রাজধানীর ঢাকার রাস্তায় কাকডাকা ভোর থেকেই সড়কে নামে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। মাত্র বছর পাঁচেক আগেও চিত্র ছিল অন্য রকম। ক্যানসারের মতো যেন দ্রুত গ্রাস করছে ঢাকার শরীর। সুবিধা-প্রয়োজনীয়তা যে নেই তাও ঠিক নয়, তবে অনিয়ন্ত্রিত চলাচলই ডেকে আনছে বিপদ।
Advertisement
এখন প্রশ্ন একটাই- এসব সংকটের সমাধান কোন পথে? গত পাঁচ পর্বে আমরা ব্যাটারিচালিত রিকশার নানাবিধ সংকট-সমস্যা তুলে ধরেছি। ঢাকা শহরে এই ত্রিচক্রযান কীভাবে জেঁকে বসছে, এর সুবিধাভোগী কারা, কীভাবে সংকট তৈরি করছে, কীভাবে ধূলিসাৎ হচ্ছে চালকদের সমস্যার, মালিকরা কীভাবে শোষণ করছেন, সরকার কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কীভাবে বিস্তার লাভ করছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি প্রভৃতি।
আরও পড়ুন দিনশেষে রিকশাচালকরা সেই ‘পেটে ভাতে’, মালিকদের ‘পোয়াবারো’এসবের বাইরে এ যানটির রয়েছে আরও বেশকিছু ক্ষতিকর দিক। পাশাপাশি প্রয়োজনীয়তা কম এ কথা বলারও সুযোগ নেই। সেই প্রয়োজনীয়তা-ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনার দাবি রাখে। ক্ষতি-প্রয়োজনীয়তার দিকটি আরেকবার উঁকি মেরে আসা যাক।
স্বল্প দূরত্বে দ্রুত ও সহজ যাতায়াতঢাকার অলিগলি ও সংকীর্ণ সড়কে বাস বা বড় যান চলাচল করতে পারে না। সেখানে ভরসা এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা। প্যাডেল রিকশার তুলনায় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। এছাড়া চালকের শারীরিক পরিশ্রম কমে, ফলে দীর্ঘসময় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।
Advertisement
লালবাগের খাজে দেওয়ান এলাকার বাসিন্দা নাজির হোসেন বলেন, ‘পুরান ঢাকার বেশিরভাগ সড়ক চিপা (অপ্রশস্ত) হওয়ায় গণপরিবহন চলে না। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও জিপ গাড়ি নিয়েও যানজটে আটকে থাকতে হয়। ফলে প্যাডেলচালিত ও ব্যাটারিচালিত রিকশাই ভরসা। ব্যাটারিচালিত রিকশা ইঞ্জিনচালিত হওয়ায় অলিগলিতে দ্রুত পৌঁছাতে পারে।’
তেজগাঁও এলাকার চালক মোমিন হোসেন বলেন, ‘প্যাডেল মারা রিকশা এখন আর চালাতে পারি না বয়সের ভারে। এই ব্যাটারি রিকশা চালানোর কারণেই দুই মুঠো ভাত জুটছে পরিবারের জন্য।’
সাশ্রয়ী ভাড়াসিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রাইড শেয়ারিংয়ের তুলনায় এটি কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ দেয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে সিএনজি অটোরিকশার অর্ধেক ভাড়ায় স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের গন্তব্যে ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাতায়াত করেন। দ্রুত গন্তব্যে যেতে পারে বলে প্যাডেলচালিত রিকশার তুলনায় কম ভাড়ায় চালকরাও যেতে উৎসাহী হন।
আরও পড়ুন সরকার বদলায়, বহাল তবিয়তে থাকে রিকশা সিন্ডিকেটমোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান নিউমার্কেটে একটি রেডিমেড গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আলাপকালে তিনি বলেন, গণপরিবহনের সংখ্যা কম হওয়ায় অনেক সময় আধাঘণ্টাও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ কারণে রাতে বাসায় ফেরার সময় শেয়ারে দু-তিনজন ব্যাটারিচালিত রিকশা ভাড়া করে বাসায় ফিরি। বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকার চেয়ে ৩০ টাকা দিয়ে রিকশায় চড়ে বাসায় ফেরা ভালো।
Advertisement
বিপুল সংখ্যক বেকার ও স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকের জন্য এটি সহজ আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে, যা নগর দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করছে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার মতে, বর্তমানে রিকশা চালিয়ে সারাদেশে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৫০-৬০ লাখ মানুষ। ঢাকা শহরে এই সংখ্যা ১৫-২০ লাখ।
উত্তর ঢাকার তুলনায় দক্ষিণ ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। সিসাসংশ্লিষ্ট কারখানা বা ওয়ার্কশপগুলো দক্ষিণ ঢাকায় বেশি অবস্থিত। গবেষণায় আরও দেখা যায়, যেসব শিশু সিসা কারখানার দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে তাদের রক্তে সিসার মাত্রা অনেক বেশি।-গবেষক ড. মাহবুবুর রহমান
এছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর বিভিন্ন ভার্সন এখন তৈরি হয়েছে। প্যাডেলচালিত রিকশার চেয়ে আকারে বড়। আসনগুলোও বড় ও আরামদায়ক। কোনো রিকশায় তিন-চারজনও বসা যায়। ছাউনি আছে কোনো কোনোটিতে। এসব কারণেও অনেকের কাছে এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা জনপ্রিয়।
অনেক ইতিবাচক দিকও অনেক সময় একটি নেতিবাচক দিকেই ম্লান হয়ে যায়। ব্যাটারিচালিত রিকশাও ঠিক তেমন। তবে এক্ষেত্রে একটি নয়, অনেকগুলো নেতিবাচক দিকও আছে বাহনটির। যদিও সব বিষয় নিয়েই আছে মতপার্থক্য।
মূল সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলাঅপরিকল্পিতভাবে প্রধান সড়কে প্রবেশ করায় ট্রাফিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং যানজট বাড়ে। এটা ঢাকা শহরের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যানজটে ঢাকার সড়কে এমনিতে গতি অনেক কম। সেই গতি আরও মন্থর করে দিচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। সড়কের স্টপেজগুলোতে দলবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা, বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সড়কের মাঝ বরাবর চলা মূল বাহনের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ছে এ ত্রিচক্রযানের কারণে।
দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিগতির অসামঞ্জস্য, দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম ও অদক্ষ চালকের কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। নিয়মিত বড় বড় দুর্ঘটনাও ঘটছে। হাসপাতালের পরিসংখ্যানও বলছে ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। এসব যান নিরাপদ না হওয়া অনেক শিশুর প্রাণ কাড়ছে। কোনো সময় নিজে দুর্ঘটনার শিকার, কোনো সময় অন্যকে ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনায় ফেলছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণচোরাই বা অবৈধ বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জিং ও ব্যবহৃত ব্যাটারির সিসা দূষণ বড় পরিবেশগত সমস্যা। চোরাই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কীভাবে ক্ষতি করছে সেটা আমরা চতুর্থ পর্বে বিস্তারিত দেখিয়েছি।
আরও পড়ুন চাকার নিচে পিষ্ট ঢাকাআইসিডিডিআর,বি-র এক গবেষণায় রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের শিশুদের শরীরে সিসার উপস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। গবেষণায় দেখা যায়, দুই থেকে চার বছর বয়সী ৮০ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এটি শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য এক নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে।
গবেষণার তথ্য২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যার ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন আইসিডিডিআর,বির গবেষক ড. মাহবুবুর রহমান ও তার দল। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পরিচালিত এ গবেষণায় দুই সিটি করপোরেশনের ৫০০ জন শিশুকে নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বা রেগুলেশনের আওতায় আনা জরুরি। এজন্য লাইসেন্স ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে যে কেউ ইচ্ছামতো রিকশা নামাতে না পারে এবং সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।-বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শতভাগ শিশুর রক্তেই সিসার উপস্থিতি রয়েছে। ৮০ শতাংশ শিশুর রক্তের সিসার মাত্রা প্রতি ডিসি লিটারে ৫ মাইক্রো গ্রামের বেশি। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত রেফারেন্স ভ্যালুর চেয়েও বেশি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি বড় কারণ।
এ বিষয়ে কথা হলে প্রধান গবেষক ড. মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উত্তর ঢাকার তুলনায় দক্ষিণ ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। সিসাসংশ্লিষ্ট কারখানা বা ওয়ার্কশপগুলো দক্ষিণ ঢাকায় বেশি অবস্থিত। গবেষণায় আরও দেখা যায়, যেসব শিশু সিসা কারখানার দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে তাদের রক্তে সিসার মাত্রা অনেক বেশি।’
এই গবেষক বলেন, ‘শিশুদের রক্তে সিসার এই উচ্চমাত্রা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের শরীরে সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। গবেষণায় আমরা দেখেছি, একটি বড় অংশের শিশুর শরীরে সিসার উপস্থিতি এত বেশি যা তাদের আইকিউ (IQ) কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শেখার ক্ষমতা ও শারীরিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।’
সিসার উৎস ও ঝুঁকিগবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের পেছনে প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং, পুরোনো বাড়ির রং এবং নির্মাণাধীন ভবনের ধুলোবালি দায়ী। এছাড়া বাজারের খোলা মসলা এবং রং করা খেলনা থেকেও শিশুরা সিসার সংস্পর্শে আসছে।
ড. রহমান সতর্ক করে বলেন, ‘অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ব্যাটারি ভাঙা এবং তা থেকে নির্গত সিসার কণা বাতাসের মাধ্যমে শিশুদের শ্বাসনালিতে বা ধুলার মাধ্যমে তাদের শরীরে প্রবেশ করছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।’
রাজস্বহীন অনানুষ্ঠানিক খাতলাইসেন্স ও নিবন্ধন না থাকায় রাষ্ট্র কোনো রাজস্ব পায় না এবং খাতটি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে। এ বিষয়ে আগের পর্বগুলোতে বিশদ বলা হয়েছে।
এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা ও অপরাধ ঝুঁকি আছে। কিছু ক্ষেত্রে ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে এ বাহনটি। চালকদের আচরণ ও নিয়ন্ত্রণগত সমস্যাও ইদানীং সামনে আসছে।
আইন আছে, মানে না কেউবাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধ। অথচ রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ১৫-২০ লাখ এ যান চলাচল করছে বলে দাবি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্বীকার করেন, বর্তমান আইনে এগুলো বৈধ নয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো শহরের পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন ঢাকার সড়কের নতুন ‘যমদূত’ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ডিএমপি মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার ক্র্যাকস অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে ডাম্পিং করা হয়েছে ৩৫ হাজার রিকশা। এছাড়াও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০টির মতো অটোরিকশা বা ইজিবাইক ডাম্পিং জোনে পাঠানো হচ্ছে। তবুও রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কমছে না।
শাহবাগের চালক সোলায়মান বলেন, ‘অভিযানে রিকশা আটক হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। হয় ১২শ টাকার মামলা খেতে হয়, না হয় কমবেশি টাকা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ম্যানেজ করতে হয়। আর একবার মামলা হলে কমপক্ষে রিকশা ১২ দিন (রিকশার জেল) ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকে।
যাতায়াত খরচসহ তখন রিকশা ছাড়িয়ে আনতে প্রায় দুই হাজার টাকা গুনতে হয় বলে জানান সোলায়মান।
যে সমাধান এখনো কাগজেসংকট সমাধানে সরকারের প্রস্তাবিত ‘ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা–২০২৫’-এ লাইসেন্স, সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার, ওয়ার্ডভিত্তিক চলাচল ও নিরাপত্তা মান নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন এখনো সীমিত।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যানজট ও শৃঙ্খলাহীনতা বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ করছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় প্রধান সড়কে এসব রিকশা চলাচল সীমিত রেখে পাড়া-মহল্লা ও ফিডার রোডে নিয়ন্ত্রিত চলাচলের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, লাইসেন্স, নিবন্ধন, ফিটনেস, চালক প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে এ খাতকে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনা হবে এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটি রিকশা নিবন্ধনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অনিয়ন্ত্রিত এ যান নিষিদ্ধ নাকি নিয়ন্ত্রণ: যা বলছেন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনেরাবুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে একটি অনিয়ন্ত্রিত রূপান্তরিত যান যেখানে কোনো মানসম্মত মেকানিক্যাল ডিজাইন বা সেফটি কাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি। সাধারণ রিকশার ফ্রেমে মটর ও ব্যাটারি যুক্ত হওয়ায় ব্রেকিং সিস্টেম ও ব্যালান্সিং দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ যানবাহনকে নিষিদ্ধ না করে একটি নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ডের আওতায় এনে নিবন্ধন, ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড এবং ব্যাটারি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মতিউর রহমানও একই সুর মিলিয়ে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই যান বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ এটি এখন নগর অর্থনীতি ও জীবিকার অংশ হয়ে গেছে।’
ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে বহু দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। তাই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ করে এসব রিকশা বন্ধ করে দেওয়া যৌক্তিক হবে না।-সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ডিজিটাল নিবন্ধন ও সমন্বিত মনিটরিং ছাড়া এই বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বা রেগুলেশনের আওতায় আনা জরুরি। এজন্য লাইসেন্স ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে যে কেউ ইচ্ছামতো রিকশা নামাতে না পারে এবং সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।’
তিনি বলেন, ‘দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা বর্তমানে দুর্বল। একটি আদর্শ পরিবহন ব্যবস্থায় কমপক্ষে ৮০ শতাংশ চলাচল গণপরিবহনের মাধ্যমে হওয়া উচিত, কিন্তু বাংলাদেশে তা নেই। এই ঘাটতির কারণেই ব্যাটারিচালিত রিকশা বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের উৎসে পরিণত হয়েছে। তাই হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে।’
একদিকে যেমন এটি হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র সম্বল, অন্যদিকে এটিই শহরে চরম বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার
তার মতে, ঢাকা শহরের ভিআইপি সড়কসহ কিছু নির্দিষ্ট রাস্তায় রিকশা চলাচল সীমিত করা হলেও বাস্তবতার কারণে মহাসড়ক ও সাধারণ সড়কের জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ করা জরুরি, যা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে বহু দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। তাই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ করে এসব রিকশা বন্ধ করে দেওয়া যৌক্তিক হবে না।’
আরও পড়ুন ঢাকার সড়কের ‘বিষফোড়া’ ব্যাটারিচালিত রিকশাতিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। বাসসহ অন্য যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উচ্চগতিতে চলাচলের কারণে সড়ক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।’
জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নিম্নমানের ব্যাটারি থেকে সিসা দূষণ ছড়াচ্ছে, যা শিশুদের স্বাস্থ্যসহ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। পাশাপাশি বিদ্যুতের ওপর চাপ ও পরিবেশ দূষণের সমস্যাও রয়েছে।’
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দেওয়া এবং ব্যাটারির মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে একটি ‘শাঁখের করাত’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, ‘একদিকে যেমন এটি হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র সম্বল, অন্যদিকে এটিই শহরে চরম বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।’
জীবিকা বনাম বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক দুঃসময়ে অনেক মানুষের জন্য রিকশা চালানোই বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। কিন্তু একই সঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক রিকশার কারণে যানজট সমস্যা প্রকট হচ্ছে এবং জনজীবনে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রতিদিন রিকশার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা বা সরানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।’
বিধিমালা ও দুর্নীতির চ্যালেঞ্জে সরকার রিকশা নিয়ন্ত্রণে নানা বিধিমালা তৈরির গ্রহণ করলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন সুজন সম্পাদক। তিনি উল্লেখ করেন, বিধিমালায় একজনের নামে রিকশার সংখ্যা সীমাবদ্ধ করার কথা থাকলেও প্রভাবশালী ও প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম কার্যকর হয় না। উল্টো এসব বিধিমালা অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
প্রযুক্তি ও বিকল্প ভাবনা সমস্যার সমাধানে বদিউল আলম মজুমদার প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে ‘আউট অব দ্য বক্স’ ভাবার পরামর্শ দেন। তিনি রিকশার বিকল্প হিসেবে আরও নিরাপদ, দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব যানবাহনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সপ্তম ও শেষ পর্ব: বিশ্ব মডেলেই কি নিয়ন্ত্রণ ‘অনিয়ন্ত্রিত চাকার’?
এমইউ/এএসএ/ এমএফএ