প্রবাস

সত্যিকার অর্থে শ্রেণিকক্ষের বাইরে জন্মায় জীবন্ত পাঠ

কিছুদিন আগে আমি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, দেশপ্রেম শুধু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

Advertisement

দেশপ্রেম প্রকাশ পায় মানুষের জন্য কাজ করার মধ্যে, সমাজের সমস্যার সমাধান খোঁজার মধ্যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার মধ্যেও। আর সেই যাত্রার শুরু হয় শিশুদের শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশে, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের নাগরিক দায়িত্ব, গণতন্ত্র, নেতৃত্ব এবং সমাজ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হয়।

আমি একবার ফ্রান্সের নিস শহরের সমুদ্র সৈকতে একটি দৃশ্য দেখেছিলাম, যা এখনো আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। সেখানে ছোট ছোট স্কুলের শিশুরা তাদের শিক্ষক শিক্ষিকাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে সমুদ্র সৈকত পরিষ্কার করছিল। বড়রা যেখানে সমুদ্রস্নানে এসে যেসব ময়লা ও আবর্জনা ফেলে যায়, সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শিশুরা সেগুলো সংগ্রহ করে পরিষ্কার করছিল।

Advertisement

যেন প্রজন্মের চোখের সামনেই দায়িত্ববোধের একটি জীবন্ত পাঠ চলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো আলাদা আয়োজন ছিল না, বরং তাদের শিক্ষারই অংশ।

আমাদের দেশেও যারা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছেন, তাদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, আমরা যেন শিশুদের শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবন ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিই।

১৯৮৫ সালে আমি সুইডেনে পড়তে আসি। সুইডেনের Linköping University সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যেই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সুইডিশ পার্লামেন্টে। এরপর সুযোগ হয়েছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, ঐতিহাসিক স্থান ও সামাজিক কাঠামোকে কাছ থেকে দেখার, জানার এবং বোঝার।

একই সময়ে সুইডিশ ভাষা শেখার পাশাপাশি আমি SAS, Scandinavian Area Studies কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার জীবনের এক নতুন শিক্ষা, বইয়ের বাইরের শিক্ষা, সমাজ, রাষ্ট্র, নেতৃত্ব এবং মানুষের সম্ভাবনাকে বোঝার শিক্ষা।

Advertisement

এরপর জীবনে অনেক কিছু ঘটেছে, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় আমি কখনও ভুলিনি।

বাংলাদেশ থেকে যখনই কেউ আমার কাছে বেড়াতে এসেছে, আমি চেষ্টা করেছি তাদের অন্তত দুটি জায়গা দেখাতে। একটি Stockholm City Hall, অন্যটি Swedish Parliament Building। শুধু বাইরে থেকে দেখানো নয়, সম্ভব হলে গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমে ভেতরে নিয়ে গিয়ে সবকিছু জানার সুযোগ করে দিয়েছি।

কারণ আমি বিশ্বাস করি, অনুপ্রেরণা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। একজন তরুণ যদি নিজের চোখে দেখে একটি রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, গণতন্ত্র কীভাবে কাজ করে, নেতৃত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে তার মনেও নতুন স্বপ্ন জন্ম নিতে পারে। সে ভাবতে পারে, একদিন আমিও পারবো।

স্বপ্ন সবসময় অসম্ভব নয়। আমাদেরই এলাকার একজন Muhammad Yunus নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। Stockholm City Hall এ নোবেল ভোজসভায় অংশ নিয়েছেন। আমি নিজে দেখেছি, যারা একসময় সুইডিশ সংসদ ভবন ঘুরে দেখেছিল, তাদের মধ্যেই কেউ কেউ পরে নিজ দেশে ফিরে সম্মানিত সংসদ সদস্য হয়েছে। এমন উদাহরণ প্রমাণ করে যে সুযোগ, অনুপ্রেরণা এবং সঠিক শিক্ষা মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে।

এই কারণেই হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি সাম্প্রতিক উদ্যোগ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

সম্প্রতি তিনি তার এলাকার ১৫৩ জন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে নিয়ে জাতীয় সংসদে গিয়েছেন। শুধু ভ্রমণের জন্য নয়, তাদের সরাসরি সংসদের অধিবেশন দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।

প্রথমে বিষয়টি সাধারণ একটি শিক্ষা সফর মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে এর ভেতরে অসাধারণ একটি শিক্ষাদর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তি কাজ করে।

সুযোগটি দেওয়া হয়েছে সেই শিক্ষার্থীদের, যারা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বৃত্তি অর্জন করেছে। ফলে যারা অংশ নিয়েছে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। আর যারা এবার সুযোগ পায়নি, তাদের মধ্যেও আগামীবার আরও ভালো করার আগ্রহ তৈরি হবে। ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরির জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার্থীদের সামনে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ কোনো বিশেষ পরিবার, গোষ্ঠী বা অভিজাত শ্রেণির সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। যোগ্যতা, অধ্যবসায় এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা অর্জন করতে পারলে যে কেউ একদিন সেখানে পৌঁছাতে পারে।

শিক্ষার্থীরা গ্যালারিতে বসে সংসদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছিল। তখন এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, “আজ তোমরা ওপরের সারিতে দর্শক হিসেবে বসেছ, কিন্তু আগামী দিনে তোমাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ নিচের সারিতে সংসদ সদস্য হিসেবে বসবে।”

একটি বাক্য কখনও কখনও একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

হয়তো সেদিন উপস্থিত অনেক শিক্ষার্থীর মনে নতুন একটি স্বপ্ন জন্ম নিয়েছে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার স্বপ্ন নয়, বরং সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার, মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন।

আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, একটি সংসদ ভবন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি গবেষণাগার কিংবা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ অনেক সময় মানুষের চিন্তার জগৎ পাল্টে দেয়। মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। অসম্ভবকে সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে শেখায়।

সত্যিকারের শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে হয় না। সত্যিকারের শিক্ষা তখনই হয়, যখন তরুণদের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তাদের বলা হয়, “তুমিও পারবে।”

কিছুদিন আগে হাসনাত আব্দুল্লাহর এলাকার একজন তরুণ আমাকে লিখেছিল, আমি কেন হাসনাত, পাটোয়ারী বা নাহিদদের প্রশংসা করি, কেন তাদের নিয়ে লিখি। আমি যতটুকু দেখেছি, এ পর্যন্ত তাদের কাজকর্মে মনে হয়েছে তারা সুশিক্ষার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিবেশে থেকেও যদি তারা তা করতে পারে, তাহলে অন্যরা কেন পারবে না? আমার কাছে হাসনাত আব্দুল্লাহর এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শুধু পাঠ্যবই দিয়ে নয়, স্বপ্ন দিয়ে। আর স্বপ্ন দেখানোর চেয়ে বড় শিক্ষা খুব কমই আছে।

আজ যারা গ্যালারিতে বসে সংসদ দেখেছে, আগামী দিনে হয়তো তাদের মধ্য থেকেই কেউ শিক্ষক হবে, কেউ বিজ্ঞানী হবে, কেউ উদ্যোক্তা হবে, কেউ সংসদ সদস্য হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা সবাই আজ একটি বার্তা পেয়েছে, যোগ্যতা ও পরিশ্রম থাকলে কোনো দরজাই চিরদিন বন্ধ থাকে না।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলাতে কখনও কখনও একটি শ্রেণিকক্ষ, একটি সংসদ ভবন এবং একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষের একটি বাক্যই যথেষ্ট।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম