অর্থনীতি

দেশে প্রবৃদ্ধি-বিনিয়োগ চাইলে বাজেট বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে বাজেটের আকার বৃদ্ধি অপরিহার্য।

Advertisement

শনিবার (২৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আপনি যদি দেশের প্রবৃদ্ধি চান, বিনিয়োগ চান, তাহলে বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

আমির খসরু তার বক্তব্যে বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান, সরকার কঠিন সময় অতিক্রম করছে এবং পূর্ববর্তী পরিস্থিতি থেকে পাওয়া সংকট মোকাবিলা করেই এগোতে হচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

‘স্বৈরাচার, তার পরবর্তী ১৮ মাস- আমি বিগত দিনে যেতে চাই না। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আপনি চিন্তা করেছেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় যাচ্ছে, কত বড় গর্তের মধ্যে আমরা পড়েছি? এখান থেকে বেরিয়ে আসার যে সংগ্রাম, এটা আমরা সবাই মিলে করতে হবে। বিএনপি বা সরকার একা এটা করতে পারবে না,’ যোগ করেন অর্থমন্ত্রী।

Advertisement

তিনি জোর দিয়ে জানান, সরকারের অগ্রাধিকার হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা বজায় রাখা। অতীতের বিএনপি সরকারের উদাহরণ টেনে তিনি দাবি করেন, সেই সময়গুলোতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক খাত স্থিতিশীল ছিল।

অর্থমন্ত্রী ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া এবং অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর বিপক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের নীতি সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে ‘ক্রাউড আউট’ করে দেয়। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। বেসরকারি খাত বড় হতে পারছে না, কারণ সরকারই অধিকাংশ অর্থ নিয়ে নিচ্ছে।

আমির খসরু বলেন, সরকার অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করতে চায়। রাজনৈতিক গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রও জরুরি। মানুষ যদি অর্থনীতিতে অংশ নিতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না।

তিনি জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কারিগর যারা এতদিন উপেক্ষিত ছিলেন, তাদের জন্য অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে এসব খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Advertisement

স্বাস্থ্য খাতে উচ্চ ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ (ব্যক্তির পকেট থেকে হওয়া খরচ) কমাতে সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালুর পরিকল্পনা করছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ে মানুষের ব্যক্তিগত খরচ অত্যন্ত বেশি, এটা কমাতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায়।

অর্থমন্ত্রী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনমিতিক লভ্যাংশ) অর্জনের জন্য এই দুই খাতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ ছাড়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি জানান, জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও প্রয়োজনীয়।

শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শুধু প্রথাগত ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করতে ‘ডিরেগুলেশন’ বা বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি রেস্তোরাঁর লাইসেন্স পেতে প্রায় ৩৯টি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে। এভাবে চলতে পারে না। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসা সহজ করতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আমির খসরু উল্লেখ করেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার সতর্ক রয়েছে এবং উচ্চ সুদের ঋণ নেওয়া এড়ানো হবে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের সংস্কার এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

ন্যানো টেকনোলজি ও ডিজিটালাইজেশন নিয়েও সরকার গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে বলে জানান তিনি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য জনগণকে দক্ষ করে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী।

এমএএস/একিউএফ