প্রবাস

শিক্ষার জটিলতা ও সহজ সত্য

আমাদের জন্মলগ্নে কোনো পাঠ্যবই ছিল না। জন্মের পর আমরা আলো, বাতাস, অন্ধকার, অনুভূতি, স্মৃতি ও চিন্তার জগতকে ধীরে ধীরে চিনতে, অনুভব করতে এবং বুঝতে শিখেছি।

Advertisement

মায়ের মুখ চিনতে শিখেছি, ক্ষুধা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অর্থ বুঝতে শিখেছি। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো আমরা পেয়েছি সহজ ও স্বাভাবিকভাবে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা যখন স্বাভাবিকভাবে শেখার ক্ষমতা নিয়েই জন্মাই, তখন শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা এত জটিল করে তুললাম কেন?

এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমি কাজ করছি। বিষয়টি গভীরভাবে বোঝা দরকার, দরকার হলে বিশ্লেষণ করে তারপরই চূড়ান্ত করা উচিত, যেন শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব উন্নয়ন সম্ভব হয়। নইলে বিশ্ব যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলতে থাকবে। ধনসম্পদ কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে, আর বাকিরা বঞ্চনার মধ্যে থাকবে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

Advertisement

মানুষের জীবন কিন্তু এত জটিল নয়। স্রষ্টা সবকিছু কত সহজভাবে সৃষ্টি করেছেন। আমরা না চাইতেই আলো, বাতাস, পানিসহ অনেক কিছু পেয়ে যাই। কিন্তু সামান্য কিছু খাবার জোগাড় করতে গিয়ে আমরা জটিলতার ভেতরে পড়ে যাই। প্রশ্ন এখানেই।

আমরা কি সত্যিই এতটা জটিলভাবে বাঁচার জন্য তৈরি হয়েছি, নাকি আমাদের শেখানো হয়েছে জটিল করে ভাবতে?

শিক্ষার বাস্তব চিত্র

BCS ভাইভায় একটি সহজ প্রশ্ন করা হয়েছিল,

Advertisement

হিসাব কী?

কিন্তু দেখা গেলো, অনেকেই সঠিকভাবে উত্তর দিতে পারেনি। কারণ বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে সহজ ধারণাটিও জটিল কাঠামোর ভেতরে ঢুকে গেছে।

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হিসাববিজ্ঞান শেখানো হয় এভাবে

১. হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাহিসাববিজ্ঞান কী, হিসাবের উদ্দেশ্য, ডেবিট ও ক্রেডিট, ডাবল এন্ট্রি সিস্টেম

২. মৌলিক নীতি ও ধারণাBusiness entity concept, Going concern, Matching concept, Accrual concept

৩. জার্নাল ও লেজারজার্নাল এন্ট্রি, লেজার পোস্টিং, ক্যাশ বুক

৪. ট্রায়াল ব্যালান্সপ্রস্তুতি ও ভুল শনাক্তকরণ

৫. আর্থিক বিবরণীলাভ লোকসান হিসাব, ব্যালান্স শিট

৬. সমন্বয়বকেয়া আয়, বকেয়া ব্যয়, প্রিপেইড খরচ, অবচয়

এভাবে ধাপে ধাপে বিষয়টি বিস্তৃত করা হয়, যা অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর কাছে জটিল মনে হয়।

সহজ প্রশ্ন, সহজ উত্তর

কিন্তু বাস্তবে ‌‘হিসাব’ কি এত জটিল?

আমি যদি সহজভাবে বলি, তাহলে—

হিসাব মানে হলোটাকা পয়সা বা কোনো জিনিস কত আছে, কত খরচ হলো, আর কত বাকি আছে তা গুনে এবং লিখে রাখা।

উদাহরণ হিসেবেতোমার কাছে ১০০ টাকা ছিল, ৩০ টাকা খরচ করলেবাকি থাকে ৭০ টাকা। এটাই হিসাব।

মূল কথা

আমাদের সমস্যা জ্ঞানের অভাব নয়, বরং অনেক সময় জ্ঞানকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে উপস্থাপন করা।

স্রষ্টার সৃষ্টি যেমন সহজ এবং সুন্দর, তেমনি জীবন ও জ্ঞানের মূল সত্যও সহজ হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা সেই সহজতাকে হারিয়ে ফেলি জটিল ব্যাখ্যার ভেতরে।

প্রশ্ন তাই থেকেই যায়আমরা কি সত্যিই জটিলতার জন্য তৈরি, নাকি আমরা সহজ সত্যকে জটিল করে ফেলেছি?

লেখাপড়াকে যদি জটিল না করে সহজ উপায়ে জানা ও শেখার একটি পদ্ধতি তৈরি করা যেত, তাহলে শিক্ষা শুধু বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং হয়ে উঠত জীবনের অংশ। পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে মানসিক শান্তি বাড়ত, আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠত, আর জন্ম নিত আরও বেশি সৃজনশীল ও সত্যিকারের সুশিক্ষিত মানুষ।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই সেই সহজ শিক্ষাব্যবস্থা চাই?

কারণ সহজ শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো করা নয়, বরং চিন্তায় স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তে সততা এবং জীবনে ন্যায়বোধ। আর তখনই প্রশ্ন উঠে যায়, ক্ষমতা, দুর্নীতি, বৈষম্য—এসব টিকে থাকবে কীভাবে?

হয়তো সেই কারণেই জটিলতার দেয়াল তৈরি করা হয়েছে, যাতে বোঝার ভেতরেই মানুষ আটকে থাকে। যাতে প্রশ্ন কম হয়, আর মেনে নেওয়ার অভ্যাস বেশি হয়।

যদি মানুষ সত্যিই সহজভাবে ভাবতে শেখে, তবে সমাজে অনেক কিছু বদলে যেতে বাধ্য। দুর্নীতি হয়তো কমে যাবে, মানুষ আরও মানবিক হয়ে উঠবে, দারিদ্র্যের ব্যবধান কমে আসবে, ধনী ও গরিবের দূরত্বও হয়তো আর আগের মতো থাকবে না।

তখন প্রশ্নটা আর শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার থাকবে না, প্রশ্নটা হয়ে যাবে পুরো ব্যবস্থার।

‘চালাও সে পথে যে পথে তোমার প্রিয়জন গেছে চলি’—এই কথাটি যেন এক অনিশ্চিত আহ্বান। কিন্তু সেই প্রিয়জন কারা? তারা কীভাবে, কার নির্দেশনায়, আর কখন এই পথ বেছে নিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়, উত্তরগুলো সবসময় স্পষ্ট হয় না। তবুও মানুষ জানতে চায়, কারণ জানার ভেতরেই তো সত্যের খোঁজ লুকিয়ে থাকে।

এই ভাবনাগুলোর ভেতর দিয়েই মানুষ শুধু শিক্ষা নয়, জীবনের অর্থ, দিকনির্দেশনা এবং সত্যের সন্ধান করতে শেখে। আর সেই সন্ধানই তাকে নিয়ে যায় আরও গভীর একটি প্রশ্নের দিকে, যেখানে বিশ্বাস, পথ এবং প্রেরণার ধারণা একসাথে মিলিত হয়।

‘প্রিয়জন’ বলতে এখানে কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বোঝানো হয় না। এটি অনেক গভীর একটি ধারণা। প্রিয়জন হতে পারে সেইসব মানুষ, যারা সত্য, ন্যায়, জ্ঞান এবং মানবতার পথে আগে হেঁটেছেন। যারা জীবনকে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও অর্থবহ করে তুলেছেন। তারা আমাদের আগে এই পৃথিবীতে থেকেছেন, পথ দেখিয়েছেন, আর তাদের চিন্তা, শিক্ষা এবং আদর্শ এখনো আমাদের ভেতরে বেঁচে আছে।

কিন্তু তাদের সাথে যোগাযোগ কি সত্যিই সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শারীরিকভাবে নয়, বরং আত্মিকভাবে খুঁজতে হয়। তাদের সাথে যোগাযোগ মানে তাদের চিন্তা বোঝা, তাদের দেখানো পথকে উপলব্ধি করা, এবং সেই নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে নিজের জীবনে ধারণ করা। মানুষ যখন সত্যকে খোঁজে, তখন সে একভাবে তাদের সাথেই যুক্ত হয়, যারা সেই সত্যের পথ আগে দেখিয়েছিল।

এই প্রেক্ষিতে কুরআনের সুরা আল ফাতিহা একটি গভীর দিকনির্দেশনা দেয়, যা খুব সহজভাবে বোঝা যায়।

‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন’

অর্থাৎ, আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই।

এই বাক্যটি মানুষকে শেখায়, সত্যের সামনে বিনয়ী হতে, অহংকার থেকে দূরে থাকতে এবং সাহায্য ও দিকনির্দেশনার জন্য একমাত্র স্রষ্টার দিকে ফিরে যেতে।

এর পরেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনা

‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম’

অর্থাৎ, আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করো।

এখানেই আসে সেই ‘প্রিয়জনদের’ ধারণা। কুরআনের ভাষায় সেই পথ হলো তাদের পথ, যাদের ওপর অনুগ্রহ করা হয়েছে। যারা সত্য, ন্যায় এবং মানবতার পথে চলেছে।

এই দোয়া আসলে কোনো অতীতকে ডাকার বিষয় নয়, বরং একটি চলমান অনুরোধ—যেন মানুষ সঠিক পথ খুঁজে পায়, ভুল ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পায়, এবং সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মানুষ যে পথে হাঁটে, সেই পথই নির্ধারণ করে সে কেমন মানুষ হবে, আর সেই পথের সত্য খুঁজে পাওয়াই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম