ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই কী হাতে নেন? অনেকের উত্তর হবে-মোবাইল ফোন। তারপর শুরু হয় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা ইউটিউবে একের পর এক স্ক্রল। কখন যে কয়েক মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা হয়ে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। যোগাযোগ, বিনোদন, কাজ, ব্যবসা-জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব স্পষ্ট।
Advertisement
কিন্তু এই নির্ভরতার মাঝেই একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আমরা কি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছি, নাকি অ্যালগরিদম, নোটিফিকেশন আর অন্তহীন স্ক্রলের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়াই আমাদের সময়, মনোযোগ ও অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করছে? বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া ডে উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক, আমাদের ডিজিটাল জীবনের এই বদলে যাওয়া বাস্তবতাকে।
২০১০ সালে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ম্যাশএবল এই দিবসের সূচনা করে। উদ্দেশ্য ছিল, মানুষের জীবন, যোগাযোগ, ব্যবসা ও সমাজে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু ১৬ বছর পর এসে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে-সোশ্যাল মিডিয়া কি শুধু আমাদের কাছে এনেছে, নাকি অদৃশ্যভাবে কিছু দূরেও সরিয়ে দিয়েছে?
আরও পড়ুন জাতীয় ক্যামেরা দিবস / ছবির ফ্রেমে বন্দি স্মৃতি আর সময়ের গল্প আমাদের দিনের শুরু এখন স্ক্রিনেঅনেকের দিন শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে নয়, বরং মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে। ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, টিকটক কিংবা ইউটিউব স্ক্রল করা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একসময় সকালের চায়ের সঙ্গে থাকত পত্রিকা। এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে নিউজফিড। এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি আমাদের জীবনধারারও পরিবর্তন।
Advertisement
জন্মদিনের শুভেচ্ছা থেকে শুরু করে বিয়ের নিমন্ত্রণ, চাকরির খবর, সন্তানের জন্ম কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত-সবকিছুই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেওয়া হয়। পরিবারের দূরের সদস্য, বিদেশে থাকা বন্ধু কিংবা বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীর সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি হয়েছে এই মাধ্যমের কল্যাণে। অনেক সম্পর্কের শুরু হয়েছে ইনবক্সে, আবার অনেক সম্পর্কের সমাপ্তিও ঘটেছে একটি ‘সিন’ কিংবা ‘আনফলো’ এর মাধ্যমে।
আরও পড়ুন আন্তর্জাতিক কাদা দিবস / মাটির গন্ধে ফিরে আসুক হারানো শৈশব ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চএকসময় নিজের কাজ দেখানোর জন্য প্রয়োজন ছিল টেলিভিশন, সংবাদপত্র কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠান। এখন একটি ভালো ভিডিও, সুন্দর ছবি কিংবা ব্যতিক্রমী লেখাই একজন মানুষকে রাতারাতি পরিচিত করে তুলতে পারে।
শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, শিল্পী, আলোকচিত্রী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-সবার জন্যই সোশ্যাল মিডিয়া এখন একটি শক্তিশালী পরিচয় নির্মাণের মাধ্যম। অনেক ছোট ব্যবসা শুধুমাত্র ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে শুরু হয়ে আজ সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তথ্যের সবচেয়ে দ্রুত উৎসভূমিকম্প, বন্যা, নির্বাচন, খেলাধুলা কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো ঘটনা অনেক সময় সংবাদমাধ্যমের আগেই খবর পৌঁছে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। যদিও এই গতির সঙ্গে এসেছে একটি বড় সমস্যা-ভুয়া তথ্য। একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে তথ্য যাচাই করার অভ্যাস এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
Advertisement
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা সাধারণত মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোই দেখি। কেউ ঘুরতে গেছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে, কেউ পদোন্নতি পেয়েছে, কেউ বিলাসী জীবনযাপন করছে। এসব দেখে অনেকেই নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের সাজানো জীবনের তুলনা করতে শুরু করেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অভ্যাস আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে, তৈরি করতে পারে অযথা হতাশা এবং উদ্বেগ।
‘লাইক’ কি সত্যিই সুখের মাপকাঠি?একটি ছবি পোস্ট করার পর বারবার নোটিফিকেশন দেখা, কতজন লাইক দিল, কে মন্তব্য করল-এসব আচরণ এখন খুবই সাধারণ।ধীরে ধীরে অনেকেই নিজের মূল্যায়ন করতে শুরু করেন অনলাইন প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাস্তব জীবনের ভালোবাসা, সম্মান কিংবা সাফল্যের কোনো মাপকাঠি কখনোই লাইক বা শেয়ারের সংখ্যা হতে পারে না।
ডিজিটাল ডিটক্সের প্রয়োজন কেন?সবসময় অনলাইনে থাকা মানেই সবসময় সংযুক্ত থাকা নয়। বরং কখনো কখনো কিছু সময়ের জন্য ফোন দূরে রেখে পরিবারের সঙ্গে গল্প করা, বই পড়া, হাঁটতে বের হওয়া কিংবা নিজের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকলে মনোযোগ বাড়ে, ঘুমের মান উন্নত হয় এবং মানসিক চাপ কমে।
আরও পড়ুন আন্তর্জাতিক আতঙ্ক দিবস / ভয় নয়, আতঙ্কই নষ্ট করছে মানসিক শান্তি শিশু-কিশোরদের জন্য বাড়তি সতর্কতা বয়স উপযোগী প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা। অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা। বাস্তব জীবনের খেলাধুলা ও সামাজিক যোগাযোগে উৎসাহ দেওয়া। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কিছু স্মার্ট অভ্যাস তথ্য শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই করুন। ব্যক্তিগত তথ্য অযথা প্রকাশ করবেন না। নেতিবাচক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার আগে ভাবুন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক কনটেন্ট অনুসরণ করুন। পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়কে স্ক্রিনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। আরও পড়ুন কাঁদলে কি সত্যিই মন হালকা হয়?সোশ্যাল মিডিয়া নিজে ভালো বা খারাপ নয়। এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম-যার ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর প্রভাব। এটি যেমন পৃথিবীকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, তেমনি কখনো কখনো আমাদের নিজের কাছের মানুষদের থেকেই দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তাই প্রযুক্তিকে জীবনের নিয়ন্ত্রক নয়, বরং সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ।
জেএস/