ভ্রমণ

শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে বাতাসের গানে একদিন

ঘোরাঘুরি করতে কার না ভালো লাগে? মানুষের জীবন যত ব্যস্ততার ঘেরাটোপে আটকে যায়; মন ততই ছুটে যেতে চায় দূরে কোথাও—যেখানে থাকবে নির্জনতা, সবুজের শান্ত ছায়া, বাতাসের নরম ছোঁয়া আর প্রকৃতির সঙ্গে নিঃশব্দ আলাপের সুযোগ। অনেকের কাছেই জীবন মানে নতুন পথের খোঁজ, নতুন দৃশ্যের সঙ্গে পরিচয়। যারা ভ্রমণে আনন্দ খুঁজে পান, তাদের জন্য উপকূলীয় জনপদে লুকিয়ে থাকা অনিন্দ্য সুন্দর গন্তব্য হতে পারে শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত।

Advertisement

সাগর সীমান্তের কোলঘেঁষা নয়নাভিরাম স্থানটির নাম শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত। একদিকে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের বিস্তৃতি, অন্যদিকে সীমাহীন বঙ্গোপসাগরের ঢেউ। মাঝখানে প্রকৃতির নিখুঁত এক মেলবন্ধন। উপকূলীয় জেলা বরগুনার তিনটি প্রধান নদী—পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের জলমোহনা ঘিরেই গড়ে উঠেছে শুভসন্ধ্যার সৌন্দর্য। নদী আর সাগরের মিলন যেন এখানে সৃষ্টি করেছে এক ভিন্ন পৃথিবী।

স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি নলবুনিয়া চর বা নলবুনিয়া পিকনিক স্পট হিসেবেও পরিচিত। প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রাজ্য যেন এক নিঃশব্দ সবুজের আঙিনা। ২০০৬ সালে বন বিভাগের উদ্যোগে এখানে প্রায় ৫৮ হেক্টর জমিতে গড়ে তোলা হয় নন-ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। ঝাউ, আকাশমনি, অর্জুন, খইয়া বাবলা, কালি বাবলা, কড়াই, খয়ের ও বাদামসহ নানা প্রজাতির গাছ এখন এ অঞ্চলকে সাজিয়ে তুলেছে এক সজীব বনের রূপে।

শুভসন্ধ্যার সকাল শুরু হয় এক অদ্ভুত শান্তি নিয়ে। খুব ভোরে যখন সূর্যের প্রথম আলো ঝাউগাছের সরু পাতার ফাঁক গলে মাটিতে পড়ে, তখন পুরো পরিবেশটাকে মনে হয় যেন শিশিরে ভেজা কোনো ছবির ফ্রেম। দূরে নদীর বুকে ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকা, জেলেদের ব্যস্ততা আর ভেজা বাতাসের গায়ে লবণাক্ত গন্ধ—সব মিলিয়ে সকালটা যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা একটি জলরঙের ছবি।

Advertisement

আরও পড়ুন পায়রার জল, জনপদ আর জীবন দেখতে চাইলে

সকালের পরে সূর্য একটু ওপরে উঠতেই বদলে যেতে থাকে প্রকৃতির রূপ। দুপুরের শুভসন্ধ্যা অন্যরকম। বিস্তীর্ণ বালুচরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে রুপালি আভা নিয়ে। ঝাউবনের ছায়ায় বসলে শোনা যায় পাতার ফাঁকে বাতাসের মৃদু শব্দ। কখনো দূরের ঢেউ এসে ভেঙে পড়ে, কখনো পাখির ডাক এসে ভেসে যায়। যারা প্রকৃতিকে ধীরে ধীরে অনুভব করতে চান, তাদের জন্য দুপুরের এই নিরিবিলি সময়টি হতে পারে সবচেয়ে উপভোগ্য।

এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী ও সাগর। জীবিকার তাগিদে অনেকেই বেছে নিয়েছেন জেলে জীবন। বিশেষ করে শীতকালে জেলেপল্লিতে বাড়ে ভিন্ন এক ব্যস্ততা। হাজারো পরিবার তখন শুঁটকি শুকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোথাও জাল মেরামত হচ্ছে, কোথাও মাছ বাছাই চলছে, কোথাও আবার শুকাতে দেওয়া হয়েছে সদ্য ধরা মাছ।

বিকেলের দিকে শুভসন্ধ্যা যেন ধীরে ধীরে নিজের আসল রূপে ফিরে আসে। তখন সাগরের দিক থেকে বইতে শুরু করে স্নিগ্ধ বাতাস। দিনের ক্লান্তি যেন সেই বাতাসে ভেসে যায়। পর্যটকেরা হাঁটতে হাঁটতে বালুচরে হারিয়ে যান, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ নীরবে বসে দূরের জলরেখার দিকে তাকিয়ে আছেন।

শুভসন্ধ্যার নামের সঙ্গে সন্ধ্যার সম্পর্ক যেন খুব স্বাভাবিক। সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ডুবে যেতে থাকে; তখন পুরো আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কমলা, লাল আর হালকা বেগুনি রঙের মায়া। তারপর আস্তে আস্তে নেমে আসে গোধূলি। বাতাসে তখন কুহুকুহু এক শীতল অনুভূতি। ঝাউগাছের মাথাগুলো হেলে দুলে যেন নিজেদের ভাষায় কিছু বলতে থাকে। চারপাশে তখন এক ধরনের নিস্তব্ধতা, অথচ সেই নীরবতারও নিজস্ব একটি শব্দ আছে।

Advertisement

আরও পড়ুন বিলাসী ঝরনায় ছুটছেন পর্যটকেরা, রাতে ক্যাম্পিং

বর্ষাকালে এ সৌন্দর্য আরও অন্যরকম হয়ে ওঠে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে সারি সারি ঝাউগাছের মাথার ওপর হঠাৎ দেখা দেওয়া রংধনু মুহূর্তেই চোখ জুড়িয়ে দেয়। মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের হাতে নতুন করে সাজিয়েছে পুরো চরটিকে। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকেরা নৌপথ ও স্থলপথে এখানে আসেন। পিকনিক স্পটে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং ছোটখাটো দোকান থাকায় খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না। চাইলে দলবেঁধে রান্নার ব্যবস্থাও করা যায়।

যেভাবে যাবেন

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বরগুনার তালতলীর উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে। প্রথমে পৌঁছাতে হবে তালতলী সদরে। এরপর তালতলী সদর থেকে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়ায় যেতে হবে ভ্যান, অটোরিকশা অথবা মোটরসাইকেলে। তারপর আর কোনো যানবাহনের প্রয়োজন নেই। সারি সারি ঝাউগাছ ঘেরা মেঠোপথে দুই-তিন মিনিট হাঁটলেই সামনে খুলে যাবে শুভসন্ধ্যার বিস্তৃত বেলাভূমি।

কখনো কখনো মানুষ শুধু একটি জায়গা দেখতে যায় না, যায় নিজের ভেতরের ক্লান্তিকে কিছুটা সময়ের জন্য নামিয়ে রাখতে। শুভসন্ধ্যা হয়তো ঠিক তেমনই একটি জায়গা—যেখানে সকাল নরম, দুপুর শান্ত, বিকেল বাতাসময় আর সন্ধ্যা নামলেই প্রকৃতি ধীরে ধীরে গল্প বলতে শুরু করে।

খাওয়ার ব্যবস্থা

পর্যটকদের জন্য এখানে আরেকটি আকর্ষণ স্থানীয় খাবারের স্বাদ। সমুদ্র কিংবা নদী থেকে সদ্য ধরা টাটকা মাছ দিয়ে ছোট ছোট স্থানীয় হোটেলগুলোতে ভাতের ব্যবস্থা রয়েছে। গরম ভাতের সঙ্গে ভাজা কিংবা ঝোল করা নদীর তাজা মাছ, সঙ্গে হয়তো কাঁচামরিচ আর লেবু—প্রকৃতির কাছাকাছি বসে এমন খাবারের স্বাদ আলাদা করে মনে থেকে যায়।

আরও পড়ুন সমুদ্রসৈকতে অন্যরকম গ্ল্যাম্পিংয়ের গল্প থাকার ব্যবস্থা

একেবারে শুভসন্ধ্যা বিচের কাছেই থাকার তেমন কোনো রিসোর্ট-হোটেল নেই। শুভসন্ধ্যার আশেপাশে থাকতে হলে আপনাকে অবশ্যই তালতলি উপজেলা শহরে থাকতে হবে। সেখানে বেশকিছু হোটেল এবং রেস্ট হাউজ রয়েছে।

আলোর নিচে অন্ধকার

শুভসন্ধ্যার সৌন্দর্যের কথা যতই বলা হোক, অপার সৌন্দর্যের বুকেও এখন বাসা বাঁধছে নীরব আতঙ্ক। সেই আতঙ্কের অন্যতম কারণ নদী ও সাগরের ভাঙন। প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যাচ্ছে শুভসন্ধ্যার বিস্তীর্ণ অংশ। ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সৈকতঘেঁষা গাছপালা। প্রকৃতির ক্ষত যেন প্রতিদিন আরও গভীর হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাকৃতিক ভাঙনের পাশাপাশি মানুষের হাতেও বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ। সৈকতের গাছ কেটে নেওয়া কিংবা নির্বিচারে অপসারণের ঘটনাও ঘটছে। অথচ এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের মতে, অপরিকল্পিত এবং পরিবেশবান্ধব নয়—এমন উন্নয়ন কার্যক্রমও শুভসন্ধ্যার অস্তিত্ব সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।

সুযোগ-সুবিধা

পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে শুভসন্ধ্যা এখনো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা, নেই পরিকল্পিত হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে, নেই পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও বিনোদনের ব্যবস্থা। একটি পর্যটনকেন্দ্রকে পর্যটকবান্ধব করে তুলতে যেসব মৌলিক উদ্যোগ প্রয়োজন, তার অনেকটাই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

আরও পড়ুন দারভাঙ্গা খাল: জোয়ার-ভাটার নীরব স্বর্গ

ফলে প্রকৃতির টানে অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ শুভসন্ধ্যায় এলেও শেষপর্যন্ত কিছুটা অপূর্ণতা নিয়েই ফিরে যান। যে জায়গা তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে, সেই জায়গাটিই আবার অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে দর্শনার্থীদের মনে এক ধরনের আক্ষেপও রেখে যায়।

এসইউ