মতামত

চিকিৎসা কূটনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সমীকরণ

রাজশাহীর পুঠিয়ার আখতারি বানু ২০১৭ সাল থেকে তামিল নাড়ুর ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। চারটি অপারেশন হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ফলো-আপের তারিখ ছিল। ভিসা পাননি বলে তাঁর পক্ষে আর ভারত যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

Advertisement

অস্ত্রোপচারের জায়গায় সংক্রমণ নিয়ে রাজশাহীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে গেলেন। তবুও কাজ হলো না। আখতারি বানু একা নন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুধু ঢাকা অফিসেই ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির ভিসা আবেদন নাকচ হয়ে যায়। যাঁদের অনেকেই ছিলেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগী। তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে ভারতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন শুরু হয়, তার সরাসরি ধাক্কা লেগেছিল চিকিৎসাসেবায়। যার রেশ এখনো কাটেনি। ভারত মেডিক্যাল ভিসা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। কিন্তু সংখ্যা এত কমিয়ে দেয় যে বন্ধ বললেও ভুল হয় না। ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ হাজার বাংলাদেশি ভারতে চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল ভিসা পেতেন। ২০২৫ সালের শুরুতে সেই সংখ্যা নেমে আসে দিনে ৫০০-এর নিচে।

শুধু একদম জরুরি কেস বা বিশেষ সুপারিশে ভিসা মিলেছে। ক্যানসার রোগী কেমোথেরাপির পর ফলো-আপে যেতে পারছেন না। হায়দ্রাবাদের এআইজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জেসমিনের ফলো-আপ চার মাসেরও বেশি সময় আটকে ছিল শুধু ভিসার জন্য। এভাবে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর খবরও শোনা গেছে।

Advertisement

প্রতি বছর সাড়ে চার লাখ থেকে আট লাখ বাংলাদেশি বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার খরচ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, বাংলাদেশিরা প্রতি বছর বিদেশে চিকিৎসার পেছনে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেন। বাংলাদেশের একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের চেয়েও বেশি পরিমাণ টাকা বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করেন। আর এর অর্ধেকেরও বেশি যেত ভারতে। কারণ পথ সহজ ছিল, খরচ কম ছিল, ভাষার ঝামেলা ছিল না। কলকাতা বা চেন্নাইয়ে বাংলায় কথা বলা যেত। বর্তমানে সেই দরজা প্রায় বন্ধ। আর তা হয়েছে ভারত সরকারের একক সিদ্ধান্তে।

তাহলে রোগীরা এখন কোথায় যাচ্ছেন? যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। কেউ তুরস্কে যাচ্ছেন, যেখানে চিকিৎসার খরচ ভারতের কাছাকাছি। কেউ পাকিস্তানেও যাচ্ছেন, যে দেশটি আগে মেডিক্যাল ট্যুরিজমের মানচিত্রেই ছিল না। আইভিএফ আর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য ইরানও নতুন গন্তব্য হিসেবে উঠে আসছে। মানুষ ভারতে যেতে না পেরে নিজেদের মতো করে বিকল্প খুঁজে নিচ্ছে।

অবশ্য প্রতিবেশী ভারতের তৈরি এই শূন্যতায় যে দেশটি সবচেয়ে বেশি তৎপর হয়েছে, তার নাম চীন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বেইজিং সফরে গিয়ে কুনমিংয়ের হাসপাতালগুলো বাংলাদেশি রোগীদের জন্য খুলে দিতে অনুরোধ করেন। তাতে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয় চীন। এরপর একই বছরের মার্চে প্রথম দল চিকিৎসার জন্য চীন যায়। ১৪ জন রোগী, সঙ্গে চিকিৎসক, ট্যুর অপারেটর ও সাংবাদিক। সেই শুরু। যা এখন একটি জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

ভারতের দরজা বন্ধ হওয়ায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কিন্তু বাংলাদেশকে নিজের দিকে তাকানোর সুযোগও দিয়েছে। কুনমিং বা অন্য কোনো শহর স্বল্পমেয়াদে একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। জটিল চিকিৎসার জন্য বিদেশ একটি গন্তব্য—সেটাও সত্য। তবু স্বাস্থ্যখাতের চলমান সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে নিজের দেশেই। কথা হলো, বাংলাদেশ কি চীন থেকে শিখতে প্রস্তুত? দেশটি কি নিজের নাগরিকদের চিকিৎসা নিজ দেশেই নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের জন্য নতুন আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে?

Advertisement

অবশ্য বাস্তবতাও আছে। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং ঢাকা থেকে মাত্র দুই ঘণ্টা ২০ মিনিটের পথ। ভারতের চেন্নাই যেতে লাগে দুই ঘণ্টা ৫০ মিনিট। অর্থাৎ কুনমিং আসলে চেন্নাইয়ের চেয়েও কাছে। এখানে চারটি হাসপাতাল বাংলাদেশিদের জন্য নির্ধারিত। ইউনান প্রদেশের প্রথম গণ হাসপাতাল, কুনমিং মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতাল, চীনা বিজ্ঞান একাডেমির ফুওয়াই ইউনান হাসপাতাল এবং ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিন (টিসিএম) হাসপাতাল। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৬০০-এর বেশি বাংলাদেশি সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ২০২৫ সালেই সে সংখ্যা চার-পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন।

চীনের চিকিৎসার মান ও পরিবেশ নিয়ে প্রথম দলের অভিজ্ঞতা ভালো। ফুওয়াই হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট লু জিয়াং জানান, কুনমিংয়ের চিকিৎসার মান থাইল্যান্ডের সমান, কিন্তু খরচ থাইল্যান্ডের মাত্র এক-চতুর্থাংশ। মালয়েশিয়ার চেয়েও চীনে কম খরচে চিকিৎসা করানো যায়। দিল্লির বড় হাসপাতালের তুলনায় খরচ মাত্র ১০ শতাংশ বেশি। আর হাসপাতালের আমন্ত্রণপত্র থাকলে ভিসা মিলছে এক কার্যদিবসের মধ্যে। ফলে সামর্থ্যবান মানুষের নতুন ঠিকানা এখন চীন।

তবে এখনো কিছু বাধা রয়ে গেছে। যেমন, ঢাকা থেকে কুনমিংয়ে এখনো দিনে মাত্র একটি সরাসরি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। টিকিটের দাম অনেক বেশি। যে পরিবার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় কলকাতা যেত, তাদের পক্ষে কুনমিং এখনো নাগালের বাইরে। ভাষার সমস্যা প্রকট। দোভাষীর জন্য প্রথমে ৫০০ ইউয়ান, বর্তমানে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ ইউয়ান গুনতে হয়। চেন্নাইয়ের মতো বাংলাদেশি খাবার এখনো সহজলভ্য হয়নি। চীন সরকার এসব সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলার অপেক্ষা রাখে না।

কুনমিংয়ে বাংলাদেশিদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া চারটি হাসপাতালের একটি হলো টিসিএম বা ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিন হাসপাতাল। এই হাসপাতালে চলমান চিকিৎসা শুধু একটি ভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি নয়, হাজার বছরের চীনা সংস্কৃতিরও অংশ। আকুপাংচার, ভেষজ চিকিৎসা, কিউই গং—এই চর্চাগুলো চীনের দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। ২০১০ সালে ইউনেস্কো আকুপাংচারকে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কুনমিং মডেলের মাধ্যমে চীন তার চিকিৎসা-সংস্কৃতিকেও বিশ্বের সামনে নতুন করে তুলে ধরছে। এ যেন চীনা সংস্কৃতির এক নতুন সংযোজন।

চীন শুধু কুনমিংয়েই থামছে না। বাংলাদেশে এক হাজার শয্যার তিনটি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এগুলো চালু হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় সত্যিকার পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের অংশীদারত্ব আরও পোক্ত হবে, যা একসময় অনেকটাই ভারতকেন্দ্রিক ছিল।

এভাবেই চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে মেডিক্যাল ট্যুরিজম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিচ্ছে। আমার মনে হয়, যথাযথ উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সমর, ব্যবসা ও শিক্ষার পর স্বাস্থ্য খাত চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে আরেকটি বৃহৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত হবে। এটি আসলে পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

জুলাই বিপ্লব, পরবর্তী চিকিৎসা সংকট এবং চীনের এই তৎপরতাকে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হিসেবে নিতে পারি। সেটি হলো, শূন্যস্থান কেউ না কেউ কোনো না কোনোভাবে পূরণ করে ফেলে। এখানে ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা আছে। বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিবেশী। সেই প্রতিবেশী দেশে সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ভারতের যে প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ, তা ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। আবারও ঘুরেফিরে সেই একই প্রশ্ন আসে—ভারত আসলে কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে, নাকি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে?

এমন সংকটে চীনের এই সহযোগিতা চিকিৎসা কূটনীতির এক সফল উদাহরণও বটে। দ্রুত ভিসা, নির্দিষ্ট হাসপাতাল, সরকারি প্রতিনিধিদলের সফর, রাষ্ট্রদূতের সরাসরি সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে চীন সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একসময়কার কল্পনাকেও বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এর ফলে একদিকে অন্যান্য খাতের মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ভারতনির্ভরতা কমেছে, অন্যদিকে চীনের প্রভাব বেড়েছে। বাংলাদেশে সফলতার পর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও চীন তার চিকিৎসা কূটনীতি বিস্তৃত করবে বলেই মনে হয়।

তবে একটি বড় প্রশ্নও থেকে যায়। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। সে দেশ থেকে শুধু চিকিৎসা বাবদ প্রতিবছর পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই টাকার একটি অংশও যদি দেশের হাসপাতালগুলোর উন্নয়নে খরচ করা যেত, আখতারি বানুকে আরেকটি দেশের ভিসার জন্য হন্যে হয়ে ছুটতে হতো না। হয়তো নিজ দেশেই তিনি চিকিৎসা নিতে পারতেন।

ভারতের দরজা বন্ধ হওয়ায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কিন্তু বাংলাদেশকে নিজের দিকে তাকানোর সুযোগও দিয়েছে। কুনমিং বা অন্য কোনো শহর স্বল্পমেয়াদে একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। জটিল চিকিৎসার জন্য বিদেশ একটি গন্তব্য—সেটাও সত্য। তবু স্বাস্থ্যখাতের চলমান সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে নিজের দেশেই। কথা হলো, বাংলাদেশ কি চীন থেকে শিখতে প্রস্তুত? দেশটি কি নিজের নাগরিকদের চিকিৎসা নিজ দেশেই নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের জন্য নতুন আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে?

লেখক : শিক্ষক ও কথাশিল্পী।

এইচআর/জেআইএম