মতামত

আগুনে জ্বালানি, পুড়ছে জনজীবন: মূল্যবৃদ্ধির বহুমাত্রিক চাপ

জ্বালানি শুধু অর্থনীতির একটি খাত নয়; এটি আধুনিক জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে সেচযন্ত্র, কারখানার উৎপাদন লাইন থেকে শহরের গণপরিবহন—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সরাসরি জনজীবনের ব্যয়, উৎপাদন খরচ, বাজারদর, এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করছে, যার প্রতিফলন আমরা কৃষিখাত, পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।

Advertisement

জ্বালানির দাম বাড়ার ঘোষণা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবারই এই “বাড়া” শব্দটির ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অভিঘাত, যা কেবল লিটারপ্রতি কয়েক টাকার হিসাব নয়—বরং পুরো সমাজ-অর্থনীতির ওপর এক গভীর চাপ। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই বাস্তবতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

সরকারি ঘোষণায় দেখা যাচ্ছে, পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে—অর্থাৎ এক লাফে ১৯ টাকা বৃদ্ধি। ডিজেলের দাম প্রায় ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অর্থাৎ ১৫ টাকা বৃদ্ধি। কেরোসিনের দামও ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১৮ টাকা বৃদ্ধি। গড়ে এই বৃদ্ধি ১০–১৫ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে এর অভিঘাত এর চেয়েও অনেক বেশি। কারণ জ্বালানির দাম কেবল নিজস্ব খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো অর্থনীতিতে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে গতকাল রোববার (১৯ এপ্রিল) এক মাসেই দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানো হলো এলপি গ্যাসের দাম। এবার ভোক্তাপর্যায়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে ২১২ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হলো ১ হাজার ৯৪০ টাকা। যা গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির এই ঢেউ সবচেয়ে আগে আঘাত করে পরিবহন খাতে। বাংলাদেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের প্রায় সবটাই জ্বালানিনির্ভর। ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়া মানে বাস ও ট্রাকের পরিচালন ব্যয় সরাসরি বেড়ে যাওয়া। ফলে বাসভাড়া ২০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। একজন কর্মজীবী মানুষ যদি আগে প্রতিদিন ৫০ টাকা যাতায়াতে ব্যয় করতেন, এখন তা ৬৫–৭০ টাকায় দাঁড়াচ্ছে। মাস শেষে এই অতিরিক্ত খরচ ৪০০–৫০০ টাকা, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য বড় চাপ।

Advertisement

পরিবহনের এই ব্যয় বৃদ্ধি আবার বাজারদরে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ঢাকায় যে সবজি আসে, তা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকে করে আনা হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে ট্রাকভাড়া বাড়ে, আর সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামে যুক্ত হয়। ফলে সবজির দাম ৫–১০ শতাংশ, মাছ-মাংসের দাম ৮–১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা যায়। ৬০ টাকার সবজি ৭০ টাকায়, ১৮০ টাকার মাছ ২০০ টাকায় পৌঁছে যায়। এভাবে খাদ্য ব্যয়ই একটি পরিবারের মাসিক খরচে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।

এদিকে, জ্বালানির দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাস ভাড়া ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে মালিক সমিতি। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পর অঘোষিতভাবে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকার গণপরিবহন চালকরা। যাত্রীদের অভিযোগ, গতকাল রোববার সকাল থেকে ঢাকার সব গন্তব্যে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া নেন বাসচালক এবং তাদের সহযোগীরা। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে জ্বালানির দাম বেড়েছে বলে জানান তারা। যদিও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গতকাল রোববার বিকেল পর্যন্ত বাস ভাড়া বাড়ার ঘোষণা দেয়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

কৃষিখাতে প্রভাব আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশে সেচনির্ভর কৃষি ব্যাপকভাবে ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়া মানে প্রতি বিঘা জমিতে সেচ খরচ ৩০০–৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া। একজন কৃষকের যদি ৫ বিঘা জমি থাকে, তাহলে তার অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় ১,৫০০–২,৫০০ টাকা। এই খরচ কৃষক একা বহন করতে পারেন না; শেষ পর্যন্ত তা চাল, গম, সবজি—সবকিছুর দামে যুক্ত হয়। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়।

গতকাল জাগো নিউজে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, দেশে এখন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর প্রায় ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। দেশের ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রমও ডিজেলনির্ভর। পাশাপাশি ক্ষেত প্রস্তুত থেকে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্তও ডিজেল লাগে। সরকার লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোয় কৃষকের খরচ বাড়বে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

Advertisement

শিল্পখাতে এই মূল্যবৃদ্ধি এক ধরনের “নীরব সংকট” তৈরি করে। একটি কারখানা যদি মাসে ৫০,০০০ টাকার জ্বালানি ব্যবহার করে, তাহলে ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের অতিরিক্ত খরচ হয় ৭,৫০০ টাকা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই অঙ্ক লাখ টাকায় বা কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, রপ্তানিযোগ্য পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যায়, এবং অনেক ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়ে যায়। তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিনির্ভর শিল্পে এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর সুযোগ সবসময় থাকে না।

শিল্পখাতে এই মূল্যবৃদ্ধি এক ধরনের “নীরব সংকট” তৈরি করে। একটি কারখানা যদি মাসে ৫০,০০০ টাকার জ্বালানি ব্যবহার করে, তাহলে ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের অতিরিক্ত খরচ হয় ৭,৫০০ টাকা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই অঙ্ক লাখ টাকায় বা কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, রপ্তানিযোগ্য পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যায়, এবং অনেক ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়ে যায়। তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিনির্ভর শিল্পে এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর সুযোগ সবসময় থাকে না।

বিদ্যুৎ খাতে প্রভাবটি কিছুটা পরোক্ষ হলেও অনিবার্য। গ্যাস, ডিজেল বা কয়লার দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ৫–১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একটি পরিবার যদি আগে মাসে ১,৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিত, এখন তা ১,৮০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একইভাবে এলপিজি গ্যাসের দাম ৫০–১০০ টাকা বাড়লে রান্নার খরচও বেড়ে যায়। ফলে শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।

এই সবকিছু মিলিয়ে একটি পরিবারের সামগ্রিক ব্যয়ের চিত্রটি বিবেচনা করা যাক। আগে যদি মাসিক ব্যয় ১৫,০০০ টাকা হতো, তাহলে এখন তা বেড়ে ১৭,০০০–১৮,০০০ টাকায় পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ মাসে অতিরিক্ত ২,০০০–৩,০০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। যাদের আয় স্থির, তাদের জন্য এটি সরাসরি জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা সঞ্চয়ের খাতে কাটছাঁট করতে হয়।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি সামাজিক বাস্তবতাও তৈরি করে। যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন সমাজে অসন্তোষ বাড়ে, বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। নিম্ন আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়। ফলে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে।

তবে এই সংকটের ভেতরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। এটি আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই সময় বিকল্প জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানো জরুরি।

দুই.

মূল্যবৃদ্ধিতে কীভাবে মানিয়ে চলবে মানুষজন-

জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে “মানিয়ে নেওয়া” কথাটা শুনতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে এটি এক কঠিন সমীকরণ। কারণ মানুষের আয় তো একই হারে বাড়ে না, কিন্তু খরচ বাড়ে একসঙ্গে—পরিবহন, বাজার, বিদ্যুৎ, গ্যাস—সবখানেই। ফলে মানিয়ে চলা মানে আসলে নতুনভাবে জীবনযাত্রা সাজানো, অগ্রাধিকার বদলানো, আর কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ছাড় দেওয়া। তবু বাস্তবতার ভেতরে থেকেই কিছু পথ খুঁজে নিতে হয়।

প্রথমত, দৈনন্দিন ব্যয়ের ধরনে পরিবর্তন আসবে—এটি প্রায় অনিবার্য। অনেক পরিবারই এখন হিসাব করে খরচ করবে। আগে যেখানে সপ্তাহে একাধিকবার মাছ-মাংস কেনা হতো, সেখানে কমে আসতে পারে। বাজারে বিকল্প পণ্যের দিকে ঝোঁক বাড়বে—দাম কম এমন সবজি, ডাল বা মৌসুমি খাবারের ব্যবহার বাড়বে। অর্থাৎ খাদ্যাভ্যাসেই এক ধরনের অভিযোজন দেখা যাবে।

যাতায়াতের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন অনিবার্য। যারা আগে একা রিকশা বা সিএনজি ব্যবহার করতেন, তারা গণপরিবহনে ঝুঁকবেন। অনেকে “শেয়ার” ভিত্তিক যাতায়াত বেছে নেবেন। এমনকি শহরের ভেতরে স্বল্প দূরত্বে হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়তে পারে। অফিসগামীদের মধ্যে কারপুলিং বা একসঙ্গে যাতায়াতের সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে পারে—যদিও আমাদের বাস্তবতায় এটি এখনও খুব বেশি প্রচলিত নয়।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ের প্রবণতা বাড়বে। প্রয়োজন ছাড়া লাইট, ফ্যান বা এসি ব্যবহার কমানো, কম বিদ্যুৎ খরচের যন্ত্রপাতি ব্যবহার—এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে। রান্নার ক্ষেত্রেও অনেক পরিবার গ্যাসের অপচয় কমানোর চেষ্টা করবে—একসঙ্গে রান্না করা, সময় কমিয়ে আনা ইত্যাদি। ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলো মিলেই বড় সাশ্রয় তৈরি করতে পারে।

আয়ের দিক থেকেও মানুষ বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করবে। কেউ অতিরিক্ত আয়ের জন্য পার্ট-টাইম কাজ খুঁজবে, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করবে, কেউ অনলাইনে কাজের দিকে ঝুঁকবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং বা ডিজিটাল কাজের আগ্রহ বাড়তে পারে। অর্থাৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি আয় বাড়ানোর চেষ্টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে এখানে একটি কঠিন বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে—সবাই সমানভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এই মানিয়ে নেওয়া অনেক বেশি কষ্টকর। তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও মৌলিক চাহিদায় ব্যয় হয়, ফলে খরচ কমানোর সুযোগ খুব সীমিত। এই শ্রেণির মানুষ অনেক সময় বাধ্য হয়ে পুষ্টিহীন খাবার খায়, চিকিৎসা পিছিয়ে দেয়, বা সন্তানের শিক্ষায় ব্যয় কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ তাদের “মানিয়ে নেওয়া” আসলে জীবনমানের অবনতি।

এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভর্তুকি, ন্যায্যমূল্যের বাজার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—এসব কার্যকর হলে মানুষের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জরুরি, যাতে অযৌক্তিকভাবে কেউ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে।

দীর্ঘমেয়াদে মানিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, গণপরিবহন উন্নত করা, এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রসার—এসব উদ্যোগ শুধু সরকারের নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—ছাদে সোলার প্যানেল ব্যবহার, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি কেনা—এসব ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে পারে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া মানে কেবল খরচ কমানো নয়; এটি একটি সামগ্রিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন। কেউ একটু কম খাবে, কেউ একটু বেশি হাঁটবে, কেউ নতুন আয়ের পথ খুঁজবে—এইভাবেই সমাজ ধীরে ধীরে নিজেকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। তবে এই অভিযোজন যেন মানুষের জীবনমানকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেটি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিন.নীতিনির্ধারকদের জন্য বর্ধিতমূল্যে মানিয়ে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কৃষিখাতে ভর্তুকি বাড়ানো, গণপরিবহনে দক্ষতা বৃদ্ধি, শিল্পখাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন—এসব উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যায়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমেও নিম্ন আয়ের মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।

আপাত দৃষ্টিতে জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ১৫–২০ টাকা বাড়া একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন মনে হলেও এর প্রভাব বহুগুণ বেশি। এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই এই সংকটকে শুধু একটি মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে না দেখে, একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব—অন্যথায় এটি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএস