ভ্রমণ

সৌন্দর্যের শহর মাস্কাটে অনন্য ভ্রমণ

মরুভূমি পেরিয়ে ইতিহাস, প্রকৃতি ও শান্ত সৌন্দর্যের শহর মাস্কাটে অনন্য ভ্রমণ। দুর্গ, কর্নিশ, রাজপ্রাসাদ আর স্মৃতিতে গেঁথে থাকা অনুভূতির গল্প। জালান বনি বু আলি থেকে যাত্রা শুরু করে যখন অবশেষে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে পৌঁছলাম; তখন মনে হচ্ছিল ভিন্ন জগতের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ কখনো মরুভূমির নির্জনতা, কখনো পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, আবার কোথাও দূর দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া আকাশের নীল—সব মিলিয়ে যাত্রাটাই যেন ছিল অনন্য অভিজ্ঞতা। পথের প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করছিল এমন এক শহরকে আবিষ্কার করার জন্য, যার সৌন্দর্য শুধু চোখে নয়, মনেও গেঁথে যায়।

Advertisement

মাস্কাটে ঢুকেই প্রথম যে বিষয়টি আমার চোখে পড়লো, তা হলো শহরটির অদ্ভুত রকমের পরিপাটি আর গোছানো রূপ। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যেমন- সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহরগুলোতে আমি যে বিশাল বিশাল সুউচ্চ অট্টালিকার আধিপত্য দেখেছি; এখানে এসে তার একেবারেই ভিন্ন চিত্র চোখে পড়লো। মাস্কাট যেন নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। এখানে আকাশ ছোঁয়া ভবনের অহংকার নেই বরং আছে বিনয়ী স্থাপত্য, যা পাহাড় আর সমুদ্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে।

এই শহরের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সবুজায়ন। মরুভূমির দেশে থেকেও মাস্কাট যেন সবুজের প্রশান্তির দ্বীপ। রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ, পরিচ্ছন্ন পার্ক আর খোলামেলা পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে শহরটি যেন শান্ত, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। অন্য অনেক শহরের মতো এখানে কোলাহল নেই, নেই অস্থিরতা বরং আছে এক ধরনের নীরব সৌন্দর্য, যা ধীরে ধীরে হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়।

মাস্কাটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর ইতিহাসের গভীরতা। এই শহরের প্রতিটি ইট-পাথর যেন অতীতের গল্প বলে। বিশেষ করে ১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগালের শাসনের সময় নির্মিত দুর্গগুলো আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আল মিরানি ফোর্ট এবং আল জালালি ফোর্ট—এই দুটি দুর্গ যেন সময়ের বুক চিরে আজও টিকে থাকা জীবন্ত ইতিহাস। দূর থেকে এগুলোকে দেখলে মনে হয়, যেন পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে বানানো কোনো প্রাচীন কাহিনির অংশ।

Advertisement

আরও পড়ুনফুজি সান: ফিফথ স্টেশনের পথে- শেষ পর্ব 

এরপর আমি পৌঁছলাম মাস্কাট গেট এলাকায়, যা মাস্কাট শহরের একেবারে প্রাচীন অংশ হিসেবে পরিচিত। একসময় এটি ছিল পুরো শহরের মূল প্রবেশপথ। কল্পনা করতে ভালো লাগে একটা সময় সূর্যাস্ত হলেই দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হতো, শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। সেই প্রথা চলেছিল ১৯৭০ সাল পর্যন্ত। পরে ১৯৯৫ সালে এটি সংস্কার করা হয়। এখন এটি শুধু একটি প্রবেশপথ নয় বরং ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক। পাশে অবস্থিত মাস্কাট গেট মিউজিয়াম যেন সেই অতীতকে আরও জীবন্ত করে তোলে, যেখানে শহরের পুরোনো দিনগুলোর গল্প সংরক্ষিত আছে।

শহরের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে আমি চলে গেলাম বিখ্যাত মুত্তরাহ কর্নিশে। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে তৈরি এই কর্নিশ যেন মাস্কাটের হৃদস্পন্দন। এখানে দাঁড়িয়ে যখন নীল জলরাশির দিকে তাকাই, মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে। হালকা বাতাস, ঢেউয়ের মৃদু শব্দ, আর দূরে নোঙর করা জাহাজ—সবকিছু মিলিয়ে অপার্থিব অনুভূতি তৈরি করে। এখানেই চোখে পড়লো ওমানের সুলতানের ব্যক্তিগত সুপার ইয়ট আল সাঈদ ইয়ট। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও বিলাসবহুল ইয়টটি সাধারণত পোর্ট সুলতান কাবুস বন্দরে অবস্থান করে। দূর থেকে ইয়টটিকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো ভাসমান প্রাসাদ সমুদ্রের বুকে বিশ্রাম নিচ্ছে।

এরপর আমার যাত্রা এগিয়ে গেল আল সাইদিয়া স্ট্রিট ধরে। এ ঐতিহাসিক রাস্তা যেন সরাসরি নিয়ে যায় ওমানের রাজকীয় ঐতিহ্যের দিকে। রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে থাকা স্থাপত্য, পাহাড়ের পটভূমি আর নিস্তব্ধ পরিবেশ—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। এ পথের শেষেই দেখা মেলে আল আলম প্যালেসের, যা ওমানের সুলতানের রাজকীয় প্রাসাদ।

আল আলম প্যালেসের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, এটি শুধু একটি প্রাসাদ নয় বরং একটি প্রতীক। ওমানের গৌরব, ঐতিহ্য এবং স্থাপত্য সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। এর নীল সোনালি রঙের অসাধারণ নকশা, চারপাশের পরিপাটি পরিবেশ আর পাহাড় ঘেরা অবস্থান—সব মিলিয়ে এটি যেন এক রাজকীয় স্বপ্নের বাস্তব রূপ। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আল মিরানি ও আল জালালি দুর্গ যেন এ প্রাসাদকে পাহারা দিচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।

Advertisement

আরও পড়ুনআরব সাগরের নীল জলরাশি ছুঁয়ে যে শহর 

পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে মুগ্ধকর বিষয় ছিল, মাস্কাট নিজেকে আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে ফেলেনি। বরং এটি তার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আধুনিকতার সঙ্গে সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করেছে। এখানে যেমন উন্নত সড়ক ব্যবস্থা আছে; তেমনই আছে প্রাচীন স্থাপত্যের সংরক্ষণ। এখানে যেমন আধুনিক জীবনযাত্রা আছে; তেমনই আছে ইতিহাসের গভীর ছোঁয়া।

এ শহর আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, সৌন্দর্য শুধু উঁচু ভবনে বা ঝলমলে আলোতে নয় সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সরলতায়, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতায় আর ইতিহাসের প্রতি সম্মানে। মাস্কাট ঠিক তেমনই একটি শহর যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি সমুদ্রতট যেন একেকটি গল্প বলে।

ওমানে কাটানো সময়টা আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণ নয় বরং গভীর অনুভূতির নাম। এখানে আমি দেখেছি প্রকৃতি, ইতিহাস আর মানুষের জীবনের অপূর্ব মেলবন্ধন। এমন একটি শহর, যা চোখে দেখার পরও মনে থেকে যায়। আর মনে থাকার পরও যেন পুরোপুরি বোঝা যায় না। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য।

এসইউ