ট্রাম্প নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য যতই চেষ্টা করুন না কেন, এটি পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে এক লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করেছে। তার ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ দাবি এখন নির্বাচনি প্রচারণার সেইসব প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি ফাঁপা—যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ শুরু করবেন না’ এবং একজন ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হবেন। জয় দাবি করার পথ খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকেই বিজয়ী ঘোষণা করেছেন।
Advertisement
এই মিথ্যাচারের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন পাওয়ার জন্য ট্রাম্প এতটাই মরিয়া যে, তিনি সেইসব বিশ্বনেতার ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন যারা তার এই উন্মাদনাকে সমর্থন করছেন না (যার মধ্যে তার নিজের কিছু মাগা ভক্তও রয়েছেন)। ইরানি সভ্যতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পর, তিনি পোপ লিওকে ‘লুজার’ বলে আক্রমণ করেছেন এবং নিজেকে যিশুর পুনর্জন্ম হিসেবে জাহির করেছেন। এই বিভ্রান্ত লোকের জঘন্য কর্মকাণ্ডের কি কোনো শেষ নেই?
আরও খারাপ বিষয় হলো, তোষামোদকারী অনুচরেরা তার ক্ষমতার লালসাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং তার একনায়কতান্ত্রিক শৈলী অনুকরণ করছে। পাকিস্তানে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ২১ ঘণ্টা আলোচনার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মার্কিন দাবির সঙ্গে একমত হতে ইরানের ‘ব্যর্থতার’ নিন্দা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন>>যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকে কী হয়েছিল, ট্রাম্প এখন কী করবেন?ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে কঠিন ৪ পথ, নেই সহজ সমাধানমাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলাকে ‘ভালো জায়গা’ বানাতে পেরেছেন?
Advertisement
যেন কোনো রিয়েল এস্টেট চুক্তি করছেন—এমন ভঙ্গিতে কথা বলা ভ্যান্স জোর দিয়ে বলেন, তিনি তার ‘সেরা এবং চূড়ান্ত প্রস্তাব’ দিয়েছেন। তিনি ইসলামাবাদে আলোচনা করতে যাননি, গিয়েছিলেন আত্মসমর্পণের শর্ত চাপিয়ে দিতে। ট্রাম্প এবং ভ্যান্সের অভিধানে প্রকৃত আলোচনার কোনো স্থান নেই। তারা ইসরায়েলের শর্ত অনুযায়ী একটি তাৎক্ষণিক শান্তি চুক্তি চান।
ইরান ঘোষণা করেছে, মার্কিন পক্ষ তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি, এবং সেটিই সঠিক। বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল দুবার অতর্কিত হামলা চালিয়েছে, দেশটির নেতৃত্বকে হত্যা করেছে এবং ব্যাপকভাবে হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক আবাসন ধ্বংস করেছে। সঙ্গত কারণেই ইরানিরা মার্কিন অসততার বিষয়ে সতর্ক।
২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) সম্পন্ন করতে শত শত ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করেই একতরফাভাবে এটি বাতিল করেন এবং ইরানের ওপর ফের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন (যা ইরান এখন প্রত্যাহার চায়)। ২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিলিয়ন বিলিয়ন ইরানি ডলার মুক্ত করতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই সম্পদ আটকে রেখেছে।
বর্তমান সংকটটি সরাসরি ট্রাম্পের স্বৈরাচারী আচরণের সঙ্গে জড়িত।
Advertisement
এখন, মাত্র ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর, নিজের ঘনিষ্ঠ চাটুকার চক্রের বাইরে কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা সাধারণত যুদ্ধের শামিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইসলামাবাদে ভ্যান্সের এই অবাস্তব এবং অপরিপক্ব আচরণের স্বরূপ বোঝা যায় যদি আমরা একে মার্কিন আলোচক হেনরি কিসিঞ্জার এবং ভিয়েতনামের লি ডাক থোর সঙ্গে তুলনা করি, যারা ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করতে চার বছর আট মাস সময় নিয়েছিলেন। অথচ একদিনেরও কম সময় পরে ভ্যান্স পাকিস্তান ত্যাগ করেন এবং ইরানকে সতর্ক করেন যেন তারা তাদের সঙ্গে ‘খেলা’ না করে—যেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ধ্বংসলীলা কোনো ভিডিও গেম ছিল।
দুঃখজনকভাবে, যেসব জাতি যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে তাদের ইতিহাস ইরানের বর্তমান সন্দেহকে আরও জোরালো করে যে, ওয়াশিংটন যা-ই প্রতিশ্রুতি দিক না কেন তা বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। উত্তর কোরিয়া এবং ভিয়েতনাম—উভয় দেশের সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করেছিল। সংক্ষেপে, প্রেসিডেন্ট যে-ই হোন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা যায় না। ডেমোক্র্যাট হোক বা রিপাবলিকান, প্রেসিডেন্টরা আসেন এবং যান, কিন্তু মার্কিন অসততা এবং প্রতারণা অপরিবর্তিত থাকে।
বর্তমানে ইরানি পক্ষের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যেন দেশটিকে ধ্বংস করার জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়।
এ বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলো ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম ভ্যান ডংয়ের কাছে পাঠানো একটি চিঠি। সেখানে নিক্সন উল্লেখ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র উত্তর ভিয়েতনামের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে মার্কিন অংশগ্রহণের স্বাক্ষরিত চুক্তি (২৭ জানুয়ারি, ১৯৭৩) পূরণ করবে। নিক্সন অনুমান করেছিলেন, এই ক্ষতিপূরণ পাঁচ বছরে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। ভিয়েতনামি কর্মকর্তারা নিক্সনের দেওয়া কথা বিশ্বাস করেছিলেন এবং তাদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনায় ওই বিলিয়ন ডলার যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এজেন্ট অরেঞ্জ, বি-৫২ বোমারু এবং অর্ধ-মিলিয়ন মার্কিন সেনার অত্যাচারে বিধ্বস্ত সেই দেশকে একটি পয়সাও দেওয়া হয়নি। এও মনে রাখা উচিত যে, ১৯৫৪ সালের জেনেভা চুক্তিতে দুই বছরের মধ্যে ভিয়েতনামে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যখন সময় ঘনিয়ে এলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে, হো চি মিন ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হতে পারেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশে কখনো অবাধ নির্বাচন হতে দেয়নি।
মার্কিন সরকার নেটিভ আমেরিকান (আদিবাসী) জাতিগুলোর সঙ্গে যে ৫০০র বেশি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তার মধ্যে একটিও তারা রক্ষা করেছে এমন নজির পাওয়া কঠিন। ইতিহাসবিদরা এই চরম রেকর্ডকে ‘ভঙ্গ চুক্তির পথ’ নাম দিয়েছেন।
২০০৩ সালের এক সন্ধ্যায় পিয়ং ইয়ংয়ে উত্তর কোরীয়দের সঙ্গে আড্ডায় যখন আমি এই ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছিলাম, তারা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তারা বলেছিল, ‘আপনি বলতে চাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্মানবোধ নেই?’ দুঃখজনকভাবে আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলাম। আমি দেখেছিলাম, কোরিয়া যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি শান্তিচুক্তির আশা তাদের চোখ থেকে মুছে যাচ্ছে—যা ছিল ৫০ বছর আগে স্বাক্ষরিত একটি যুদ্ধবিরতি মাত্র। এখানে যোগ করা উচিত যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির ১৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে চলেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষই কোরিয়াকে কোনো ধরনের অবরোধের আওতায় রাখবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর নিরবচ্ছিন্ন অবরোধ বজায় রেখেছে, যা তাদের আর্থিক খাত, আন্তর্জাতিক ঋণ, বিনিয়োগ এবং ব্যবসা ও ভ্রমণকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইরানের ওপর ট্রাম্পের নতুন অবরোধের মতোই যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে কয়লা ও খনিজ রপ্তানিতে সহায়তা করা পরিবহন কোম্পানি, জাহাজ এবং ব্যক্তিদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্র কেবল তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং চুক্তিগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অথবা সেগুলোকে সিনেটে ভোটের জন্য পেশ না করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। একটি বড় উদাহরণ হলো তারা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সিদ্ধান্তগুলো উপেক্ষা করে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে (এবং ইসরায়েলকে) অব্যাহতি দিয়ে রেখেছে। আরেকটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসা, যা আমাদের নাতি-নাতনিরা একদিন হয়তো সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে। স্পষ্ট কারণেই যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে স্বাক্ষর করেনি।
এখন শেষ পর্যন্ত শুভবুদ্ধির উদয় হবে কি না তা একটি বড় প্রশ্ন। কেবল ‘শয়তানসুলভ’ ডোনাল্ড বা ‘শয়তানিয়াহু’ই মানবতার ওপর কালো মায়া ছড়াচ্ছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক রেকর্ড ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামনে কঠিন সময় আসছে। আজ এটিই বেশি সম্ভাব্য যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল আবারও ইরানিদের হত্যা করবে ও দেশটিকে ধ্বংস করবে, তবুও এই দানবরা একটি শান্তি চুক্তিতে সম্মত হবে না এবং এমন এক সংঘাত থামাবে না, যা ইরান কখনোই চায়নি।
লেখক: ড. জর্জ কাটসিয়াফিকাস, ‘ভিয়েতনাম ডকুমেন্টস’-এর সম্পাদক এবং ‘এশিয়াজ আননোন আপরাইজিংস’ গ্রন্থের লেখকসূত্র:মিডল ইস্ট মনিটর কেএএ/