অর্থনীতি

বড় বাজেটে কৃষির হিস্যা ছোট

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু এতে অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কৃষির হিস্যা কমেছে।

Advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও কৃষি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মন্থরগতির মধ্যে এ বাজেটে কৃষিখাতগুলো প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ।

এ বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজমুল হুসাইন।

এবারের বাজেট কেমন হলো?

Advertisement

ড. জাহাঙ্গীর আলম: মোট কথায়, সার্বিক বাজেট যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় কৃষি বাজেট নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। কারণ সার্বিক বাজেটের আকার এবার বেড়েছে ১৯ শতাংশ, ঠিক কৃষি বাজেটটা ততটাই সংকুচিত হয়েছে।

আরও পড়ুন বাজেট ব্যবসাবান্ধব, সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর

এ বছর বাজেটে সার্বিক কৃষিখাতে পাঁচ মন্ত্রণালয় মিলে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এবার বেড়েছে ৫৫৩ কোটি টাকা। মানে প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

আর কী কী সমস্যা মনে হচ্ছে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এবারের কৃষি বাজেট হলো আমাদের মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা গত বছর ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কিন্তু এক যুগ আগে মোট বাজেটের ১০ শতাংশের ওপরে বরাদ্দ থাকতো কৃষিতে। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ বরাদ্দ ছিল।

Advertisement

এবার কৃষির ভর্তুকি নিয়ে কী বলবেন?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এবার কৃষিতে ১৭ হাজার ১ কোটি টাকা দিয়েছে। গত বছর এটা ছিল ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২৪০ কোটি টাকা কমে গেছে, মানে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এখন মোট বাজেটে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যেটা আগে ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। এটা কিন্তু ২০১১-১২ তে মোট ভর্তুকির ৬ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল।

আরও পড়ুন এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট

অর্থাৎ, এসব পরিসংখ্যান বলছে, বছরের পর বছর আমাদের বাজেটে কৃষিতে ভর্তুকি কমছে।

কৃষিতে প্রত্যাশিত বরাদ্দ-ভর্তুকি কেমন হওয়া উচিত ছিল?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: নিশ্চয় কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানোর দরকার ছিল। কারণ আন্তর্জাতিক যে অবস্থা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তাতে সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার যে শঙ্কা, তাতে ভর্তুকি ছাড়া চলা কঠিন।

তাহলে বাজেটে কি কৃষি অবমূল্যায়ন হলো?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: ঠিক, যখন কৃষির বাজেট বাড়ানো উচিত এবং ভর্তুকি বাড়ানো দরকার ছিল, তখন এটা সংকোচন হয়েছে। এটা অবমূল্যায়ন বলা যায়।

এতে কি সমস্যা দেখছেন?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এ অবস্থা উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করবে এবং গত চার বছর ধরে যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি চলছে ক্রমাগতভাবে সেটা চলতে থাকবে। আমাদের আমদানি যেটা গত দুই বছর ধরে নির্ভরতা বাড়ছে, বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে, সেটা থেকে বেরোনো যাবে না।

কোন ধরনের সমস্যায় পড়বেন কৃষক?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: দেখুন, যুদ্ধের পরে কিন্তু সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় পৌনে দুই গুণ বেড়ে গেছে। তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ। এসব খাতে ভর্তুকি না থাকলে দাম বাড়বে। তাতে কৃষকের খরচ বাড়বে। তখন ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকরা নিরুৎসাহিত হবে। উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি।

আরও পড়ুন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: অর্থ আসবে কোথা থেকে, খরচ হবে কোথায়?

এছাড়া দেশে মাত্রাতিরিক্ত খরা, বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগে আছে। সেগুলো মোকাবিলায় বরাদ্দ না থাকলে সে সমস্যা কৃষকের ওপরই পড়বে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে প্রায় ২ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি আগের বছরের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায়ও এটি একটি নিম্নগতি নির্দেশ করে। দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিখাতে নিয়োজিত থাকলেও তুলনামূলক কম বাজেট বরাদ্দের কারণে এ খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।

এনএইচ/এএসএ/এমএফএ