ভ্রমণ

হারিয়ে যাচ্ছে ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পালগিরি জামে মসজিদ

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার নিভৃত গ্রাম পালগিরি। সেখানে শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এক গম্বুজ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মসজিদ, নাম পালগিরি জামে মসজিদ। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি এখন যেন নিজের চোখের সামনেই নিজের অস্তিত্ব হারানোর পথে।

Advertisement

সম্প্রতি মসজিদের সামনের অংশ ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্তে মাত্র ২ লাখ টাকার বিনিময়ে পাশের এলাকার মো. জয়নাল আবেদিন ওই অংশ ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। বিস্ময়কর বিষয় এতো বড় একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙার আগে উপজেলা প্রশাসনকে কিছুই জানানো হয়নি।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা মসজিদের সামনের অংশ ভেঙে ট্রাক্টরে তুলছেন। অথচ মূল গম্বুজবিশিষ্ট ঐতিহাসিক অংশটি পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায় যেন কোনো সময় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ভেতরের দৃশ্য আরও হতাশাজনক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বেডিং, বইপত্র ও নানা সামগ্রী এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। পুরো পরিবেশ দেখে মনে হয়, এটি আর কোনো পবিত্র উপাসনালয় নয়, বরং পরিত্যক্ত একটি ভবন।

দীর্ঘদিনের অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদের ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে। ইতিহাসের ভার যেন আর বহন করতে পারছে না এই স্থাপনাটি।

Advertisement

স্থানীয়দের মতে, এটি সুলতানি আমলের একটি অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। যদিও এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় স্থান পায়নি, তবুও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই নিদর্শনটি দেখতে।

পালগিরি বেগম রাবেয়া উচ্চবিদ্যালয় ও থানা বিবি দিঘির পাশেই অবস্থিত এই মসজিদটির ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। জনশ্রুতি আছে, ১৬১৬ সালে খন্দকার বাড়ির হযরত মাওলানা শাহ সুফী আলী বদ্দিন খন্দকার ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে মসজিদটির সন্ধান পান। পরে ১৮০২ সালে এটি পুনঃসংস্কার করা হয়।

স্থানীয়দের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে এখানে নামাজ আদায় হয়েছে। পরবর্তীতে সৈয়দ আহমদ পাটোয়ারী মসজিদের নামে ২০ শতক জমি ওয়াকফ করেন। মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে পাশে ও পেছনের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়, যা বছরের পর বছর মুসল্লিদের ইবাদতের স্থান ছিল।

মসজিদটির সাবেক ইমাম, ২৬ বছর দায়িত্ব পালন করা হাফেজ আব্দুল কাদের জানান, মূল ঐতিহাসিক অংশ অক্ষত রেখেই বর্ধিত অংশ ভেঙে সেখানে নতুন মাদ্রাসা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

Advertisement

মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার আমির হোসেন মেম্বার বলেন, ‘মূল অংশটি এখন আর ধর্মীয় কাজে ব্যবহার হয় না। পাশেই নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। সামনের অংশটি আগে মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু বর্তমানে সেটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল বলেন, ‘আমি বিষয়টি আগে জানতাম না। নতুন যোগদান করেছি। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কীভাবে, কেন এবং কারা এটি ভাঙছে তা তদন্ত করা হবে।’

অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কুমিল্লা ফিল্ড অফিসার সজিব হোসেন বলেন, ‘আমাদের তালিকায় মসজিদটি নেই। থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যেত। তবে যেহেতু এটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো স্থাপনা, আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করবো। তখন এটি সংরক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুনসদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্পপিরোজপুরের ২০০ বছরের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে

এমএসআই/কেএসকে