খেলাধুলা

যে সব কারণে এবারের বিশ্বকাপেও ব্যর্থ হলো জার্মানি

জার্মানি ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের যাত্রা শুরু করেছিলো স্বপ্নের মতো। কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়ে। তবে তাদের বিদায়টা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম নয় কোনো অংশে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি মঙ্গলবার লাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে শেষ ৩২-এর লড়াই থেকে। কিন্তু কোন ভুলগুলো জার্মানির বিদায়ের পেছনে মুখ্য ছিলো?

Advertisement

২৬ সদস্যের দল ঘোষণার পর সেই দল নিয়েই ভক্তদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। কয়েকজন ফর্মে থাকা খেলোয়াড়ের পরিবর্তে কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যান দলে ডাকেন এমন কিছু খেলোয়াড়কে যারা জাতীয় দল বা ক্লাব কোথাও আক্ষরিক অর্থে খুব একটা ছন্দে ছিলেন না।

শুরুতেই প্রীতি ম্যাচগুলোর পাশাপাশি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচগুলোতে জার্মানির গোলবার সামলানোর দায়িত্বে থাকা অলিভার বাউম্যানকে হুট করে বিশ্বকাপে এসে বেঞ্চে বসিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো ভক্তদের মধ্যে। কোচ এই অবস্থানে অবসর ভেঙে ফেরত আনেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ারকে, যিনি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা পার করে এসেছেন আরও আগেই। আবার কোচের চেয়ে বয়সে চার বছর বড় ন্যুয়ার।

বিশ্বকাপের মঞ্চে ২০১৪ সালের পর থেকে ন্যুয়ারের পারফরম্যান্স যথেষ্ট হতাশাজনক। কারণ ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকে জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো ক্লিনশিটই রাখতে পারেননি তিনি। সেই ধারাবাহিকতা ন্যুয়ার ধরে রেখেছেন চলতি বিশ্বকাপেও। এমনকি ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুর ম্যাচে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কুরাসাওয়ের কাছেও একটি গোল হজম করেন তিনি।

Advertisement

তবে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে টাইব্রেকারে ভালো দুটি শট সেভ করেন তিনি; কিন্তু শেষে জার্মান ডিফেন্ডার জোনাথন তাহের পেনাল্টি মিসে জার্মানির বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয় এখানেই।

মাঝমাঠ থেকে জশুয়া কিমিখকে রাইটব্যাকে নামিয়ে আনা এবং দলে কোনো ব্যাকআপ রাইটব্যাক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া নিয়মিত অফ ফর্মে থাকা লিওন গোরেৎস্কা এবং প্যাস্কেল গ্রস যেখানে ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন সেখানে তাদের থেকে বেশি ভালো ফর্মে থাকা টম বিশফ এবং অ্যান্টন স্ট্যাচ বাদ পড়েন।

মাঝমাঠে ফেলিক্স ন্মেচা আর আলেক্সান্ডার পাভলোভিচের জুটিটা একেবারেই নতুন। বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতার অভাবে শেষ দুই ম্যাচে তাদের দুজনকেই প্রতিপক্ষের কাছে নাস্তানাবুদ হতে দেখা গেছে।

এছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলয়াড়ের ইনজুরিও জার্মানিকে ভুগিয়েছে ভালোভাবেই। সার্জ জিনাব্রি এবং বিশ্বকাপের আগমুহুর্তে লেনার্ট কার্লের ইনজুরিতে দলের রাইট উইং পজিশনে একটা শূন্যতা তৈরি হয়। কার্লের ইনজুরিটা হয় বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে। কিন্তু তার বদলি হিসেবে দলে কোনো উইঙ্গার না ডেকে কোচ ডাকেন আসান ওয়েদ্রাউগোকে, যিনি একজন মিডফিল্ডার।

Advertisement

এর বাইরে আক্রমণভাগে কেভিন শাডে, সাইল এল মালা, করিম আদেয়েমির মতো খেলোয়াড়দেরকে মূল দলেই রাখেননি কোচ নাগেলসম্যান।

লেনার্ট কার্লের ইনজুরির ফলে মূল একাদশে নিয়মিত জায়গা পান লেরয় সানে; কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে নিয়মিতভাবে বাজে খেললেও তাকে একাদশ থেকে সরাননি জেদি কোচ। ইকুয়েডরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ হারের ম্যাচে একটি গোল ছাড়া বাস্তবিক অর্থে এই বিশ্বকাপের কোনো অর্জনই নেই সানের। এমনকি স্কোয়াডে রাখলেও জ্যামি লেওয়েলিংকে পুরো টুর্নামেন্টে বসিয়ে রেখেছেন বেঞ্চেই। সানে নিয়মিত বাজে খেলার পরেও স্কোয়াড রোটেশনের দিকে যাননি নাগেলসম্যান।

দেনিজ উনদাভ জাতীয় দলের জার্সিতে সবসময় ভালো করেও জায়গা পেয়েছেন বেঞ্চে। যদিও গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে বেঞ্চ থেকে এসে ভালো করার কারণে শেষ ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি; কিন্তু শেষ ম্যাচে খুব একটা ভালো করতে পারেননি তিনিও।

২০১৪ বিশ্বকাপের পর মিরোস্লাভ ক্লোসা বিদায় নেন; কিন্তু ক্লোসার বিদায়ের পর তার মতো গোলের জন্য ক্ষুধার্ত কোনো স্ট্রাইকার জার্মানি বেরই করতে পারেনি। কাই হাভারর্টজ মোটামুটি ভালো করলেও তিনি মূলত একজন ফলস নাইন। ফিনিশার হিসেবে খেলার মতো একজন স্ট্রাইকার এখনও জার্মানিতে নেই, যে ক্লোসার রেখে যাওয়া জায়গাটা পূরণ করতে পারে।

ডিফেন্সে নিকো স্লটারবেকের ইনজুরি জার্মানিকে শেষ ম্যাচে ভুগিয়েছে। জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্ৎজ, জশুয়া কিমিখরা ভালো করলেও পুরো একটা দল হিসেবে জার্মানি ব্যর্থ হয়েছে।

এই বিশ্বকাপে কিছু লজ্জাজনক রেকর্ডও করেছে তারা। বিশ্বকাপে টানা ১০ ম্যাচে ক্লিনশিট রাখতে না পারা এর মধ্যে অন্যতম। তাছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেকারে হারের রেকর্ড জার্মানির ছিলো না। সেটাও তারা ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে ভেঙেছে।

শুধু তাই নয় বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল দেওয়ার রেকর্ডে কিছুদিন আগে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে প্রথম অবস্থানে গেলেও আবার সেখান থেকে পিছিয়ে পড়েছে তারা। অন্যদিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল খাওয়ার রেকর্ডটি এখনও অক্ষুণ্ন রেখেছে ডাই ম্যানশাফটরা।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হবার পর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘বড় দল হিসেবে যে মান ধরে রাখার কথা, জার্মানি সেটি দেখাতে পারেনি।’

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর কোচ নাগেলসম্যানের পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও জার্মান ফুটবল ফেডারেশন এবিষয়ে কিছুই বলেনি। অন্যদিকে নাগেলসম্যান জানিয়েছেন, তিনি জার্মানিকে আবারও আগের রূপে ফেরাতে দলটি নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক।

তিনি জানান, জার্মান ফুটবল ফেডারেশন (ডিএফবি) চাইলে তিনি দায়িত্ব চালিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং দলকে আবারও শীর্ষ পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার লড়াই চালিয়ে যাবেন। পরপর তিনটি বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্স করা জার্মানি পরের বিশ্বকাপে কোনো চমক দেখাতে পারে কিনা এখন তা দেখতে জার্মান ভক্তদের অপেক্ষা করতে হবে আরও ৪টি বছর।

আরএএইচইউএল/আইএইচএস/