লাইফস্টাইল

চিনি ছাড়ার পর দ্রুত ওজন কমার রহস্য

চিনি কম খাওয়া বা একেবারে বাদ দেওয়া এখন অনেকের কাছেই একটি জনপ্রিয় স্বাস্থ্যচর্চা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়-কেউ এক মাস চিনি ছেড়ে দিয়ে ওজন কমিয়েছেন, কারও শরীর হালকা লাগছে, আবার কারও ত্বকে এসেছে পরিবর্তন। তবে বাস্তবে এক মাস চিনি বাদ দিলে ওজন কতটা কমতে পারে-এটা কি সবার ক্ষেত্রে একই রকম? বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

Advertisement

কেন চিনি ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে

অতিরিক্ত চিনি, বিশেষ করে কোমল পানীয়, মিষ্টি, প্যাকেটজাত জুস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা লুকানো চিনি শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে। সমস্যা হলো এ ধরনের খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে না। ফলে- দ্রুত ক্ষুধা ফিরে আসে, বারবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বেশি চিনি খাওয়ার কারণে শরীরে কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে- ওজন বৃদ্ধি, পেটের আশেপাশে চর্বি জমা, রক্তে শর্করার মাত্রা, দ্রুত ওঠানামা, অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস তৈরি, টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি। বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় অনেক সময় শরীরে প্রচুর ক্যালোরি ঢুকিয়ে দেয়।

এক মাসে কতটা ওজন কমতে পারে?

এ প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট বা সবার জন্য একক উত্তর নেই। কারণ ওজন কমা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তিভেদে। এছাড়া দৈনিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুমের মান, বিপাকক্রিয়ার গতি, মোট ক্যালোরি গ্রহণের ওপর নির্ভর করে। যারা আগে নিয়মিত মিষ্টি, কোমল পানীয়, ডেজার্ট বা চিনিযুক্ত কফি গ্রহণ করতেন, তারা চিনি কমানোর পর তুলনামূলক দ্রুত পরিবর্তন টের পেতে পারেন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

স্ট্রোকের আগে শরীর যেসব সতর্ক সংকেত দেয় আপেলের বীজ খেলে কি সত্যিই বিষক্রিয়া হয়?

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এক মাসে কারও কারও কয়েক কেজি পর্যন্ত ওজন কমতে পারে। তবে এটি সরাসরি চিনি কমানোর কারণে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ক্যালোরি গ্রহণ কমে যাওয়ার ফল। অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে যে ওজন কমে, তার একটি বড় অংশ আসলে শরীরের অতিরিক্ত পানি কমে যাওয়ার কারণে হয়। চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কম খেলে শরীরের গ্লাইকোজেনের সঞ্চয় কমে, আর গ্লাইকোজেনের সঙ্গে পানি থাকে। ফলে শরীর হালকা লাগে এবং ওজনও দ্রুত কিছুটা কমে যায়।

চিনি বাদ দিলে প্রথম দিকে কী হয়?

চিনি হঠাৎ কমিয়ে দিলে অনেকেই প্রথম কয়েক দিন বা সপ্তাহে মিষ্টি খাবারের প্রবল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। চিকিৎসকদের মতে, চিনি মস্তিষ্কের ‘পুরস্কার কেন্দ্র’কে সক্রিয় করে, তাই এটি বন্ধ করলে সাময়িক অস্বস্তি হতে পারে। তবে কিছুদিন পর শরীর ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়-

ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায় খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ হ্রাস পায় খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা আসে শক্তি, মনোযোগ ও ঘুমে প্রভাব

অতিরিক্ত চিনি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়। এই ওঠানামার কারণে অনেক সময় ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং অবসাদ অনুভূত হয়।

Advertisement

চিনি কমালে অনেকেই জানান সারাদিন তুলনামূলক বেশি এনার্জি থাকে, মনোযোগ বাড়ে, খাবারের পর অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব কমে যায় ও ঘুমের মান কিছুটা উন্নত হয়। তবে এসব ইতিবাচক পরিবর্তন পেতে শুধু চিনি কমানোই যথেষ্ট নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোপুরি চিনি বাদ দেওয়া কি জরুরি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে খুব কঠোর ডায়েট মেনে চলা অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। তাই সম্পূর্ণ চিনি বন্ধ করার চেয়ে বরং নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশি কার্যকর। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী-

প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো প্রাকৃতিক উৎসের খাবার বেশি খাওয়া প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো পানীয়ের ক্ষেত্রে চিনিযুক্ত অপশন এড়ানো

এক মাস চিনি কমিয়ে বা বাদ দিয়ে চললে অনেকের শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এই পরিবর্তনের পরিমাণ ব্যক্তি ভেদে আলাদা হয়।

এক মাস চিনি কমালে কিছুটা ওজন কমা সম্ভব, তবে তা কোনো জাদুকরী ফল নয়। মূল বিষয় হলো সামগ্রিক ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা। চিনি কমানোর ফলে শুধু ওজন নয়, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, শক্তির স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতিও ঘটতে পারে। তাই দ্রুত ফলের আশা না করে বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার লক্ষ্যেই চিনি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

জেএস/