খেলাধুলা

গরমে বিশ্বকাপ আয়োজন করে বিপাকে ফিফা, আলোচনায় ২০৩৪ বিশ্বকাপ

২০২২ সালে কাতারের তীব্র গরমের কারণে ফিফা বিশ্বকাপটি শীতকালে অর্থাৎ ঘরোয়া লিগগুলোর মৌসুম চলাকালীন সময়ে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মাঠে দলগুলোর খেলার মান পর্যবেক্ষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং ফুটবল বিশ্বের অনেকেই ইউরোপীয় মৌসুমের মাঝখানে এই বিশ্বকাপ আয়োজনের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং জুন-জুলাই মাসে বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ফিফা এখন তাদের পুরো সময়সূচি বা ক্যালেন্ডার পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে।

Advertisement

শনিবার সন্ধ্যায় ফরাসি জাতীয় দল ফিলাডেলফিয়ায় ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অফ ১৬’-এর ম্যাচটি খেলবে। তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতার মধ্যেই পূর্ব উপকূলের এই শহরটি ‘লে ব্লু’দের (ফরাসি দল) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আয়োজন করতে যাচ্ছে। খেলা শুরুর সময় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরেই বেশ কিছু অনুশীলন সেশন অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন ভেন্যুতে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে, যেখানে শহর ও স্টেডিয়ামভেদে আবহাওয়ার ব্যাপক তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। যদিও শনিবার ফিফা কর্তৃক প্রবর্তিত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতি নিয়ে কেউ কেউ যৌক্তিকভাবেই সমালোচনা করেছেন, তবুও মনে হচ্ছে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী হবে।

২০৩০ বিশ্বকাপের পর কি সময়সূচিতে পরিবর্তন আসবে? আরও বড় পরিসরে বলতে গেলে, এই পরিস্থিতি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে ক্রমশ জোরালো হতে থাকা একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্বকাপ কি গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়েই আয়োজন করা অব্যাহত রাখা উচিত? আর যদি তাই হয়, তবে কোন পরিস্থিতিতে?

Advertisement

২০২২ বিশ্বকাপ শীতকালে আয়োজিত হওয়ার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে সংবেদনশীলতা কিছুটা কমেছে। কাতারে জুন মাসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম থাকা সত্ত্বেও কোনো খেলোয়াড়ের পক্ষেই আসলে ভালো খেলা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ফিফা বিশ্বকাপটি নভেম্বর মাসে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এখন ২০৩০ বিশ্বকাপের পরবর্তী বছরগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সময়সূচিতে আরও ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করছে।

মাঠের বাস্তবতায় অনেকেই শীতকালে টুর্নামেন্ট আয়োজনের সুবিধাগুলো লক্ষ্য করেছেন। বিশেষ করে সেইসব খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে, যারা নিজ দেশের লিগে পুরো মৌসুম খেলার পরেও ক্লান্ত বা হয়ে পড়েন না। এমনকি ইউরোপের যেসব খেলোয়াড় ও কোচ এই বিশ্বকাপে অংশ নেননি, তারাও মৌসুমের মাঝপথে পাওয়া এই এক মাসের বিরতিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন।

যে ব্যবস্থা ইউরোপের বাইরের কিছু লিগে আগে থেকেই প্রচলিত আছে। ফিফার সময়সূচি ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত হয়ে গেছে। এর মধ্যে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে ৩টি মহাদেশ জুড়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যার অধিকাংশ ম্যাচ পর্তুগাল, স্পেন ও মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হবে।

Advertisement

ফিফার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি মৌসুমের মাঝপথে বিশ্বকাপ আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী, তিনি জানান, ‘আমার মনে হয়, এই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে।’ এরপর তিনি পরবর্তী বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ টেনে একটি চিন্তার খোরাক দেন, ‘আপনারা কি এই মুহূর্তে মারাকেশে খেলার কথা কল্পনা করতে পারেন?’

২ জুলাই '‘মেটিও-ফ্রান্স’ (Météo-France)-এর তথ্যানুযায়ী, রাবাতে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মারাকেশে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। ফিফা পরবর্তী বিশ্বকাপের তারিখ পরিবর্তন করবে না। তবে সংস্থাটির এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে" তিনি আরও যোগ করেন, "ইনফান্তিনো এই ধারণার বিরুদ্ধে নন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে মানুষ প্রায়ই 'হ্যাঁ' বলে কারণ স্টেডিয়াম তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। কিন্তু,শুধু খেলার মাঠের কথা ভাবলেই চলবে না। সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকেও নজর দিতে হবে।’

অনুশীলনের মাঠগুলো কি তীব্র তাপমাত্রা মোকাবিলার উপযোগী? ফিফার ভেন্যুগুলোতে দর্শক এবং সেখানে কর্মরত কর্মীদের জন্য কি উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে? ম্যাচের সময় কি পরিবর্তন করা প্রয়োজন? শুধু স্টেডিয়ামই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কোনো 'ফ্যান জোন'-এ থাকার কথা কি কল্পনা করতে পারেন? আপনি হয়তো ৩ মিনিটও নিজের আসনে বসে থাকতে পারবেন না।’

আরএমসি স্পোর্ট (RMC Sport)-এর কয়েক মাস আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে অনুষ্ঠিতব্য ২০৩৪ বিশ্বকাপ শীতকালে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ফিফা প্রতিনিধিরা এখনও চূড়ান্ত তারিখ নিশ্চিত করেননি। এরপর ২০৩৮ সালের প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং ফিফার বিভিন্ন যুব টুর্নামেন্টের সময়সূচি কেমন হবে, তা দেখা বেশ আকর্ষণীয় হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফিফা তাদের পুরো সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে।এমনকি কিছু ফেডারেশনকে,বিশেষ করে ইউরোপীয়দের পঞ্জিকাবর্ষ বা ক্যালেন্ডার ইয়ার অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করতে পারে। যেমনটা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন চ্যাম্পিয়নশিপের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে শীতকালে বিশ্বকাপ আয়োজনের ধারণাটি খুব একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। তাদেরই একজন বলেন, ‘২০২২ সালের বিশ্বকাপ আমাদের দেখিয়েছে যে আমরা খুব ভালো দর্শকসংখ্যা পেতে পারি।’

তবে তিনি একটি প্রশ্নও তোলেন, ‘যদি গরমের কারণে গ্রীষ্মকালীন বিশ্বকাপ বাদ দেওয়া হয়, তবে আমার মনে হয় না যে 'লিগ ১' (ফরাসি লিগ) সেই প্রতিযোগিতার জায়গা নিতে পারবে। কারণ, জুলাই মাসে ফ্রান্সেও প্রচণ্ড গরম থাকে।’

কিছু সূত্র, বিশ্বকাপ কিছুটা আগে ‘প্রায় দুই সপ্তাহ আগে’ শুরু করার পরামর্শ দিয়েছে। সবকিছুই সম্ভব এবং কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফিফা বর্তমানে বিষয়টি বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার ভেন্যুগুলোর সাথে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ইএফসি (EFC) কংগ্রেসে দেওয়া বক্তৃতায় জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো বলেছিলেন, ‘এটি কেবল একটি বিশ্বকাপ আয়োজনের বিষয় নয়। বরং এটি একটি সামগ্রিক চিন্তাভাবনার বিষয়। এমনকি জুলাই মাসে ইউরোপের কিছু দেশেও প্রচণ্ড গরম থাকে।’

তিনি আরও বলেন, "ফুটবল খেলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মাস হলো জুন। অথচ ইউরোপে এই সময়টি খুব একটা কাজে লাগানো হয় না। আমার মনে হয়, আমরা আসলে কী করতে চাই সে বিষয়ে আমাদের আরও ব্যাপক ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।"

আরআর/আইএইচএস/