দেশজুড়ে

আবহাওয়া-জলবায়ুর প্রভাব বিশ্লেষণে খুলতে পারে নতুন দিগন্ত

দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগে স্থাপিত ‘অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন’ (স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র)। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই স্টেশনটি তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি-দিক, আর্দ্রতা এবং সৌর বিকিরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

Advertisement

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২ বছর ধরে প্রতি মিনিটের আবহাওয়া বার্তা নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা এই স্টেশনটি কেবল জাপানের সঙ্গে উচ্চতর গবেষণার সেতুবন্ধনই তৈরি করেনি, বরং সৌর বিকীরণের মতো জটিল তথ্য সরবরাহে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জন্য একটি শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গবেষণার সুযোগ করে দিয়ে জাবির এই কেন্দ্রটি এখন দেশের বিজ্ঞান চর্চায় এক অনন্য গর্বের নাম।

পটভূমি ও লক্ষ্য

সংশ্লিষ্টরা জানায়, জাবির অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশনটি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ টি এম শাখাওয়াত হোসেন এর সঙ্গে জাপানের কাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোরু তেরাও ও টোকোহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইউসুকে ইয়ামানের নেতৃত্বে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ এবং বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করা। স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি ও দিক, আর্দ্রতা এবং সূর্যালোকের স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান SAARC Meteorological Research Centre-এর সম্পৃক্ততায় জাপানের সহায়তায় বাংলাদেশে বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট চারটি স্থানে এই ধরনের স্টেশন স্থাপন করা হয়, যার মধ্যে জাবির স্টেশনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে এসব তথ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Advertisement

আরও পড়ুনআওয়ামী লীগ আমলে জাবিতে ছাত্রদল করাই ছিল তাদের একমাত্র অপরাধউদ্বোধনের আগেই নষ্ট হওয়ার পথে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত খেলার মাঠরেমিট্যান্সে রেকর্ড, নতুন নতুন জেলায় বাড়ছে প্রবাসী আয়ঢাকায় প্রতিদিন চুরি হচ্ছে একটি গাড়ি-মোটরসাইকেল

প্রতি মিনিটে রেকর্ড করা ডেটাগুলো উচ্চ রেজোল্যুশনের। বিশেষ করে সূর্যের তেজস্ক্রিয়তা (সৌর বিকিরণ, দীর্ঘ তরঙ্গ, স্বল্প তরঙ্গ বিকিরণ) এর তথ্য বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও অন্যান্য আবহাওয়া তথ্য সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুপস্থিত রয়েছে। স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি এর সম্পূরক ভূমিকা পালন করে। যা আবহাওয়াবিদদের সরাসরি সহযোগিতা করছে।

গবেষণায় অভাবনীয় সাফল্য

জাবির ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে জাপানের এই সমন্বয়ের ফলে প্রতি বছর জাপান থেকে দু’জন শিক্ষক এখানে আসেন। দুইজন গবেষণা শিক্ষার্থী মো. লুৎফুর রহমান এবং মো. শফিকুল ইসলাম সানি—এই স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে জাপানি প্রফেসরদের যৌথ তত্ত্বাবধানে তাদের স্নাতকোত্তর গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে প্রবন্ধও প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও এখন পর্যন্ত ৯ জন শিক্ষার্থী ও চার জন শিক্ষক এই স্টেশনের মাধ্যমে গবেষণা করে জাপানের বিভিন্ন সেমিনার, কনফারেন্স, সায়েন্টিফিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করা সুযোগ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও গেছেন।

সম্প্রতি এশিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং জিওলজি জার্নালে এই স্টেশনের সহায়তায় ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম সানির গবেষণা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় স্টেশনটি প্রতি মিনিটে ১২ সেক্টরে তথ্য সংগ্রহ করে, যা আবহাওয়ার প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণা কাজে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই তথ্য দিয়ে এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শারীরিক রোগ বালাইয়ের (হেল্থ হেজার্ড) মধ্যে একটি সম্পর্ক খোঁজ করার গবেষণা কাজ করছি। আশা করছি, খুব দ্রুতই এর সফলতা আসবে।

Advertisement

‘‘স্বয়ংক্রিয় স্টেশনটি প্রতি মিনিটে ১২ সেক্টরে তথ্য সংগ্রহ করে, যা আবহাওয়ার প্রতি মুহুর্তের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণা কাজে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’’

ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী সিহা আহমেদ বলেন, ‘অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র। এখানে প্রতি মিনিটে যে উচ্চ রেজোল্যুশনের ডেটা সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। পূর্বে এসকল তথ্য সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য ছিল, যা আমরা এখন সহজেই এখন থেকে সংগ্রহ করতে পারি। যার ফলে, আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে যে-কোনো ধরনের গবেষণা করতে পারছি। গবেষণার জন্য এর মাধ্যমে অনেক পথও খুলে গেছে।

ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ টি এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই স্টেশন শুধু আবহাওয়া গবেষণার একটি যন্ত্র নয় —এটি ভবিষ্যতের জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর মাধ্যমে গত ১২ বছর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি এই তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্থানীয় আবহাওয়ার ধরণ, মৌসুমি পরিবর্তন এবং জলবায়ুর অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

এছাড়াও সার্কভুক্ত অন্য ওয়েদার স্টেশনগুলোর তথ্য নিয়ে আন্তর্দেশীয় গবেষণায় কাজ করা সম্ভব বলে জানান তিনি। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

আরও পড়ুন৮ বছরেও শুরু হয়নি জাবির নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজরূপগঞ্জে বিদ্যুতের ‘লুকোচুরি’, উৎপাদন সংকটে ২ হাজার কলকারখানা

ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. হুসাইন মো. সায়েম বলেন, এই স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ডাটা নেওয়া যায়। যা প্রতিনিয়ত সংয়ক্রিয়ভাবে স্টোর হয়ে থাকে। বৃষ্টিপাতের সময়কাল, সূর্যালোকের সময় এবং এর প্রখরতা, বাতাসের আর্দ্রতা, ঝড়ের মাত্রা ও গতিবেগ ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের তথ্য এতে সংরক্ষণ করা হয়।

‘‘অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র। এখানে প্রতি মিনিটে যে উচ্চ রেজোলিউশনের ডেটা সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। পূর্বে এসকল তথ্য সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য ছিল, যা আমরা এখন সহজেই এখন থেকে সংগ্রহ করতে পারি। যার ফলে, আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে যে-কোনো ধরনের গবেষণা করতে পারছি। গবেষণার জন্য এর মাধ্যমে অনেক পথও খুলে গেছে।’’

তিনি আরও জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তর, জলসম্পদ বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রয়োজনে এই তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব, যা দেশের জলবায়ু পরিকল্পনা ও গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে জাবির স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র আমাদের জন্য একটি গর্বের বিষয়। আমরা আশা করি, এই স্টেশনের মাধ্যমে বৈশ্বিক গবেষণায় জাবি শিক্ষার্থীরা আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। স্টেশনটি আরও ভালো করে কার্যকর করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাধিক সহযোগিতা করা হবে।

কেএইচকে/এমএস