অর্থনীতি

বাজেটে বিনিয়োগ-বান্ধব করনীতি প্রতিফলিত হয়েছে, জোর দিতে হবে বাস্তবায়নে

প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটটি একটি উদ্ভাবনী ও ব্যবসা-বান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি কর হ্রাস, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি সেবার অটোমেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য এতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

Advertisement

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার পর সরকারি-বেসরকারি সংলাপ প্ল্যাটফর্ম বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এমন মন্তব্য করেছে।

বিল্ড বলছে, প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটটি বেশ সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী, যা প্রথাগত অর্থনৈতিক চিন্তাধারা থেকে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বাজেটটি ব্যবসা-বান্ধব, যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, কর কমানো এবং সরকারি সেবাসমূহের ব্যাপক অটোমেশনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা রয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই বাজেটে ইতিবাচক মানসিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। কর ছাড়ের পরিধি বাড়ানো এবং বিভিন্ন খাতে করের হার হ্রাসের মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিকে গতিশীল করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বিনিয়োগ-বান্ধব কর নীতিরই প্রতিফলন। সামগ্রিকভাবে, সরকারের এই উদারীকরণ এজেন্ডাকে আমরা স্বাগত জানাই।

Advertisement

বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ (যা ২০২৪–২৫ সালে ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ) এবং মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার (বর্তমান ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে) পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং।

৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকার মোট বাজেটে, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে, এই বাজেটের সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে। এর সময়োপযোগী ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। বাজেটটিতে অনেক ব্যবসা-বান্ধব বৈশিষ্ট্য থাকলেও, উচ্চ ঘাটতি বাজেট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বল অবস্থা, রাজস্ব সংগ্রহের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বিদ্যমান। এ আর্থিক ও ব্যাংকিং দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

বর্তমান অবস্থা বিবেচনায়, রাজস্ব সংগ্রহের ৬.৯৫ লক্ষ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। শুধু টিআইএন ধারীর সংখ্যা বাড়িয়ে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। উৎসে কর (টিডিএস) সংগ্রহে স্বচ্ছতা এবং অর্থ বিল ২০২৬–২৭-এ ঘোষিত রিফান্ড ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না হলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। এছাড়া, খুচরা পর্যায়ে ০.২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টি রিগ্রেসিভ, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বোঝা বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।

Advertisement

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে ১ দশমিক ৪৫ লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ গত বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। তবে এর মধ্যে পেনশন খাতের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ০.৩৯ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির ২৭ শতাংশ। পেনশনভোগীদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় রাখা কতটা যৌক্তিক, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ দশমিক ১৬ লাখ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে, যা প্রবৃদ্ধি-সহায়ক বিনিয়োগের ইঙ্গিত দেয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়গুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, অথচ বাজেটে তা উত্তরণে কোনো কার্যকর নির্দেশনা নেই।

বাজেট ঘাটতি ২ দশমিক ৪৩ লাখ কোটি টাকা (জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ)। এ ঘাটতি পূরণে সরকার ১ দশমিক ২৭ লাখ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১.১৬ লক্ষ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। উল্লেখযোগ্য যে, ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ দশমিক ১২ লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা কম। এটি ব্যাংক খাতের চাপ কমানোর ইঙ্গিত প্রদান করলেও, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকোচন অব্যাহত রাখতে পারে।

রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়লে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। ই-ফাইলিং, ভ্যাট অটোমেশন, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’-এর মতো উদ্যোগসমূহ এখনো প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে বৈদেশিক ঋণের অনিশ্চয়তা থাকায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এছাড়া, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। 

আইএইচও/এমকেআর