ফুটবল বিশ্বকাপের জ্বরে কাপছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশের শহর-গ্রামেও ছড়িয়েছে মেসি-নেইমার-রোনালদোর ফুটবল উন্মাদনা। প্রিয় দলের জার্সি-পতাকা শোভা পাচ্ছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ভবনের ছাদে। তবে ব্যতিক্রমী এক ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহে। অর্থাভাবে পলিথিন দিয়ে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়ে উড়িয়েছে আবির হোসেন (১১) নামের এক শিশু।আবির হোসেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামের আলিউল ইসলামের ছেলে। সে উজির আলী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনা শুরু হওয়ার পরে স্কুলছাত্র আবিরের প্রতিবেশী, বন্ধু ও সহপাঠীরা তাদের প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনে বাড়িতে টানায়। তবে আর্থিক সংগতি না থাকায় আবির পতাকা ও জার্সি কিনতে পারেনি। পরে সে বাড়ির পাশে পড়ে থাকা পলিথিন সুতা দিয়ে সেলাই করে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে নিজ হাতে পতাকা বানায়। পরে সেই পতাকা তার বাড়ির সামনে টানিয়ে রাখে শিশুটি।বিষয়টি স্থানীয় এক আর্জেন্টিনা সমর্থক দেখে ঝিনাইদহের আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানান। বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন, জিকু হাসান, শাহজাহান নবীন ও সামিউল হক সামিসহ ক্লাবের কয়েকজন সদস্য শিশু আবিরের বাড়িতে উপস্থিত হন।
Advertisement
এসময় আবিরের তৈরি পলিথিনের পতাকা নামিয়ে তাকে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের পক্ষ থেকে একটি আসল পতাকা, ফুটবল ও জার্সি উপহার দেওয়া হয়। এগুলো পেয়ে খুশিতে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি। শিশু আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম শহরের একটি গ্রিল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। অভাব-অনটনের মাঝে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। তাই ছেলের আবদার মেটাতে পারেননি তিনি।আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে আমার ছেলে একটি জার্সি আর পতাকার জন্য বায়না করে। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ। সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাই, পতাকা ও জার্সি কেনা পক্ষে সম্ভব হয়নি।’তিনি বলেন, ‘শহরের কয়েকজন ভাই এসে আমার ছেলেকে আর্জেন্টিনার জার্সি, ফুটবল ও পতাকা দিয়ে গেছে। এতে আমার ছেলেটা খুব খুশি। সারারাত জার্সি পরে, ফুটবল বিছানায় নিয়ে ঘুমিয়েছে। আমার ছেলের খুশিতে আমার পরিবারের সবাই খুশি। যারা আমার সন্তানের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, তাদের জন্য অনেক দোয়া করি।’স্থানীয় খালিদ হাসান জীবন বলেন, ‘আবির একটি পতাকা কিনতে না পেরে নিজেই পলিথিন দিয়ে পতাকা বানিয়েছে। এ কথা শুনে খুব খারাপ লাগে। তখন বিষয়টি আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের সদস্যদের জানাই। পরদিন বিকেলে তারা আবিরের বাড়িতে এসে উপহারগুলো পৌঁছে দেন।’
নতুন জার্সি ও পতাকা পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিশু আবির হোসেন বলে, ‘আমি মেসির ভক্ত। মেসির খেলা আমার খুব ভালো লাগে। মেসির খেলা দেখেই আমি আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। আব্বুকে বলেছিলাম, মেসির ১০ নম্বর জার্সি কিনে দিতে। আর একটা আর্জেন্টিনার পতাকা কিনে দিতে। কিন্তু টাকা নেই বলে আব্বু কিনে দিতে পারেনি। তাই, বাড়ির পাশে ময়লার ভাগাড়ে পড়ে থাকা পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়ে উঠানে উড়িয়ে দেই।’
আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন জিকু হাসান বলেন, ‘শিশুটির ফুটবলের প্রতি যে আবেগ, তা আমাদের অবাক করেছে। খবরটি পাওয়া মাত্রই আমরা আমাদের সাধ্যমতো আবিরের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছি।’সামিউল হক সামি বলেন, ‘আমরা আবিরকে নিয়ে গর্ব করি। মোবাইলফোন ও ডিজিটাল গেমসের আগ্রাসনের এই কঠিন সময়ে আবিরের মতো শিশুরাই সুন্দর আগামীর দৃষ্টান্ত।’ক্লাবের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছোট্ট শিশুটির ভালোবাসা ও আবেগ আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সেই ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতেই আমরা ওর জন্য সামান্য কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম। ওর হাসিমুখ দেখে আমরাও আমাদের আবেগ ধরে রাখতে পারিনি।’এম শাহাজান/এসআর/এএসএম
Advertisement