আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানে আফগানিস্তানের ড্রোন হামলা, কী করবে ইসলামবাদ?

সীমান্ত পার হয়ে আসা আফগানিস্তানের চারটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান। বুধবার (১ জুলাই) দেশটির বেলুচিস্তানে এই ঘটনা ঘটে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, তাদের বিমানবাহিনী বেলুচিস্তানের পিশিন জেলা এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার কিছু অংশে আইএসআইএল (আইএসআইএস) কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

Advertisement

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সীমান্ত পার হওয়ার পরপরই ড্রোনগুলো শনাক্ত করা হয়। এরপর আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলোকে ধ্বংস করা হয়। পাকিস্তান একে আফগান তালেবানের ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় ও মদদ দেওয়ার’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আরও পড়ুন আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানের হামলা, নিহত ২৯

অন্যদিকে, কাবুলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পিশিন জেলায় তাদের হামলাটি একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। আফগানিস্তানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও হামলার পরিকল্পনার জন্য ওই কেন্দ্রটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। এই হামলায় কোনো বেসামরিক নাগরিকের ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা। তবে কোনো পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

উত্তেজনার ধারাবাহিকতা

দুই দেশের মধ্যে এই সামরিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। গত ২৭ জুন করাচিতে একটি আধাসামরিক বাহিনীর কম্পাউন্ডে বন্দুকধারী হামলায় তিনজন নিহত হন। পাকিস্তান তালেবানের (টিটিপি) একটি উপদল জামাত-উল-আহরার এই হামলার দায় স্বীকার করে। এ সময় জীবিত ধরা পড়া এক সন্দেহভাজন আফগান নাগরিক বলে চিহ্নিত হয়।

Advertisement

এর জবাবে ২৯ জুন পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাক্তিয়া, পাক্তিকা ও কুনার প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। এতে ২৫ যোদ্ধা নিহত হওয়ার দাবি করে পাকিস্তান। তবে তালেবান সরকার জানায়, সেখানে ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন।

আরও পড়ুন পানি আটকালে হাত কেটে ফেলবো: ভারতকে পাকিস্তানের হুমকি

মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে আফগান ও পাকিস্তানি ভূখণ্ডের মধ্যে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আপাতত তারা ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছেন। অর্থাৎ, উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে, তবে আফগান তালেবান সরকারের সরাসরি হামলার বিরুদ্ধে ভেবেচিন্তে প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

এর আগে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে ৬৬৯টি সন্ত্রাসী হামলা রেকর্ড করা হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। এসব হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩৪ জন নিহত হন। মার্কিন গবেষণা সংস্থা এসিএলইডির তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে অন্তত এক ডজন ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।

Advertisement

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চীনের মধ্যস্থতায় উরুমকিতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। তখন পাকিস্তানের বিমান হামলা কিছুটা কমেছিল এবং তালেবান কর্মকর্তারা টিটিপির বিরুদ্ধে লিখিত গ্যারান্টি দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই শান্তি মাত্র দুই মাস স্থায়ী হয় এবং জুনে আবার উত্তেজনা ফিরে আসে।

একে অপরকে দোষারোপ

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাহাদ নাবিল বলেন, ‘পাকিস্তানের বিমান হামলাগুলো এখন কেবলই প্রতিক্রিয়ামূলক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আফগান তালেবানও তাদের ভূখণ্ডকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা বন্ধ করতে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।’

কোয়েটাভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রহিম নাসারি অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঢাকতে আফগানিস্তানের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। হামলাকারীরা আফগান সীমান্ত থেকে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে করাচিতে গিয়ে হামলা চালাচ্ছে, যা পাকিস্তানের নিজস্ব গোয়েন্দা ব্যর্থতা নির্দেশ করে। তিনি এই পরিস্থিতিকে দুই দেশের ‘পারস্পরিক ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে অভিহিত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের কেউই তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান না করে একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। পাকিস্তান যদি তাদের সীমান্ত অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান না করে এবং আফগান তালেবান যদি টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তবে এই অঞ্চলের সংঘাত আরও গভীর হবে।

সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/