দক্ষিণ এশিয়ার বড় আদিবাসী সম্প্রদায় হচ্ছে মুণ্ডা। ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ছত্রিশগড় রাজ্যের ছোটনাগপুর, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে তাদের বসবাস। বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলেও রয়েছে মুণ্ডা সম্প্রদায়। প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করতে পারায় তৎকালীন শাসকরা সুন্দরবনের গাছ কেটে বসতি গড়তে মুণ্ডাদের এ দেশে এনেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি তাদের। আজও সুন্দরবনকে ঘিরেই তাদের জীবন-মরণ। সুন্দরবন ঘিরে বসবাস করছে মুণ্ডা সম্প্রদায়।
Advertisement
সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর, কচুখালী এলাকায় বসবাস করেন আদিবাসী মুণ্ডারা। জেলার দেবহাটা ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও মুণ্ডাদের বসতি আছে। সাতক্ষীরা উপকূলে মুণ্ডা জনগোষ্ঠী আছে আড়াই সহস্রাধিক। এ ছাড়া খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় তাদের বসতি আছে। সুন্দরবন এলাকায় তাদের আদি বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়।
মুণ্ডাদের গোষ্ঠীবাংলাদেশে বসবাসরত মুণ্ডা সম্প্রদায়ের সাতটি গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন- কম্পাট মুণ্ডা, খাঙ্গার মুণ্ডা, খাড়িয়া মুণ্ডা, পাথর মুণ্ডা, দেরগে মুণ্ডা, সাঙ্কা মুণ্ডা এবং মাঙ্কী মুণ্ডা প্রভৃতি।
জীবন-জীবিকাসুন্দরবন এলাকার মুণ্ডাদের জীবন-জীবিকা বনের ওপরই নির্ভরশীল। পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাবকে পুঁজি করে সৃষ্টি হয়েছে এ সম্প্রদায়ের কষ্টের জীবন। জমি-জমা যা ছিল, তা-ও হারিয়েছে নানা কারণে। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হয় অধিকাংশ মুণ্ডার। তারা যেহেতু খুব পরিশ্রমী, তাই স্বল্পমূল্যের শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুন্দরবনের বন বিভাগ ও বহিরাগত ব্যবসায়ীরা বনের কাঠ কাটা ও অন্যান্য কাজে তাদের নিয়োগ করে।
Advertisement
আগে মুণ্ডাদের প্রধান জীবিকা ছিল সুন্দরবনের গাছ কাটা। বিশেষ করে গোলপাতা ও গরান কাঠ কাটাই ছিল অন্যতম কাজ। বর্তমানে অনেকেই আদি পেশা ছেড়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বাঙালির মতো মুণ্ডারা কৃষিকাজে নিয়োজিত হলেও অধিকাংশই ভূমিহীন। তাই এ অঞ্চলের মুণ্ডারা দিনমজুরির ভিত্তিতে মাছ ধরেন। অন্যের জমিতে বেতনভুক্ত কাজ, নৌকা নির্মাণ এবং কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন।
মুণ্ডা নারীদের জীবনজীবিকার প্রভাব পড়েছে মুণ্ডা নারীদের জীবনেও। মুণ্ডা নারীরাও ঘরের বাইরে নানা কাজ করেন। জাল বোনা, সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ-কাঁকড়া ধরা ও মধু সংগ্রহসহ সব ধরনের কাজে দেখা যায় মুণ্ডা নারীদের। এ ছাড়া গৃহপালিত পশুর দেখভাল, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে নানা কাজে অংশ নেন নারীরা।
ভাষা-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার‘মুণ্ডারী’ ধর্মের অনুসারী মুণ্ডাদের প্রধান উৎসব ‘করম পূজা’। বাংলা ভাদ্র মাসের একাদশী তিথিতে এ উৎসব পালন করা হয়। মুণ্ডাদের নিজস্ব ভাষা ‘শাদ্রী’ এবং সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক ‘বন্দনা নৃত্য’। তবে নানাভাবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আজ বিলীনের পথে। বাঙালির সঙ্গে ওঠবস ও লেখাপড়ার কারণে নিজেদের ‘শাদ্রী’ ভাষা ভুলতে বসেছে বর্তমান প্রজন্ম। প্রাথমিক পাঠ শেষে শিশুরা ঝরে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় মুণ্ডারা দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কৃতিচর্চাও করতে পারছে না। জমি ও ভাষার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়।
পর্যটনকেন্দ্রমুণ্ডাদের উদ্যোগে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের কালিঞ্চি গ্রামে গড়ে উঠেছে কালিঞ্চি ক্যারামমুরা ম্যানগ্রোভ ভিলেজ (পর্যটনকেন্দ্র)। এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের থাকা-খাওয়া ও সুন্দরবন ভ্রমণের সুব্যবস্থা আছে। আছে আদিবাসী মুণ্ডাদের নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখার সুযোগ।
Advertisement
মুণ্ডা সম্প্রদায়ের দাবি, এখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলেও রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থা পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন বাইরে থেকে পর্যটকেরা আসার জন্য যোগাযোগ করেন; তখন রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থার কথা শুনে অনেকে পিছিয়ে যান। যা আদিবাসী মুণ্ডাদের সংস্কৃতির বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে।
এসইউ