, সেটাই এই ঘটনার মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হলো।
আগামী দিনে মাস্টারদা’ সূর্যসেন হল ছাত্রদলকে জড়িয়ে আর কোনো মিথ্যাচার বরদাস্ত করা হবে না। আমরা এসব মিথ্যেবাদীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।’
আমি তো শুধু ‘ব্যবসা’ বানানটা শিখাতে চেয়েছিলাম: জুমাছাত্রদল নেতা আবিদুর রহমান মিশুর পোস্টের জবাবে ফাতিমা তাসনিম জুমা তার ফেসবুকে লিখেছেন, আমি তো শুধু “ব্যবসা” বানানটা শিখাতে চেয়েছিলাম। এখন দেখছি ফ্রি চোখের চিকিৎসার আয়োজনও করতে হবে। বিএনপির ট্রেজারার ফান্ডটা দিলে ছাত্রদলের জন্য একটা ফ্রি ট্রিটমেন্ট আয়োজন করতে চাই। ছাত্রদল যেমন আমার ওপর অবসেসড, যেভাবে সবখানে শুধু আমাকেই দেখে, তেমনই অবসেসড একজন স্বামী দিও মাবুদ।
পৃথক আরেকটি পোস্টে জুমা লেখেন, ‘অজ্ঞতা আর ভুলের মধ্যে পার্থক্যটা বিশাল। আবিদুর রহমান মিশু যেখানে আমি ছিলাম না, সেখানেও এখন আমাকে দেখতে শুরু করেছে। ছেলেটা শিবির ট্যাগ খেয়ে ডাকসুতে মনোনয়ন না পাওয়ার শোকে আর কী কী যে করবে! মিথ্যা বলে একটা আওয়াজ তুলতে পেরে আশা করি একটা ভালো পদ পাবে।’
জুমা ভুল বানান লিখেননি: জুবায়েরডাকসু নেত্রী জুমা ভুল দেওয়াল লিখন করেছেন বলে ছাত্রদল নেতা আবিদুর রহমান মিশু দাবি করলেও ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ভুল বানানে Justice for Hadi লেখা মেয়েটা Fatima Tasnim Zuma না। অন্য আরেকজন, সেও ইনকিলাব মঞ্চেরই। অর্থাৎ, ভুল বানানটা ইনকিলাব মঞ্চের দেয়াললিখন কর্মসূচিতেই হয়েছে। কিন্তু লেখিকা জুমা নিজে না।’ এবি জুবায়ের লিখেছেন, ‘ইনকিলাব মঞ্চের দোষ হচ্ছে গতকাল যখন ভুল বানান নিয়ে সবাই ছাত্রদলকে ট্রল করছিলো তখন তারা স্বীকার করে নেয়নি যে ভুলটা ছাত্রদল করেনি, করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। তারা তখন স্বীকার করে নিলে এতো জলঘোলা হতো না।’ ‘ছাত্রদলের দোষ হচ্ছে তারা এর দায়টা দিয়ে দিয়েছে ব্যক্তি জুমার ওপরে। সংগঠন হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চের ওপরে না। ফলত তাদের বটবাহিনি জাস্ট ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ঝাপিয়ে পড়েছে মেয়েটার ওপরে। ব্যক্তি আ'ক্রমণও না, মা-বাবা, পরিবার নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগা'লাজ! কমেন্টে কিছু দিচ্ছি, দ্যাখেন।’ ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক বলেন, ‘কথা হচ্ছে একজনের সাথে আপনার রাজনৈতিক শত্রুতা আছে, তাকে রাজনৈতিক ভাবেই ডিল করেন। তার মা-বাবা, পরিবারকে গালি'গালাজ কেন করবেন!’
ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান মুসাদ্দিকেরভুল বানান নিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ঘটনায় প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। শুক্রবার রাতে তিনি তার ফেসবুকে লেখেন, ‘প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে মিথ্যাচার জেনেশুনে করেছেন এর মাধ্যমে কার্যত শহিদ ওসমান হাদি ভাইকেই অবমাননা করলেন। আপনাদের প্রত্যেকের জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। #JusticeForHadi’
ভুল বানান নিয়ে রাজনীতি, ক্ষুব্ধ ইনকিলাব মঞ্চের জাবের‘জাস্টিস ফর হাদি’ লেখার ভুল বানান নিয়ে রাজনীতি করার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। তিনি তার ফেসবুকে লিখেছেন, প্রতিবাদ ছিলো হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে করা দেয়াললিখন মুছে দেওয়ার। হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে কিছু লিখলে বা কোন প্রোগ্রাম করলে এই মানুষগুলোর শরীরে এতো জ্বালাপোড়া শুরু হয় কেনো! শহিদ ওসমান হাদির প্রতি তাদের এই সীমাহীন বিদ্বেষ কেনো! একজন মানুষের শাহাদাতের পরেও তাকে এতো ভয় পাওয়ার কারণ কী! আলাপ হওয়া দরকার ছিলো এই বিষয়গুলো নিয়ে...। অথচ এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যেখানে হাদি হত্যার বিচারটুকুই যেনো অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবার একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা।’
জাবের তার ফেসবুকে লেখেন, গতকালের কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা না করে আজকে বানান সংক্রান্ত ভিক্টিম রোল প্লে করে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে যেই নোংরামিগুলো করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সংগঠনের ভাইয়েরা সেইটাতে যেই বুনো উল্লাস করেছেন, এইটা দিয়া খুব বেশিদিন রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকা যাবেনা।
আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। ‘গত দেড় বছরে এমন কোন ইস্যু নাই যেখানে জুমাকে জড়ানো হয় নাই (ঘটনার সাথে নূন্যতম সম্পর্ক না থাকলেও) ৷ যদিও এইটা নতুন কিছু না। হাদি ভাই জীবিত থাকতেও এই লোকগুলোই এমন কোন গালি নাই যেইটা হাদি ভাইকে দেয় নাই, জুমাকে জড়ায় নাই।
আরেকটা ছাত্রসংগঠন আছে যাদের কাজ ইস্যু ক্রিয়েট করে ফায়দা নেয়া। কিন্তু আদতে কি ফায়দা নেয়ার আছে একজন শহিদকে নিয়া এইটা আমার স্বল্পজ্ঞানে কখনো ধরে না।’
জাবের লেখেন, ‘ভাইয়েরা! শুধু মনে রাইখো, শত আঘাতেও আমাদের টলানো যাবে না। আমরা শুধু একটা জিনিসই বুঝি - এই জমিনে শহিদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার আমরা চাইতেই থাকবো, যতদিন না এর সুষ্ঠু বিচার হয়!
তোমরা যতবার মুছবা, আমরা ঠিক ততোবার শতসহস্র গুণ উৎসাহ নিয়ে আবার লিখবো - হাদি হত্যার বিচার চাই।’
এমএমএআর/এএসএম