রাজধানী ঢাকার বড় আতঙ্ক দীর্ঘ যানজট। কর্মঘণ্টা ও জ্বালানির অপচয় এই শহরের নিত্যসঙ্গী। আশার কথা, যানজটের এই নগরী এবার প্রবেশ করতে যাচ্ছে নতুন যুগে। কোনো ধরনের সিগন্যাল ছাড়াই চলবে সব ধরনের গাড়ি। পুরো শহরে থাকবে না কোনো যানজট।
Advertisement
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে আর থাকবে না লাল-হলুদ-সবুজ বাতির অপেক্ষা। ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকার। যার লক্ষ্য ঢাকায় সম্পূর্ণ সিগন্যালমুক্ত, নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম বরাবর মোট ১০৫ কিলোমিটার সড়ককে সংযুক্ত করে একটি এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। এই রুটে কোনো ধরনের ট্রাফিক সিগন্যাল থাকবে না, ফলে যানবাহন একবার প্রবেশ করলে থামা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
ট্রাফিক মডেল
Advertisement
জানা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চেষ্টা করছেন কীভাবে এই শহরের যানজট কমানো যায়। সম্প্রতি ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও যানজট কমাতে বিভিন্ন করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
যানজটের ভয়াবহতাবুয়েটের একটি গবেষণা বলছে, বর্তমানে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটার। প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে যানজটের কারণে। জ্বালানি অপচয় হচ্ছে দৈনিক প্রায় ১ দশমিক ৮ কোটি লিটার, যার আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ২১৬ কোটি টাকা। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা।
জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহরে আর দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হবে না। কোথাও সিগন্যালে কাউকে আটকে থাকতে হবে না। আগে যেখানে এক ঘণ্টা যেতে লাগতো, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সময় লাগতে পারে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মতো।-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার (যুগ্মসচিব) মো. আবদুল্লাহ হাককানী
যানজট ও বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বছরে প্রায় ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
Advertisement
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু করে একাধিকবার স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হলেও তা টেকেনি। বিশ্বব্যাংক ও জাইকার সহায়তায় বসানো সিগন্যালগুলোও নিয়ম না মানা, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ ও ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআইভিত্তিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো পূর্ণ সফলতা পায়নি।
জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কীজিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল থাকবে না। ১০৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে কানেকটিভিটি থাকবে। পথচারী ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। মোট রাস্তা হবে ১০৫ কিলোমিটার। যাতে ইন্টারসেকশন থাকবে ৮০টি। এই প্রকল্পে অবকাঠামো প্রয়োজন ৪৩টি। যার মধ্যে ছয়টি রয়েছে। নতুন নির্মাণ প্রয়োজন ৩৭টি (ন্যূনতম ৩০টি হলেও চালু সম্ভব)।
বর্তমান চিত্র
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সিস্টেমে যান চলাচল হবে নির্বিঘ্ন, নিরবচ্ছিন্ন এবং বাধাহীন।
যেসব অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজনবর্তমানে ওভারপাস/আন্ডারপাস রয়েছে তিনটি, নতুন প্রয়োজন ১৬টি। ওভারপাস/আন্ডারপাস ইউ-লুপ রয়েছে তিনটি, নতুন প্রয়োজন ১৩টি। ইন্টারচেঞ্জ সার্কেল বর্তমানে একটিও নেই, সাতটি নতুন নির্মাণ করতে হবে। ইন্টারচেঞ্জ উইথ ইউ-লুপ একটি নির্মাণ করতে হবে। বর্তমানে একটিও নেই। এছাড়া নতুন ফুটওভারব্রিজ প্রয়োজন ৩০টি।
এসব অবকাঠামো খাতে সর্বমোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
স্বল্পমেয়াদি প্রস্তাবনাঅভ্যন্তরীণ রোডগুলোতে (১০৫ কিলোমিটার রাস্তা বাদে বাকি রোডগুলো) অটোমেটেড ট্রাফিক লাইট ও ট্রাফিক সিগন্যাল দ্বারা পরিচালিত হবে।
মধ্যমেয়াদি প্রস্তাবনাঢাকা শহরের ১০৫ কিলোমিটার রাস্তায় জিরো সিগন্যালের মাধ্যমে যান চলাচল নির্বিঘ্ন ও নিরবচ্ছিন্ন করা হবে। এর মাধ্যমে ঢাকা শহরকে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম বরাবর কানেকটিভিটি তৈরি করা হবে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে ৩৭টি নতুন অবকাঠামো (ওভারপাস/আন্ডারপাস, ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ, আন্ডারপাস/ওভারপাস ইউলুপ) নির্মাণ করতে হবে। রিকশাসহ অন্য ধীরগতির গাড়ির জন্য ব্যবহার করা হবে লোকাল লেন। মানুষ পারাপারের জন্য নির্মাণ করা হবে প্রয়োজনীয় ফুটওভার ব্রিজ।
দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনাঢাকা শহর থেকে যত্রতত্র বাস কাউন্টার অপসারণ করা হবে। ঢাকা মহানগরের ভেতরে থাকা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করা হবে। সিটি সার্ভিস চালু করা হবে। শহরের অভ্যন্তরে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করা হবে। দিনের বেলায় বন্ধ থাকবে কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক চলাচল। চালু করা হবে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন।
যেসব স্থানে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবেনিমতলী বাসস্ট্যান্ড, গোলাপশাহ মোড়, কাকরাইল, শান্তিনগর, রামপুরা টিভি, নতুনবাজার, আজমপুর, জমজম টাওয়ার, ময়লার মোড়, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর-১০, সনি সার্কেল, মিরপুর বাঙলা কলেজ, টেকনিক্যাল মোড়, আড়ং মোড়, সায়েন্সল্যাব, নীলক্ষেত, পলাশী, শহীদ মিনার, শিক্ষা ভবন-হাইকোর্ট, মৎস্য ভবন, কাকরাইল পৃথিবী চত্বর, তেজগাঁও সাউথ, তেজগাঁও নর্থ, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড-গুলশান লিংক রোড, মহাখালী রেলক্রসিং, বনানী সাউথ, বনানী নর্থ, আগারগাঁও বাসস্ট্যান্ড, জিয়া উদ্যান-উড়োজাহাজ চত্বর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ, আবুল হোটেল, দিয়াবাড়ি ও কাজিপাড়া।
আরও পড়ুন
ঢাকার যানজট কমাতে ৭ সিদ্ধান্ত সরকারেরঢাকার যানজট নিরসনে এক মাসের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নতির নির্দেশরাজধানীতে যত্রতত্র দূরপাল্লার বাস কাউন্টার, তীব্র হচ্ছে যানজট
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার (যুগ্মসচিব) মো. আবদুল্লাহ হাককানীসহ স্থানীয় সরকার, পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১০ সদস্যের ইনোভেশন টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রস্তাবনার ভিত্তিতে বৈঠকে উপস্থিত প্রতিটি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও করপোরেশনের পক্ষ থেকে আলাদা অভিমত আগামী ১৫ দিনের মধ্যে লিখিত আকারে দেওয়ার কথা জানানো হয়।
ঢাকার ট্রাফিক মানচিত্রএর আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ‘ঢাকা শহরের যানজট ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত সভা’ মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেলের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিএমপি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রাজউক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুম হকের সঙ্গে সভা করে অগ্রগতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করার করা বলা হয়।
এ বিষয়ে ১৯ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঢাকায় যানজট নিরসনে ‘সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল’ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রস্তাব/মতামত সভা অনুষ্ঠিত হবে।
জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার (যুগ্মসচিব) মো. আবদুল্লাহ হাককানী জাগো নিউজকে বলেন, ‘যানজট ঢাকার একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা নিরসনে আগে অনেক প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও কার্যত কোনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং দিনের পর দিন আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে কিছু পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহরে আর দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হবে না। কোথাও সিগন্যালে কাউকে আটকে থাকতে হবে না। আগে যেখানে এক ঘণ্টা যেতে লাগতো, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সময় লাগতে পারে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মতো।’
টিটি/এএসএ/এমএফএ