আন্তর্জাতিক

তামিলনাড়ুতে নির্বাচন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে কতখানি এগিয়ে বিজয়?

দক্ষিণ ভারতের তামিল নাড়ু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে তিরুনেলভেলিতে এক গরম ও আর্দ্র বিকেলে বিশেষভাবে সাজানো একটি ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া সি জোসেফ বিজয় বা থালাপতি বিজয়। তিনি দাবি করেন, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া থেকে ঠেকাতে একজোট হয়েছে।

Advertisement

৫১ বছর বয়সী এই নেতা বিশাল জনসমাগমের সামনে বলেন, আমার প্রতিপক্ষরা বাইরে থেকে আলাদা মনে হলেও তাদের লক্ষ্য একটাই- বিজয় যেন মুখ্যমন্ত্রী হতে না পারে। তার এই বক্তব্যের পর সমর্থকরা একসঙ্গে তার নাম ধরে স্লোগান দিতে শুরু করেন, যার অর্থ তামিল ভাষায় ‘জয়’।

উন্নত মানব উন্নয়ন সূচকের জন্য পরিচিত তামিল নাড়ু দীর্ঘদিন ধরেই চলচ্চিত্র তারকাদের নির্বাচিত করার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এদের মধ্যে অনেকেই মৃত্যুর পরও সাধারণ মানুষের কাছে দেবতুল্য সম্মান পান।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ২৩৪ সদস্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে তামিলনাড়ু। এই নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা রাজ্যের তারকা-রাজনীতিক প্রবণতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ও ঐতিহ্যগত দ্বিমুখী লড়াইকে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিয়েছে।

Advertisement

আশীর্বাদ না অভিশাপ?

২০২৪ সালে ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ নামে দল গঠন করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বিজয়। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ও প্রধান বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাজাগামের (এআইএডিএমকে) আধিপত্যের অবসান ঘটাবেন।

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা অন্যতম শরীক ভারতীয় কংগ্রেস। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা এদাপ্পাড়ি কে. পালানিস্বামী ১০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে শরিক হিসেবে রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দল বিজেপি।

ডিএমকে ও এআইএডিএমকে এই দুই দলই নিজেদের দ্রাবিড় রাজনীতির ধারক বলে দাবি করেযা জাতপাত বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সামাজিক সংস্কারের পক্ষে ও উত্তর ভারতের আধিপত্যের বিরোধিতায় গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন।

Advertisement

১৯৬৭ সাল থেকে দ্রাবিড় দলগুলো তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় রয়েছে। জাতীয় দলগুলো এখানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিজেপি ২৭টি আসনে ও কংগ্রেস ২৮টি আসনে লড়ছে নিজ নিজ জোটের অংশ হিসেবে। ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর ৭ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি হিন্দু, ৬.১ শতাংশ খ্রিস্টান ও ৫.৮ শতাংশ মুসলিম।

হিন্দুদের মধ্যে অনগ্রসর শ্রেণি ৪৫.৫ শতাংশ, অতিপশ্চাৎপদ ২৩.৬ শতাংশ এবং দলিত ২০.৬ শতাংশ। দলিতরা ঐতিহাসিকভাবে বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে।

খ্রিস্টান বাবা ও হিন্দু মা থেকে জন্ম নেওয়া বিজয় ‘ভেল্লালার’ সম্প্রদায়ের সদস্য, যা একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠী। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করা বিজয়ের ১৯৯২ সালের প্রথম চলচ্চিত্র ব্যর্থ হয়। পরে জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয়কান্তের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি সফলতা পান। ২০০৪ সালের ‘ঘিল্লি’ চলচ্চিত্র তাকে সুপারস্টার বানিয়ে দেয়।

২০১৩ সালের ‘থালাইভা’ চলচ্চিত্রে তিনি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেন। পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘জনা নায়াগান’-এর নামেও রাজনৈতিক ইঙ্গিত রয়েছে।

ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় লাখো মানুষকে আকৃষ্ট করলেও সমাবেশে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এক পদদলিত ঘটনায় ৪২ জন নিহত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, তিনি দলিত ও খ্রিস্টান ভোটের একটি অংশ পেতে পারেন ও সরকারবিরোধী ভোটেও ভাগ বসাতে পারেন। তবে অভিজ্ঞ দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তার লড়াই সহজ নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর কান্নান তাকে ‘একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তামিল নাড়ুতে তারকাদের রাজনীতিতে আসার ইতিহাস

বিজয় অনুসরণ করতে চান এমজি রামাচন্দ্রণ ও জয়রাম জয়ললিতার পথ। এমজিআর ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ও বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি চালু করেন। জয়ললিতা ছয়বার মুখ্যমন্ত্রী হন ও নারীবান্ধব নানা কর্মসূচি চালু করেন।

দ্রাবিড় রাজনীতিতে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যার মধ্যে সি এন আন্নাদুরাই ও এম করুণানিধি উল্লেখযোগ্য। বিশ্লেষকদের মতে, যারা তামিল পরিচয়ের রাজনীতি গ্রহণ করেছেন তারাই সফল হয়েছেন।

২০০৫ সালে অভিনেতা বিজয়াকান্ত দল গঠন করলেও বড় সাফল্য পাননি।

থালাপতির লক্ষ্য তরুণ ও নারী ভোটার

বিজয় মূলত ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী তরুণ ও নারী ভোটারদের লক্ষ্য করছেন। তিনি সমাবেশে বর্তমান সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে স্টালিন তার সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করছেন।

সব দলই জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিতে প্রতিযোগিতা করছে। ডিএমকে নারীদের ভাতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এআইএডিএমকে বিনামূল্যে ফ্রিজ ও অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

বিজয়ের দল বিনামূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার, নারীদের ভাতা, স্বর্ণ ও বিয়ের সহায়তা, বেকারদের ভাতা ও সুদমুক্ত শিক্ষাঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সহজ হবে না। কারণ তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় জনসমাগম মানেই ভোট নয়। তার দল এখনো সংগঠনগতভাবে দুর্বল ও দলটির অনেক প্রার্থীই অপরিচিত।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ