নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে হত্যার সময় ব্যবহৃত ধারালো হাসুয়া এবং ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। জমি ভাগ বাটোয়ারার সূত্র ধরেই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
Advertisement
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এসব তথ্য জানান।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- নিহত হাবিবুর রহমানের ভাগনা সবুজ রানা (২৫), দুলাভাই শহিদুল ইসলাম এবং তার ছেলে শাহিন মণ্ডল।
এর আগে সোমবার (২০ এপ্রিল) মধ্যরাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
Advertisement
নিহতরা হলেন- উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ (৯) এবং তিন বছরের মেয়ে সাদিয়া আক্তার।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। খবর পাওয়ার পরেই ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক টিম যায় এবং আলামত সংগ্রহ করে। আমরা একটানা তদন্ত করে এই চার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হই। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইজন পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জীবনবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম পরিচয় বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, নমির উদ্দিনের ৫ মেয়ে এবং এক ছেলে। এর মধ্যে এক ছেলেকে তিনি ১৩ বিঘা জমি লিখে দেন এবং মেয়েদেরকে ১০ কাঠা করে জমি লিখে দেন। এ নিয়ে মেয়ে এবং জামাইদের মধ্যে মনোমালিন্য ছিল। ২০ এপ্রিল গ্রেফতার সবুজ এবং নিহত হাবিব ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে যায়। পরে গরু কিনতে না পেরে সন্ধ্যার ফিরে আসেন। তাদের মধ্যে আগে থেকে ক্ষোভ ছিল কীভাবে হাবিবকে মেরে ফেলা যায়। হাবিব এবং তার বংশধরদেরকে যদি মেরে ফেলা যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বোনেরা জমির মালিক হবে।
আরও পড়ুন:নওগাঁয় চার খুনের ঘটনায় মামলা, পুলিশ হেফাজতে ৫
Advertisement
এসপি বলেন, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে সবুজ তার নানার বাসায় যায়। এরপর তিনি তার মামা-মামি ও নানার সঙ্গে রাতের খাবার খায়। সবুজ খাবার খেয়ে বাইরে একটি মাঠে চলে যায়। সেখানে শহিদুল এবং শাহিন অবস্থান করছিলেন। সেখানেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করেন। তারা নমিরের থেকে জমির দলিল নিয়ে আসবে এবং হাবিবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবে। পরিকল্পনা শেষে শাহিন ওই বাড়িতে গিয়ে অবস্থান নেয়। সবুজ তখন তাদেরকে বলেন- বাসার সবাই যখন ঘুমাবে তখন যেনো তারা চলে আসে। এরপর রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার দিকে শহিদুল, স্বপন, সবুজ এবং শহিন মিলে হাবিবুরের ঘরে প্রবেশ করে। শাহিন হাবিবের ঘরে প্রবেশ করে বড় ধারালো হাসুয়া দিয়ে হাবিবকে জবাই করে। এরপর একে একে হাবিবের স্ত্রী এবং তার সন্তানদেরকে হত্যা করে।
পুলিশ সুপার বলেন, ওই বাড়িতে প্রবেশের পর নমির উদ্দিনের ঘরে বাইর থেকে ছিটকানি লাগিয়ে দেয়। যেন নমির উদ্দিন ঘর থেকে বের হতে না পারে। প্রথমে তারা হাবিবকে হত্যা করে এরপর হাবিবের স্ত্রী পপি সুলতানা প্রকৃতির ডাকে বের হলে সবুজ খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা ধারালো হাসুয়া দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর বাচ্চাদের ঘরে প্রবেশ করে বাচ্চাদেরকেও হত্যা করে। তাদের মূল টার্গেট ছিল জমি জমার উত্তরাধিকার। সবুজকেই তার নানা বেশি পছন্দ করতেন। সবুজ এটাও ভেবেছেন যে উত্তরাধিকার যদি শেষ করে দিতে পারি তাহলে সে বেশি জমির ভাগিদার হতে পারবেন।
তিনি বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। জায়গা জমি নিয়ে তাদের মধ্যে একটি ক্ষোভ ছিল। হত্যার কাজে ব্যবহৃত ধরালো অস্ত্রগুলো শাহিনের বাড়ির থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আরেকটি ধারালো ছোরা পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত পপি সুলতানের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়ামতপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে অধিকতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।
আরমান হোসেন রুমন/এনএইচআর/এএসএম