ধর্ম

মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের ইতিহাস

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু ভুখণ্ড বিজয় কেবল একটি ভূখণ্ডের বিজয়ের ঘটনা হয়ে থাকেনি; বরং একটি নতুন চিন্তা, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন সভ্যতার সূচনার ইতিহাস হয়ে উঠেছে। স্পেনে মুসলমানদের আগমন তেমনই একটি ঘটনা। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে সংঘটিত এই অভিযান শুধু একটি সামরিক বিজয় ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। এই বিজয়ের ফলেই ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে জন্ম নেয় সেই ঐতিহাসিক আন্দালুস, যা পরবর্তী প্রায় আটশ বছর জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, স্থাপত্য ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বকে আলোকিত করেছিল।

Advertisement

ভৌগোলিকভাবে স্পেনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত আইবেরীয় উপদ্বীপের একদিকে আটলান্টিক মহাসাগর, অন্যদিকে ভূমধ্যসাগর এবং মাঝখানে জিব্রাল্টার প্রণালী। এই অবস্থান স্পেনকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সেতুবন্ধনে পরিণত করেছিল। মুসলমানদের হাতে বিজিত হওয়ার পর এই অঞ্চলই পরিচিত হয় ‘আন্দালুস’ নামে। পরবর্তীকালে এই নাম কেবল একটি ভূখণ্ডের পরিচয় বহন করেনি; এটি হয়ে উঠেছিল এক উন্নত সভ্যতার প্রতীক।

ইসলামের প্রথম যুগে মুসলিম রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ ছিল মূলত ন্যায়, নিরাপত্তা ও মানবমুক্তির আদর্শকে সামনে রেখে। মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদার সময় ইসলামি রাষ্ট্র দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। উমাইয়া খলীফা আল-ওয়ালিদের শাসনামলে সেই সম্প্রসারণ এক নতুন গতি লাভ করে। তার সময়েই মুসলিম সাম্রাজ্য পূর্বে আমু দরিয়া থেকে পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ইতিহাসে এই অসাধারণ বিস্তারের পেছনে যাদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, কুতাইবা বিন মুসলিম, মুহাম্মদ বিন কাসিম, মূসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন যিয়াদ বিশেষভাবে স্মরণীয়।

উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মূসা বিন নুসাইরের দৃষ্টি পড়ে ইউরোপের প্রবেশদ্বার স্পেনের দিকে। সে সময় স্পেনে ভিসিগথদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজা রডারিকের অত্যাচার, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দেশটিকে দুর্বল করে তুলেছিল। সাধারণ জনগণ; বিশেষত ইহুদি সম্প্রদায় ও অনেক স্থানীয় অধিবাসী শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নে অতিষ্ঠ ছিল। ফলে মুসলমানদের আগমনকে অনেকেই মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছিলেন।

Advertisement

আরও পড়ুন মরক্কো যেভাবে এসেছিল ইসলামের ছায়াতলে

স্পেন অভিযানের আগে মুসলিম নেতৃত্ব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। প্রথমে তারীফ ইবনে মালিকের নেতৃত্বে একটি ছোট অনুসন্ধানী দল পাঠানো হয়। তাদের সফল প্রত্যাবর্তন অভিযানের পথকে সুগম করে দেয়। এরপর খলীফা আল-ওয়ালিদের অনুমতিক্রমে ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে প্রায় সাত হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে ইউরোপে প্রবেশ করে। তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যই ছিলেন বার্বার মুসলিম। সংখ্যায় ছোট হলেও তাদের হৃদয় ছিল ইমানের শক্তিতে পরিপূর্ণ।

তারেক বিন যিয়াদের বাহিনী স্পেনে পৌঁছার পর স্থানীয় অনেক মানুষ তার বাহিনীতে যোগ দেয় এবং তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা প্রায় ১২,০০০-এ পৌঁছায়। বারো হাজার সৈন্যের এই বাহিনীর সঙ্গে ভিসিগথদের বাহিনীর এক যুদ্ধ সংঘটিত হয় গোয়াদালেতে নদীর তীরে। একদিকে প্রায় এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল ভিসিগথ বাহিনী, অন্যদিকে মাত্র বারো হাজারের মতো মুসলিম সৈন্য। কিন্তু মুসলমানদের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও আদর্শ বেশি শক্তিশালী ছিল। কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রডারিকের বাহিনী সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয় এবং রাজা রডারিকও নিহত হন। এই বিজয়ের মধ্য দিয়েই ইউরোপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।

যুদ্ধজয়ের পর মুসলমানরা প্রতিশোধপরায়ণ বিজেতার মতো আচরণ করেননি। বরং তারা বিজিত জনগণের জান-মাল, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করেন। এই ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থাই অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে। টলেডো, কর্ডোভা, গ্রানাডা, সেভিল, মার্সিয়া—একটির পর একটি শহর মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। বহু স্থানে স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুসলিম বাহিনীকে স্বাগত জানায়।

তারিক বিন যিয়াদের বিজয়ের খবর পেয়ে মূসা বিন নুসাইর নিজেও ৭১২ খ্রিস্টাব্দে প্রায় আঠারো হাজার সৈন্য নিয়ে স্পেনে প্রবেশ করেন। তিনি দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ নগরী জয় করেন। পরে টলেডোতে তার সঙ্গে তারিকের সাক্ষাৎ হয়। যদিও প্রথমদিকে তাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝির কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, শেষ পর্যন্ত তারা ঐক্যবদ্ধভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের সম্মিলিত নেতৃত্বে অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় সমগ্র স্পেন মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে।

Advertisement

স্পেন বিজয়ের ফলে ইউরোপে ইসলামি সভ্যতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হয়। কর্ডোভা হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে গড়ে ওঠে বিশাল গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। মুসলিম শাসকরা কৃষি, সেচব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্য, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে অবদান রাখেন, তা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আন্দালুস ছিল বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সহাবস্থানেরও এক অনন্য উদাহরণ। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা বিভিন্ন সময় আন্দালুসে একই সমাজে বসবাস করেছে, জ্ঞানচর্চা করেছে এবং সংস্কৃতির বিকাশে অংশগ্রহণ করেছে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও বিদ্যাচর্চার যে পরিবেশ সেখানে গড়ে উঠেছিল, তা মধ্যযুগের ইউরোপে বিরল ছিল। ফলে আন্দালুস হয়ে ওঠে জ্ঞান ও সভ্যতার এমন এক বাতিঘর, যার আলো বহু শতাব্দী ধরে সমগ্র ইউরোপকে প্রভাবিত করেছে।

আরও পড়ুন আল কারাওইন লাইব্রেরি, মুসলিম বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থাগার

তবে ইতিহাসের প্রতিটি উত্থানের সঙ্গে যেমন পতনের গল্পও জড়িয়ে থাকে, আন্দালুসও তার ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ প্রায় আটশ বছরের গৌরবোজ্জ্বল শাসনের পর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং বহিরাগত আক্রমণের ফলে মুসলিম শক্তি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অবশেষে ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু শাসনের অবসান হলেও আন্দালুসের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার উত্তরাধিকার কখনো বিলীন হয়নি।

আজও কর্ডোভার মসজিদ, আলহামরা প্রাসাদ, সেভিলের স্থাপত্য কিংবা জিব্রাল্টারের পাহাড় ইতিহাসের সেই গৌরবময় দিনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ওএফএফ