আন্তর্জাতিক

যে রেখায় ভাগ হচ্ছে লেবানন: গাজার ছকেই ভূমি দখলে ইসরায়েলি কূটচাল

গাজার মতো লেবাননেও বিতর্কিত সামরিক কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে ইসরায়েল। দক্ষিণ লেবাননে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা ‘হলুদ রেখা’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত যুদ্ধবিরতির আড়ালে লেবাননের ভূমি দীর্ঘমেয়াদে দখল করে রাখার একটি সূক্ষ্ম কৌশল।

Advertisement

শনিবার (১৮ এপ্রিল) ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ‘হলুদ রেখা’র দক্ষিণে অবস্থান করে তারা এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করেছে, যারা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে উত্তর দিক থেকে সেনাদের কাছে আসছিল এবং তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করছিল। এই প্রথমবারের মতো লেবাননে এমন একটি সীমারেখার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করলো ইসরায়েল।

গত বৃহস্পতিবার থেকে লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর এই প্রথম ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হলুদ রেখা’ শব্দটি ব্যবহার করলো।

গাজায় বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণ

এর আগে গাজা উপত্যকায় ‘হলুদ রেখা’ ব্যবহার করে অঞ্চলটিকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল ইসরায়েল। পূর্বাংশ তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিমাংশে তুলনামূলকভাবে চলাচলে কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়। তবে এই সীমারেখার কাছাকাছি গেলে গুলি চালানো, বাড়িঘর ধ্বংসসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

Advertisement

আরও পড়ুন>>লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ট্রাম্পেরলেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি, হতাশ ইসরায়েলিরাঘণ্টা পেরোনোর আগেই লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলো ইসরায়েল

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৭৩ জন নিহত এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

লেবাননেও একই কৌশল?

বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননেও একই পদ্ধতিতে ‘হলুদ রেখা’ কার্যকর করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েল কেবল ‘আত্মরক্ষা’র প্রয়োজনে হামলা চালাতে পারবে। তবে ইসরায়েল এই ‘আত্মরক্ষা’র সংজ্ঞা দিচ্ছে অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে।

ইসরায়েলি বাহিনী হলুদ রেখা সংলগ্ন লেবাননের গ্রামগুলোতে ঘরবাড়ি ধ্বংস, আর্টিলারি ও মেশিনগান হামলা অব্যাহত রেখেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত দুটি বিমান হামলা চালিয়েছে তারা—একটি তথাকথিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে, অন্যটি একটি সুড়ঙ্গ এলাকায়।

Advertisement

ইসরায়েলের দাবি, রেখা পার হওয়ার আগেই ‘সম্ভাব্য হুমকি’ মনে করে তারা হামলা চালাচ্ছে, যা তাদের মতে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন নয়।

কৌশলগত লক্ষ্য: দখল ধরে রাখা

জাফাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবেদ আবু শাহাদেহর মতে, এটি ইসরায়েলের নতুন সামরিক কৌশলের অংশ, যা শুধু লেবানন নয়, সিরিয়াতেও প্রয়োগের চেষ্টা চলছে।

তার ভাষায়, এই কৌশল তিনটি স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে—‘রেড লাইন’, ‘হলুদ লাইন’ এবং লিতানি নদী। লক্ষ্য হলো দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় দখল করা এলাকা চাপ হিসেবে ব্যবহার করা।

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ আলোচনায় লেবানন সরকার যে কোনো দাবি তুললে ইসরায়েল এই দখলকৃত ভূমিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।’

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ লেবাননে দখল বজায় রাখার পক্ষে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন চাপের চেয়েও সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই ইসরায়েল বর্তমানে এই সীমিত যুদ্ধবিরতির পথে হেঁটেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে তাদের দখলদারত্বের আকাঙ্ক্ষা বিন্দুমাত্র কমেনি।

সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/