ডক্টর মুফতি ইসমাইল ইবনে মুসা মেনক, যিনি মুফতি মেনক নামে বেশি পরিচিত, হলেন একজন মুসলিম শিক্ষাবিদ, ইসলাম প্রচারক ও বক্তা। তিনি বর্তমানে জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি। ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৭ সালে জর্ডানের রয়্যাল আল আল-বাইত ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক থট তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০০ মুসলমানের অন্যতম হিসাবে ঘোষণা করে।
Advertisement
মুফতি মেনক এক বক্তব্যে মহানবীর (সা.) হজ পালন এবং সাহাবিদের বিদায় জানানোর মুহূর্তগুলো মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন। ২০ মার্চ ২০২১ নিজের ভেরিভায়েড ইউটিউব চ্যানেলে `The Farewell Pilgrimage' শিরোনামে ওই বক্তব্যের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তার বক্তব্যের সারাংশ তুলে ধরছি।
মুফতি মেনক বলেন,
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, প্রতিটি গল্পের একটি শুরু আছে এবং প্রতিটি যাত্রার একটি শেষ আছে। কিন্তু কিছু জীবন হৃদস্পন্দন থেমে গেলেও শেষ হয় না। কিছু জীবন বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ ধরে অগণিত হৃদয়ে, অগণিত আত্মায়, অগণিত মানুষের আবেগে, অশ্রুতে। আজ আমরা আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সঙ্গে হাঁটছি তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে। সঙ্গীদের কাছে তিনি রাজা, শাসক বা বিজেতা নন, বরং ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, পিতা ও বন্ধু যাঁর হৃদয় সব সময় তাদের কল্যাণচিন্তায় ব্যাকুল থাকতো। আমরা তাঁর পাশে দাঁড়াই আরাফায়, যেখানে তাঁর কণ্ঠস্বর দুর্বলতার কারণে নয়, ভালোবাসার ব্যাকুলতায় কেঁপে উঠেছিল। তিনি আমাদের এমন এক বাণীর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যা কেয়ামত পর্যন্ত আমাদের বহন করতে হবে।
Advertisement
জিলকদ মাসের শেষ হওয়ার পাঁচ রাত আগে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবিদের হজের প্রস্তুতি নিতে বললেন। এটি ছিল হিজরতের পর তাঁর প্রথম ও শেষ হজ—বিদায় হজ। এক লক্ষেরও বেশি সাহাবি নবীজির (সা.) আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর সঙ্গে হজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। নবীজি (সা.) আবু দুজানাকে মদিনার গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং কোরবানির পশু সঙ্গে নিয়ে হজ ও ওমরাহর নিয়ত করেন, অধিকাংশ সাহাবিও তাই করেন।
৯ই জিলহজ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফায় তাঁর প্রিয় উট কাসওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন:
“লোকসকল, আপনারা আমার কথা মন দিয়ে শুনুন! আমি জানি না, এই বছরের পর আবার এই স্থানে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে কি না।
জেনে রাখুন! আপনাদের রক্ত ও সম্পদ পরস্পরের জন্য পবিত্র, যেমন এই দিন, এই মাস ও এই শহর পবিত্র। আমানত তার মালিককে ফিরিয়ে দিন। একে অপরের প্রতি অন্যায় করবেন না। সব সুদ বাতিল করা হলো। আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ আমি বাতিল করে দিলাম। শয়তান থেকে সাবধান থাকুন। নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আপনারা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’
Advertisement
নবীজি (সা.) আরও বললেন:
‘আমি আপনাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি—আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ। যদি এগুলো আঁকড়ে ধরতে পারেন, কখনো পথভ্রষ্ট হবেন না।’
সূর্যাস্তের সময় আরাফায় ওহি নাজিল হলো:
‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে পছন্দ করলাম।’
ওমর (রাঃ) কেঁদে বললেন, ‘পূর্ণতার পর আর কিছু থাকে না, শুধু পতন।’
মিনা থেকে নবীজি (সা.) বললেন:
‘হে মানুষ, আমি কি বার্তা পৌঁছে দিয়েছি?’ সবাই বলল, ‘হ্যাঁ।’ নবীজি (সা.) আকাশের দিকে হাত তুলে তিনবার বললেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন!’
বিদায় হজ শেষে মদিনায় ফিরে নবীজি (সা.) উসামার নেতৃত্বে একটি সেনাদল সিরিয়ার দিকে পাঠালেন। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন—যে অসুস্থতায় তিনি তাঁর রবের কাছে ফিরে যান। এ ছিল পূর্ণতার, রহমতের ও বিদায়ের হজ। আরাফায় তিনি নবুয়্যতের মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত করলেন। তাঁর শেষ আহ্বান ছিল:
‘যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথাগুলো পৌঁছে দেবেন। হয়তো পরের শ্রোতাদের অনেকে আমার কথাগুলো আজকের শ্রোতাদের চেয়ে ভালো বুঝবে।’
অতঃপর শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ নবী (সা.) তাঁর প্রেরকের কাছে ফিরে গেলেন। তাঁর পবিত্র আত্মা কোমলভাবে উঠিয়ে নেওয়া হলো। তিনি এই দুনিয়া ছেড়ে গেলেন এই শব্দে:
‘হে আল্লাহ, সর্বোচ্চ সঙ্গী!’
সাহাবিরা কেঁদে উঠলেন। পৃথিবী থেমে গেল। আকাশ ভারী হয়ে উঠল। আজও আমাদের হৃদয় সেই করুণ মুহূর্ত অনুভব করে।
কিন্তু নবীজির (সা.) ইন্তেকালের মাধ্যমে সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি। তিনি যে আলো এনেছিলেন তা তাঁর সঙ্গে চলে যায়নি। তা বেঁচে আছে আমাদের প্রতি ওয়াক্ত নামাজে, প্রতিটি নেক কাজে, প্রত্যেক হৃদয়ে।
আল্লাহ তাআলা হাওজে কাওসারে তাঁর সঙ্গে আমাদের একত্রিত করুন!”
ওএফএফ