স্বাস্থ্য

মাত্র ২৯% জনবলে চলছে স্বাস্থ্য খাত, সরকারি হিসাবেই শূন্যপদ ৭২ হাজার

এক ঐতিহাসিক জনমিতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের ইতিহাসে এখন নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫ থেকে ৬৪ বছর) সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যাকে অর্থনীতি ও জনসংখ্যা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‌‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। এই বিরল সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বহুগুণ শক্তিশালী করার প্রধান শর্তই হলো একটি সুস্থ, দক্ষ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলা। কিন্তু দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের যে বাস্তব চিত্র, তা এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।  

Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে দেশের স্বাস্থ্য জনবলের এক ভয়াবহ ও হতাশাজনক চিত্র। ‘পটেনশিয়ালস অব হেলথ ওয়ার্কফোর্স ফর হারনেসিং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ইন বাংলাদেশ: অপরচিউনিটিজ, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, ভৌগোলিক বৈষম্য, নীতিনির্ধারণী শূন্যতা এবং সরকারি পদের বিশাল শূন্যতার কারণে দেশ প্রতি বছর প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কর্মঘণ্টার চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।  

বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে বহুদূরে বাংলাদেশ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বৈশ্বিক সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে অন্তত ৪৪ দশমিক ৫ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ) থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ১২ দশমিক ৭৮ জন— যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের মাত্র ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের স্বাস্থ্য খাতে এখনো ৭১ শতাংশ দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।  

আরও পড়ুন সিদ্ধান্তে স্থবিরতায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাত?

কেবল মোট সংখ্যার ঘাটতিই নয়, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতটি হলো চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ অনুপাতের চরম ব্যবধান। ডব্লিউএইচও’র আন্তর্জাতিক আদর্শ অনুপাত অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স এবং ৫ জন মিডওয়াইফ (১: ৩: ৫) থাকা আবশ্যক। অথচ মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ১: ০.৭৪: ০.০৭৫। চিকিৎসকের চেয়ে নার্স ও ধাত্রীদের এই চরম স্বল্পতার কারণে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকদের এমন অনেক প্রশাসনিক ও সহায়ক কাজ করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক নিয়মে নার্সদের করার কথা।  

Advertisement

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্ট বা মিডওয়াইফ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দীর্ঘদিন নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল, বর্তমানে সংখ্যাটি কিছুটা বাড়লেও নার্সদের একটি বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে আসছে, যাদের মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাছাড়া ডিপ্লোমাধারীদের তুলনায় বিএসসি নার্সের সংখ্যা ও তাদের সরকারি নিয়োগ— দুই-ই কম।

দেশে মিডওয়াইফারি সেবা মাত্র শুরু হয়েছে। অথচ মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে হলে চিকিৎসকদের তুলনায় মিডওয়াইফদের সংখ্যা অন্তত পাঁচগুণ বেশি হওয়া উচিত। মিডওয়াইফরা শুধু বড় হাসপাতালেই নন, সরাসরি মাঠপর্যায়ে বা কমিউনিটিতে গিয়ে কাজ করবেন এবং গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে নিরাপদ প্রসব করাতে উদ্বুদ্ধ করবেন।— আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন

তিনি বলেন, দেশে মিডওয়াইফারি সেবা মাত্র শুরু হয়েছে। অথচ মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে হলে চিকিৎসকদের তুলনায় মিডওয়াইফদের সংখ্যা অন্তত পাঁচগুণ বেশি হওয়া উচিত। মিডওয়াইফরা শুধু বড় হাসপাতালেই নন, সরাসরি মাঠপর্যায়ে বা কমিউনিটিতে গিয়ে কাজ করবেন এবং গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে নিরাপদ প্রসব করাতে উদ্বুদ্ধ করবেন। মিডওয়াইফদের এই সেবা নিশ্চিত করা না গেলে কোনোভাবেই মাতৃমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন কিডনি ডায়ালাইসিসে কমবে চিকিৎসা ব্যয় ও সংক্রমণের ঝুঁকি স্বাস্থ্য খাতে শূন্যপদের পাহাড়

একদিকে হাসপাতালগুলোতে সেবার জন্য হাহাকার, অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্য প্রশাসনে জমে উঠেছে শূন্যপদের বিশাল পাহাড়। ২০২৬ সালের সর্বশেষ সরকারি হিসাব ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অধিদপ্তরে মোট অনুমোদিত পদের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশই বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য! এরমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪৮ হাজার ৫২টি পদ শূন্য (যার মধ্যে চিকিৎসকদের পদই খালি ২২.৫%)। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১৬ হাজার ৯২১টি পদ শূন্য (যার ফলে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত)। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ৫ হাজার ৩৩৩টি পদ শূন্য। মোট শূন্যপদ ৭১ হাজার ৭৬৫টি। এই বিশাল শূন্যপদ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতির প্রমাণ দেয়।

Advertisement

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অধিদপ্তরে শূন্যপদের তালিকা 

খাতা-কলমে উদ্বৃত্ত, বাস্তবে তরুণ চিকিৎসকদের চরম বেকারত্ব

দেশব্যাপী এক হাজার ৭৫৬ জন স্বাস্থ্য পেশাজীবীর ওপর জরিপ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগ। ওই জরিপে সরকারের দাবির সঙ্গে বাস্তব চিত্রের এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী দেশে যেখানে ৮৮ হাজার ১০৬ জন চিকিৎসক প্রয়োজন, সেখানে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার ৮১৫ জন। অর্থাৎ, খাতা-কলমে দেশের প্রয়োজনের চেয়ে অন্তত ৪৮ হাজার চিকিৎসক উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত রয়েছেন! কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। নিবন্ধিত চিকিৎসকদের মধ্যে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত আছেন খুবই অল্প সংখ্যক। প্রতি এক হাজার জনগণের বিপরীতে সরকারি চিকিৎসক আছেন মাত্র শূন্য দশমিক ১৮ জন। বাকি বিশাল সংখ্যক চিকিৎসক বেসরকারি খাতে অত্যন্ত কম বেতনে এবং প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করছেন। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই জানিয়েছেন— স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পরও তাদের অন্তত ১২ মাস বা তারও বেশি সময় সম্পূর্ণ বেকার বসে থাকতে হয়েছে।  

আরও পড়ুন পাথরঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স / ৩ লাখ মানুষের সেবায় চিকিৎসক মাত্র দুজন!

এর মূল কারণ, প্রতি বছর যেখানে ২৩ থেকে ২৫ হাজার নতুন চিকিৎসক বের হচ্ছেন, সেখানে ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী ৫ বছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মাত্র ১১ হাজার ২৮০ জন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দিতে পেরেছে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ও তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

বেসরকারি খাতের আধিপত্য ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন 

দেশের চিকিৎসা ও নার্সিং শিক্ষার সিংহভাগই এখন বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে দেশের ১১৬টি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৭টিই বেসরকারি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চিকিৎসকদের ৬০ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং নার্সদের ৮১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে বের হচ্ছেন।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উন্নয়ন বাজেটের গড়ে মাত্র ৭৬ শতাংশ ব্যবহার করতে পারে; বাকি টাকা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফেরত যায়। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে— মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ এখনো তাদের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই নিজের পকেট থেকে মেটাতে বাধ্য হচ্ছে, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

বেসরকারি খাতের এই বিশাল অংশীদারত্ব চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের সংখ্যা বাড়ালেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বহু বেসরকারি মেডিকেল ও নার্সিং ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং দক্ষ শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি যা জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।  

আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত নয় দেশের স্বাস্থ্য খাত 

দেশের অভ্যন্তরে ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তার কারণে ৬০ থেকে ৬৯ শতাংশ স্বাস্থ্য স্নাতক বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ জনবল পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একবারেই দূরদর্শী নয়। জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল কৌশল ২০২৪- এ স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।

আরও পড়ুন বিশ্ব চিকিৎসক দিবস / ভরসার নাম চিকিৎসক, চ্যালেঞ্জেরও শেষ নেই

যুক্তরাজ্যের পিএলএবি/ইউকেএমএলএ, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএমএলই বা মধ্যপ্রাচ্যের প্রোমেট্রিক পরীক্ষার জন্য সরকারি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বা ফরেন হায়ার এডুকেশন ডেস্ক নেই। ফলে ভাষা ও আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষায় আমাদের পেশাজীবীদের অংশগ্রহণের হার হতাশাজনক। ভাষা ও আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষায় চিকিৎসক মাত্র দেড় শতাংশ, নার্স ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ অংশ নেন। 

ভাষা দক্ষতা ও লাইসেন্সিং পরীক্ষায় বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণের চিত্র 

সরকারের বাজেট বাড়লেও চিকিৎসা ব্যয়ের বেশিরভাগ বহন করতে হয় রোগীকে

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বিগত বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এই বাজেট দিয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু মূল দুশ্চিন্তা হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের অক্ষমতা। তথ্য বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার উন্নয়ন বাজেটের গড়ে মাত্র ৭৬ শতাংশ ব্যবহার করতে পারে; বাকি টাকা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফেরত যায়। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে— মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ এখনো তাদের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই নিজের পকেট থেকে মেটাতে বাধ্য হচ্ছে, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে অসংক্রামক রোগ যেমন— ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও কিডনি সমস্যার প্রকোপ অনেক বেড়েছে, যেগুলোর জন্য রোগীকে নিয়মিত ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল থেকে এসব ওষুধ বা টেস্টের সুবিধা সব সময় না পাওয়ায় ব্যয়ের পুরো বোঝাটা জনগণের ওপরেই পড়ে। বিশেষ করে কোনো পরিবারের কারও হঠাৎ ক্যানসার, কিডনি প্রতিস্থাপন বা লিভারের মতো বড় অসংক্রামক রোগ দেখা দিলে সেই বিশাল ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়।  

আরও পড়ুন প্রতিবেদন / ঋণ করে চিকিৎসা নেন দেশের ২৬ শতাংশ মানুষ

তিনি বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবার সুযোগ সব অঞ্চলে সমান নয়। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীকে বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়, কিংবা অনেকে দেশের বাইরে যান। এই যাতায়াত ও চিকিৎসার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ না থাকায় মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়। ফলশ্রুতিতে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় এবং দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে।  

এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বলেন, সরকার যদি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রিভেন্টিভ (প্রতিরোধমূলক) ও প্রমোটিভ কেয়ার জোরদার করে, তবে শুরুতেই রোগ ধরা পড়বে এবং ব্যয়ের বোঝা কমবে। এছাড়া অসংক্রামক রোগের ওষুধ বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে দেওয়া এবং সরকারি হাসপাতালের অকেজো ডায়াগনস্টিক ইক্যুইপমেন্টগুলো সচল করা দরকার। সরকারের একা সক্ষমতা না থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে ভালো প্রাইভেট সেক্টরকে যুক্ত করে এই সেবা দেওয়া যেতে পারে। এতে জনগণের ওপর ব্যয়ের চাপ অনেকটাই কমে আসবে।  

দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বাস্তবতার চিত্র 

টেকসই উত্তরণের নীতিনির্ধারণী পথনকশা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা এবং বর্তমান সংকটের আলোকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলো-

১. সরকারি প্রায় ৭২ হাজার শূন্যপদ দ্রুত পূরণের জন্য বিশেষ দ্রুত নিয়োগ বোর্ড বা স্বতন্ত্র হেলথ ক্যাডার সার্ভিস গঠন করতে হবে।

২. বিএমডিসি এবং বিএনএমসির মাধ্যমে মানহীন বেসরকারি মেডিকেল ও নার্সিং কলেজের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা।

আরও পড়ুন অটোমেশন হচ্ছে স্বাস্থ্যখাত, আসছে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন

৩. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় ‘ফরেন হাইয়ার এডুকেশন/ এমপ্লয়মেন্ট ডেস্ক’ স্থাপন করা, যা আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষার তথ্য ও সনদ সমমান নির্ধারণে চিকিৎসকদের সহায়তা করবে।

৪. গ্রামীণ ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের ধরে রাখতে কেবল বাধ্যবাধকতা নয়; বরং উন্নত আবাসন, নিরাপত্তা এবং বিশেষ গ্রামীণ ভাতার ব্যবস্থা করা।

৫. ম্যাটস ও প্যারামেডিকস থেকে উত্তীর্ণদের সরাসরি ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিসট্যান্ট বা কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট পদে নিয়োগ দিয়ে মাঠপর্যায়ের মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা।

৬. জনগণের পকেটের ব্যয় কমাতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় বার্ষিক ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকার চিকিৎসাসুবিধাসহ জাতীয় ই-হেলথ কার্ড চালু করা।  

জনমিতিক লভ্যাংশের এই সুবর্ণ সময় বাংলাদেশ আর মাত্র এক বা দুই দশক পাবে। এই সময়ের মধ্যে যদি স্বাস্থ্য জনবলের এই কাঠামোগত সংকট ও বৈষম্য দূর করা না যায়, তবে একটি অসুস্থ ও পুষ্টিহীন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নিয়ে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।  

দেশে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে চিকিৎসকের সংখ্যা কম নয়। মূল সমস্যা হলো তাদের বণ্টন বা ডিস্ট্রিবিউশনে। দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও মোট চিকিৎসকের ৮০ শতাংশ থাকেন শহরে। এছাড়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ সরকারি সিস্টেমের বাইরে বেসরকারি খাতে কাজ করছেন।— স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হক জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে যা চিকিৎসক আছেন তা পর্যাপ্ত, সরকারি শূন্যপদ পূরণ করলেই হয়। তবে নার্স ও মিডওয়াইফ যা আছে, তার দ্বিগুণ অর্থাৎ লক্ষাধিক প্রয়োজন। সরকারের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন পদোন্নতিবঞ্চিত ২৫০০ / ঈদ আসে-যায়, শেষ হয় না চিকিৎসকদের অপেক্ষা

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, দেশে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে চিকিৎসকের সংখ্যা কম নয়। মূল সমস্যা হলো তাদের বণ্টন বা ডিস্ট্রিবিউশনে। দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও মোট চিকিৎসকের ৮০ শতাংশ থাকেন শহরে। এছাড়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ সরকারি সিস্টেমের বাইরে বেসরকারি খাতে কাজ করছেন।

স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য জনবলের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে নার্স আর মিডওয়াইফ সংখ্যা বাড়ানো উচিত। অথচ এটি নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। একইভাবে ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হলেও তাদের এখনো সেভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে এই উপেক্ষিত জনবলগুলোকে ফোকাস করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার।

এসইউজে/কেএসআর