আন্তর্জাতিক

প্রতিদিনই চীনের কাছে জমি হারাচ্ছি: আদিবাসীদের অভিযোগে টনক নড়লো ভারতের

অরুণাচল (Arunachal) প্রদেশের তাকসিং (Taksing) সীমান্ত এলাকায় চীনের কাছে প্রায় প্রতিদিনই জমি হারাচ্ছে ভারত- একটি আদিবাসী সংগঠনের এমন অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে ভারত। বিষয়টি কানে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সংসদীয় ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, দেরিতে শুরু করলেও সীমান্তে এখন দ্রুত রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তুলছে ভারত।

Advertisement

অরুণাচল পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ কিরেন রিজিজু দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, অরুণাচলের তাকসিং এলাকায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোনো সড়কই ছিল না।

তাকসিংয়ের নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি -এর পক্ষ থেকে চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেরিতে হলেও আমরা এখন সীমান্ত এলাকায় রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করছি। আমরা এখন সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিচ্ছি।

শুক্রবার (২৬ জুন) আপার সুবানসিরি জেলার ডেপুটি কমিশনারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি কেরু চাদের দাবি করেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে তাকসিং সার্কেলের সীমান্ত এলাকায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে। তাদের উদ্দেশ্য যতটা সম্ভব ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করা।

Advertisement

চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২০ সালের আগে যেসব এলাকা স্থানীয়দের ছিল, সেগুলো এখন চীনা সেনাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গত পাঁচ বছরে সেখানে সামরিক শিবির স্থাপন ও ‘সুসংযুক্ত’ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

চিঠিতে যেসব এলাকার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো আসাফিলা (Asaphila) অঞ্চলের সারি-ওভিং তীর্থস্থান, পানিয়ার (চুজার্তা এলাকা), মারপান (মারনাফে), পোত্রাং লেক ও টিন্ডিংতাং। এসব এলাকা তাকসিং সদর দপ্তরের খুব কাছেই অবস্থিত বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে ভারতীয় সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চীনা পিএলএর সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ ও নতুন সামরিক শিবির স্থাপনের যে খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা ভুল ও ভিত্তিহীন।

অবশ্য, এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ২০০৮ সালে সংসদে দেওয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জবাবে বলা হয়েছিল, পূর্বাঞ্চলে ভারত-চীন আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিয়ে চীন বিরোধিতা করে এবং অরুণাচল প্রদেশের প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর দাবি জানায়।

Advertisement

এদিকে, নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক তাচে চাদের বলেন, চীনা সেনাদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয়রা আর তাদের গবাদিপশু নিয়ে চারণভূমিতে যেতে পারছেন না।

তিনি দ্য হিন্দুকে জানান, সংগঠনের পাঠানো চিঠির বিষয়ে এখনো প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তাচে চাদের বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের জমিতে এখন আর যেতে পারি না। চীনারা দ্রুতগতিতে রাস্তা নির্মাণ করছে ও তাদের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়াচ্ছে।

২৬ জুনের চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, চীনা সরকার সীমান্ত এলাকায় ভারতের নতুন নতুন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করছে। চিঠিতে বলা হয়, চীন বিভিন্ন স্থানে রাস্তা, সেতু ও সামরিক শিবির নির্মাণ করেছে। কয়েক বছর আগেও যেসব এলাকা স্থানীয়দের শিকার, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ও গবাদিপশু চরানোর জায়গা ছিল, এখন সেগুলো চীনা পিএলএর নিয়ন্ত্রণে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আবেদন জানাচ্ছি, যাতে চীনা পিএলএর এই তৎপরতা বন্ধ করা যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা বহু বছর ধরে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তাদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। তাকসিং এলাকায় চীনা পিএলএর কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও গতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে আমাদের জমি হারাচ্ছি।

অন্য এক সরকারি সূত্র জানায়, আসাফিলা বহু বছর ধরেই একটি বিরোধপূর্ণ এলাকা। তবে সেখানে চীন কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেনি।

সূত্রটি আরও জানায়, চীন সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি) মোতায়েন রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত দীর্ঘপাল্লার টহলও পরিচালনা করা হয়।

ভারত ও চীনের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ হয়ে বিস্তৃত।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-চীন সীমান্ত এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত হয়নি। লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, সীমান্ত অঞ্চলগুলো দুর্গম পার্বত্য ভূখণ্ড ও কম জনবসতিপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন পিছিয়ে ছিল।

সূত্র: দ্য হিন্দু

এসএএইচ