নগরায়ণের গতিতে বদলে যাচ্ছে রাজশাহীর চিত্র। একের পর এক বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্মাণ অনিয়ম। অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং বিধিবহির্ভূত সম্প্রসারণ শহরজুড়ে সৃষ্টি করেছে উদ্বেগ। দৃশ্যমান উন্নয়নের আড়ালে জমে ওঠা এসব অনিয়ম শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়, বরং নগরবাসীর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Advertisement
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নগরীর ৭২১টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বড় ধরনের ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ড ঘটলে এসব অনিয়ম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে বর্তমানে তিন শতাধিক বহুতল ভবন রয়েছে। তবে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নির্মাণবিধি মেনে চলার প্রবণতা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
আরও পড়ুন শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভারআরডিএর নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৮ সালে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ছিল ৫৮টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৭২১-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রায় দুই দশকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ১২ গুণেরও বেশি বেড়েছে।
Advertisement
‘শুধু নোটিশ কিংবা মামলা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। আরডিএকে মাঠপর্যায়ে আরও কঠোর হতে হবে। নিয়মবহির্ভূত অংশ ভেঙে দিতে এবং নতুন করে অনিয়ম ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে’
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, দুর্বল তদারকি এবং নির্মাণবিধি বাস্তবায়নে শিথিলতার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় এমন অসংখ্য ভবন রয়েছে, যেগুলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। নগরীর উপশহর নিউমার্কেট মোড় এলাকায় মোহাম্মদ রানা নামে এক ব্যক্তি ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই একটি ৯ তলা ভবন নির্মাণ করেন। ভবনটির ফ্ল্যাট বিক্রিও সম্পন্ন হয়। পরে আরডিএ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ভবনটি কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। এ ঘটনায় ভবন মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে সাহেববাজার এলাকার এস এস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও। অনুমোদন ছাড়াই ১২ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করায় আইনি জটিলতায় পড়ে প্রায় ১০ বছর ধরে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
Advertisement
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বহুতল ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হচ্ছে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের মাধ্যমে। অনেক ভবন মালিক সাত তলার অনুমোদন নিয়ে পরে আট, ৯ কিংবা ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে নকশায় নির্ধারিত সেটব্যাক বা খালি জায়গাও রাখা হয়নি। আইন অনুযায়ী রাস্তা সম্প্রসারণ, আলো-বাতাস চলাচল এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখতে হয়। কিন্তু নগরীর অনেক এলাকায় দেখা গেছে, ভবনগুলো রাস্তার একেবারে গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি কিংবা উদ্ধারকারী দলের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীরনগরীর মাস্টারপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি ভবন অপর একটি ভবনের দিকে হেলে পড়েছে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে- এমন আশঙ্কায় দিন কাটছে আশপাশের বাসিন্দাদের।
‘নগরীতে যেভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে। অনেক ভবনের সামনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকারও জায়গা নেই। তখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ভাবতেই ভয় লাগে’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান হয়নি।
এদিকে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর রাজশাহীর বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, নগরীতে যেভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে। অনেক ভবনের সামনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকারও জায়গা নেই। তখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ভাবতেই ভয় লাগে।
সাহেববাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, বেশিরভাগ মানুষ ফ্ল্যাট বা দোকান কেনার সময় ভবনের অনুমোদন আছে কি না, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে কি না- সেসব যাচাই করেন না। পরে সমস্যা দেখা দিলে সবাই বিপদে পড়ে। কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর হওয়া দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহীর পরিকল্পিত নগরায়ণের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। নগরীর জনসংখ্যা ও আবাসন চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহুতল ভবনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে- এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই নির্মাণ যদি নিরাপত্তা ও আইনগত মানদণ্ড উপেক্ষা করে হয়, তাহলে উন্নয়নই একসময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
‘বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র এবং অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ভবন মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এসব নিয়ম মানছেন না। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তারা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন, যা আইনের পরিপন্থি’
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও অন্যান্য স্থাপনাসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক দিদারুল আলম বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র এবং অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ভবন মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এসব নিয়ম মানছেন না। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তারা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন, যা আইনের পরিপন্থি।
নগরবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, অতীতে আরডিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও বর্তমান কর্তৃপক্ষ এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে নকশা অনুমোদন করানোর সুযোগ নেই। অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ ও মামলা করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিয়মবহির্ভূত সব বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে।
আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে নকশা বহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২৬১ জন ভবন মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় কয়েকটি ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক জানান, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের অবৈধ বর্ধিত অংশ অপসারণ করা হয়েছে। তবে নগরীর বিস্তৃতি ও অনিয়মের পরিমাণ বিবেচনায় এ অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল ওয়াকিল বলেন, শুধু নোটিশ কিংবা মামলা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। আরডিএকে মাঠপর্যায়ে আরও কঠোর হতে হবে। নিয়মবহির্ভূত অংশ ভেঙে দিতে এবং নতুন করে অনিয়ম ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
এনএইচআর/জেআইএম