মোতাহার হোসেন
Advertisement
গত চার বছর ধরে পৃথিবী যেন একটানা সংঘাত, যুদ্ধ এবং অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা থেকে এশিয়া কোথাও না কোথাও যুদ্ধের আগুন জ্বলেছে। এমনো অনেক ঘটনা ঘটেছে, যখন রাতে যুদ্ধবিরতির খবরে মানুষ কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে গেছে, কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙার আগেই নতুন করে হামলা, পাল্টা হামলা কিংবা সংঘর্ষের সংবাদ শুনেছে। ফলে যুদ্ধ এখন আর দূরের কোনো ঘটনা নয়; এটি বিশ্ববাসীর দৈনন্দিন আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
এই দীর্ঘ অস্থিরতার সময়ে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই যুদ্ধের ছাপ পড়েছে। তবে মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্তও আসে, যখন বাস্তবতার কঠিন চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়। ফুটবল বিশ্বকাপ তেমনই একটি উপলক্ষ। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া এই মহাযজ্ঞ কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। যুদ্ধ, সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সবকিছুর মাঝেও ফুটবল যেন মানুষের জন্য এক অন্যরকম আনন্দের নাম।
এবারের বিশ্বকাপ আরও বিশেষ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। ইতিহাসে এই প্রথম ৪৮টি দেশ নিয়ে তিন দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ। ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০৪টি। আয়োজনে, অংশগ্রহণে এবং দর্শকসংখ্যায় এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।
Advertisement
মেক্সিকো সিটিতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে ফুটবলের এই বিশ্বযুদ্ধ। উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকো মুখোমুখি হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার। যেখানে ২-০ গোলে মেক্সিকো জিতে যায়। তার আগে ছিল জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে মেক্সিকো তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিশ্বের সামনে তুলে ধরে চমৎকারভাবে। তবে উৎসবের আবহের মধ্যেও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠন বিশ্বকাপ ঘিরে আন্দোলনে নেমেছে। তাদের দাবি, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে বড় আয়োজন করা যাবে না। ফলে মাঠের বাইরেও উত্তেজনা কম ছিল না।
বিশ্বকাপকে অনেকেই ক্রীড়া উৎসব বলেন। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি কেবল উৎসব নয়, এক ধরনের যুদ্ধ। অবশ্য এই যুদ্ধ গোলা-বারুদের নয়, দক্ষতা, কৌশল এবং মানসিক শক্তির। একটি ম্যাচ ঘিরে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ পর্যন্ত নিজেদের পছন্দের দল ও খেলোয়াড়কে নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে যুক্তি-পাল্টা যুক্তির লড়াই। ফুটবল তাই শুধু খেলা নয়, এটি আবেগ, পরিচয় এবং সংস্কৃতিরও অংশ।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষার কোনো বিভাজন থাকে না। ব্রাজিলের সমর্থক আফ্রিকায় বসে উল্লাস করেন, আর্জেন্টিনার জার্সি পরে এশিয়ার কোনো কিশোর আনন্দে নাচে, আবার ইউরোপের কোনো দর্শক আফ্রিকার দলের সাফল্যে হাততালি দেন। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতা ফুটবলের আছে, যা অন্য কোনো ক্রীড়া আয়োজনের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়।
যদিও তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে, তবুও এবারের বিশ্বকাপের কেন্দ্রবিন্দু মূলত যুক্তরাষ্ট্র। ১০৪ ম্যাচের মধ্যে ৭৮টিই অনুষ্ঠিত হবে দেশটিতে। ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে ১১টি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। ফাইনালসহ সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর অধিকাংশই সেখানে আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বকাপের আর্থিক লাভ, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং বৈশ্বিক প্রচারের বড় অংশও যুক্তরাষ্ট্রের ঝুলিতে যাবে।
Advertisement
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে কয়েকজন তারকা ফুটবলারের দিকে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে থাকবেন লিওনেল মেসি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হলেও তার ফুটবল মেধা, অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো বিশ্বসেরা পর্যায়ে। এটি হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ, তাই চতুর্থ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নামবেন তিনি।
পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্যও এই আসর হতে পারে শেষ সুযোগ। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য থাকলেও বিশ্বকাপ ট্রফি এখনো তার হাতে ওঠেনি। তাই এই শিরোপা জয়ই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করতে পারে।
ব্রাজিলের নেইমার দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। ইনজুরি এবং বিতর্ক তাকে বারবার থামিয়েছে। তবুও ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের অন্যতম ভরসা তিনি। অন্যদিকে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে এরই মধ্যেই নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার গতি, দক্ষতা এবং গোল করার ক্ষমতা যে কোনো দলের জন্য ভয়ংকর।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিশেষ নজর থাকবে নরওয়ের আর্লিং হালান্ড এবং স্পেনের তরুণ প্রতিভা লামিন ইয়ামালের দিকে। হালান্ড প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে কিশোর ইয়ামাল দেখাতে চান কেন তাকে ভবিষ্যৎ ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বিতর্কেরও জন্ম হয়েছে। অনেক সমর্থক টিকিট কিনেও ভিসা পাননি। কয়েকজন সাংবাদিক ও কর্মকর্তাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে জটিলতার মুখে পড়েছেন। এমনকি কিছু ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা বিশ্বকাপের আয়োজনকে প্রশ্নের মুখেও ফেলেছে।
ইতিহাসও মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ কেবল আনন্দের গল্প নয়। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা কিংবা কলম্বিয়ার আন্দ্রেস এসকোবারের মর্মান্তিক মৃত্যুর স্মৃতি এখনো ফুটবল ইতিহাসের বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে। তাই বিশ্বকাপ সবসময়ই আনন্দ, আবেগ, সাফল্য এবং ট্র্যাজেডির মিশ্র গল্প বহন করে।
তবুও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ মানুষের জন্য আশার প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত, বিভক্ত এবং অনিশ্চিত পৃথিবীতে এই আয়োজন মানুষকে একসঙ্গে হাসতে, কাঁদতে এবং স্বপ্ন দেখতে শেখায়। আগামী ১৯ জুলাই ফাইনালের মাধ্যমে যখন বিশ্বকাপের পর্দা নামবে, তখন হয়তো নতুন এক চ্যাম্পিয়নের জন্ম হবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রত্যাশা হলো ফুটবলের এই মহোৎসব শেষ হওয়ার পর পৃথিবী আরও শান্ত, আরও সুন্দর এবং আরও মানবিক হয়ে উঠুক।
লেখক: সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
কেএসকে