জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহের সর্বস্তরের মানুষ।
Advertisement
ব্রহ্মপুত্র পাড়ের শিক্ষা ও কৃষিনির্ভর এ নগরীর ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ ক্রেতারা কর ছাড়ের সুবিধা ও বাণিজ্যিক লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমবে। তবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
নগরীর মেছুয়া বাজার ও গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় বাজার করতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড় বাজেটের ঘোষণার চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোই তাদের প্রত্যাশা।
Advertisement
নগরীর আকুয়া এলাকার সবজি বিক্রেতা আবুল কাশেম (৫০) বলেন, ‘বাজেটে অনেক বড় বড় ঘোষণা থাকে, কিন্তু আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা লাভবান হই কম। বাজারে পরিবহন খরচ, দোকান ভাড়া আর শ্রমিক খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়ে। সরকার যদি বাজার তদারকি বাড়ায়, তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষই উপকৃত হবে।’
কেওয়াটখালী এলাকার অটোরিকশাচালক মো. সোহেল মিয়া (৩৬) বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমাদের আয় কমে যায়। বাজেটে যদি পরিবহন খাতের খরচ কমানোর উদ্যোগ থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের উপকার হবে।’
মুক্তাগাছার কৃষক আব্দুস বাতেন (৫৫) বলেন, ‘কৃষির জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর কথা শুনেছি। আমরা চাই সার, বীজ আর সেচ খরচ কমুক। কৃষক ভালো থাকলে দেশের মানুষ কম দামে খাবার পাবে।’
ময়মনসিংহ শহরের কলেজশিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান রাব্বি (২২) বলেন, ‘প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের হতাশা কমবে না। বাজেটে যুবকদের জন্য আরও স্পষ্ট কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
Advertisement
মেছুয়া বাজারে মাছ কিনতে আসা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মো. নুরুল ইসলাম (৬৭) বলেন, ‘কর ছাড়ের সুবিধা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বাজারে যদি প্রতিদিন দাম বাড়তেই থাকে, তাহলে সেই সুবিধা খুব একটা কাজে আসে না। মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি চায় বাজারে স্বস্তি।’
নতুন বাজার এলাকার ফার্মেসি কর্মচারী রিপন চন্দ্র দাস (৩২) বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা শুনেছি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় অনেক কমে যাবে।’
ময়মনসিংহের ই-কমার্স ব্যবসায়ী এবিএম পিয়াস মৃধা বলেন, ‘লাইসেন্স পাঁচ বছরের জন্য নবায়নের সুযোগ দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। তবে ভ্যাট ও আগাম কর আদায়ের প্রক্রিয়া আরও সহজ না হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চাপের মুখে থাকবেন।’
মুক্তাগাছার নারী উদ্যোক্তা খাদিজা খাতুন বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর ছাড়ের প্রণোদনা নতুন নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করবে। তবে ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ না হলে এ উদ্যোগ এগোতে পারবে না।’
এবারের বাজেটে বার্ষিক করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা চাকরিজীবীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
নগরীর সেহড়া এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে। প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির ওপর কর রেয়াত অব্যাহত রাখাও ভালো সিদ্ধান্ত।’
আনন্দমোহন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মোমেন হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা করে এটি জনকল্যাণমুখী ও জনবান্ধব বাজেট বলেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। তবে পরিচালন ব্যয়ের কিছু ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার সুযোগ ছিল।’
হোসাইন সুলভ/এফএ/জেআইএম