আন্তর্জাতিক

মাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলাকে ‘ভালো জায়গা’ বানাতে পেরেছেন?

মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী নেতা নিকোলাস মাদুরো বন্দি হওয়ার আগে দেশটি ছিল একটি অন্ধকার ও আশাহীন জনপদ। তার শাসনব্যবস্থা সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতো এবং নির্বাচনে কারচুপি করতো। কিছু বিরোধী রাজনীতিককে হত্যা করা হয়েছিল, করা হয়েছিল নির্যাতন অথবা নিক্ষেপ করা হয়েছিল কারাগারে। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল এবং প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। ভেনেজুয়েলা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরও উন্মুক্ত বা সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে—এমন ধারণা করাটা ছিল আকাশকুসুম কল্পনার মতো।

Advertisement

কিন্তু মাদুরোকে আটক করার পরবর্তী ১০০ দিনে ভেনেজুয়েলা ভালোর দিকেই পরিবর্তিত হয়েছে। বিরোধী রাজনীতিকদের অনেকেই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন, তারা এখন প্রকাশ্যে বৈঠক করছেন। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এখন আর নিয়মিতভাবে দমন করা হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা তেল, গ্যাস এবং খনি সম্পদের দিকে নজর দিচ্ছেন। মাদুরোর সাবেক সহযোগী ডেলসি রদ্রিগেজ এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী দেশ চালাচ্ছেন, যদিও এর পেছনে রয়েছে অবাধ্য হলে সহিংসতার শিকার হওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি।

ট্রাম্পের ‘পারফেক্ট’ মডেল ও বাস্তবতা

ট্রাম্পকে ছাড়া এসবের কিছুই ঘটতো না। কিন্তু ভেনেজুয়েলা আসলে কী শিক্ষা দিচ্ছে, সে সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। প্রথমত, তিনি দেশটির এই পরিবর্তনকে এমনভাবে বর্ণনা করছেন যেন এটি সম্পূর্ণ হয়ে গেছে; তিনি বলছেন, ভেনেজুয়েলা ‘অবিশ্বাস্যভাবে সফল হয়েছে’। দ্বিতীয়ত, তিনি ভেনেজুয়েলাকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি মডেল হিসেবে তুলে ধরছেন। গত মার্চ মাসে ইরানের পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় আমরা যা করেছি, আমি মনে করি তা হলো একটি নিখুঁত, একদম নিখুঁত চিত্রনাট্য।’ উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ভুল।

আরও পড়ুন>>ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জর্জরিত মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলাযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঁতাত, কে সেই ভেনেজুয়েলার ‘মীরজাফর’?ট্রাম্পকে নিজের নোবেল পুরস্কার উপহার দিয়েও স্পষ্ট সমর্থন পেলেন না মাচাদোট্রাম্প কি এবার কিউবা দখলের পরিকল্পনা করছেন?

Advertisement

প্রথমত, ভেনেজুয়েলার ইতিবাচক পরিবর্তন এ পর্যন্ত খুবই সীমিত। যতক্ষণ না সেখানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ এটি নিরাপদ হবে না। আইনের শাসন যতক্ষণ পর্যন্ত শুধু ট্রাম্পের এই আশ্বাসের ওপর টিকে থাকবে যে—তিনি সরকারের ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ন্ত্রণে রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে না। তার ওপর, ভেনেজুয়েলার জনগণের মনে যে আশার সঞ্চার হয়েছে, একনায়কতন্ত্র থেকে উত্তরণে আরও অগ্রগতি না দেখলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। সেখানকার কারাগারগুলোতে এখনো প্রায় ৪৮০ জন রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান; নির্বাচন বিলম্বিত করলে শেষ পর্যন্ত তা অস্থিরতার জন্ম দেবে।

গণতন্ত্রের পথে প্রধান অন্তরায়

গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন একটি ভালো সম্ভাবনা। তবে এর পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং অস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন চাপ ছাড়া এই সম্ভাবনা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এর জন্য সম্ভবত বিরোধী দলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসা এবং নির্বাচনি প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে লড়তে বাধা দেওয়ার পর ভেনেজুয়েলার মানুষ তার রাজনৈতিক সহযোগী এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছিল; কিন্তু মাদুরো নিজে জিতেছেন বলে জালিয়াতি করেছিলেন। এবার ভেনেজুয়েলার জনগণকে হয়তো রাজপথে নামার পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যেতে হবে।

তার বৈদেশিক নীতির এই বিশাল সাফল্য বিক্ষোভকারীদের দাবির কারণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এমন ভয় হয়তো ট্রাম্পকে নির্বাচনের জন্য চাপ দিতে উদ্বুদ্ধ করবে। তার কিউবান-আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও ভেনেজুয়েলার সাফল্যের ওপর অনেক কিছু বাজি ধরেছেন, যার মধ্যে তার নিজের প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা’ ট্রাম্পের শক্তির জায়গা নয়। পাশাপাশি, ডেলসি রদ্রিগেজ নিশ্চিতভাবেই বিষয়টিকে টেনে লম্বা করার চেষ্টা করবেন এই আশায় যে, ট্রাম্প এক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিনিময়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার প্রলোভন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ জোরালো হবে।

কেন ভেনেজুয়েলা মডেল সর্বত্র চলবে না?

ট্রাম্প এবং তার কর্মকর্তারা যদি একটি গণতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলা গড়ে তুলতেও পারেন, তবে তার এই পদ্ধতি অন্যত্র সহজে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা ট্রাম্পের এই ‘লেনদেনমূলক’ পদ্ধতির কাছে অত্যন্ত নমনীয় ছিল। কারণ এটি দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আদর্শহীন ছিল। মাদুরো ছিলেন একজন ‘গ্যাংস্টার-ইন-চিফ’। তাকে অপসারণ করে ট্রাম্প অন্যদের আরও বেশি লাভের সুযোগ করে দিয়েছেন। ক্ষমতা এবং অর্থ দখল ছাড়া তাদের আর কোনো অভিন্ন বিশ্বাস ছিল না, তাই যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো চলতে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রের ইতিহাস এবং এর শক্তিশালী রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষও ট্রাম্পকে সাহায্য করেছে। কারণ এটি ভেনেজুয়েলার জনগণকে বর্তমান শাসনের বাইরে একটি দলের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ মাদুরোর বন্দিত্বকে সংকীর্ণভাবে দেখেছে—একজন ঘৃণ্য স্বৈরশাসকের ওপর আক্রমণ হিসেবে।

Advertisement

ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার ট্রাম্পের ব্যর্থ চেষ্টার সঙ্গে এর তুলনা করা যাক। যুদ্ধের শুরুতে যে হামলায় দেশটির সুপ্রিম লিডার আলী খামেনি নিহত হন, তা তেহরানের বাকি শাসনগোষ্ঠীকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং তারা পাল্টা আঘাত হানে। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত বা স্বার্থপর হোক না কেন, একটি অভিন্ন আদর্শ এই শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে। এর বিপরীতে, ডেলসি রদ্রিগেজের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তিটি ছিল মাদুরোর সেই স্বার্থপর মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

তাছাড়া, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এমনকি ক্ষুদ্র কিউবাও এ পর্যন্ত ট্রাম্পের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে টিকে রয়েছে। ৬৬ বছর ধরে দ্বীপটি কাস্ত্রো পরিবার দিয়ে শাসিত হচ্ছে, যারা দেশের দুর্নীতি সত্ত্বেও কমিউনিজমের সত্যিকারের বিশ্বাসী। কিউবা বা ইরান—কোনো দেশের শাসনব্যবস্থাই কোনো সুসংগঠিত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার সম্মুখীন নয়।

ট্রাম্প আদর্শকে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখেন। তিনি মনে করেন, অর্থ উপার্জনই আসল কথা। ভেনেজুয়েলায় তিনি ভুলবশত যে মডেলটিতে সফল হয়েছেন, সেটি যদি তিনি অনুসরণ করতে থাকেন, তবে বাস্তবতা তাকে ভুল প্রমাণ করবে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/